বিশেষ প্রতিবেদক
মার্চ ৮, ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম
দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে আজ এক রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিচারপতিদের জন্য নির্ধারিত মূল প্রবেশ ফটকের একেবারে পাশ থেকে অবিস্ফোরিত অবস্থায় ছয়টি শক্তিশালী ককটেল উদ্ধার করেছে পুলিশ।
রোববার দুপুর দেড়টার দিকে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে, যা বিচারালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আজ দুপুরে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের গাড়ি প্রবেশের জন্য নির্ধারিত প্রধান গেটের ডান পাশে কিছু সন্দেহভাজন কালো রঙের বস্তু পড়ে থাকতে দেখেন দায়িত্বরত নিরাপত্তা কর্মীরা। তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি শাহবাগ থানা পুলিশ ও ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়।
পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে এলাকাটি ঘিরে ফেলে এবং তল্লাশি চালিয়ে কালো টেপে মোড়ানো ছয়টি ককটেল উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃত ককটেলগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ককটেলগুলো নিষ্ক্রিয় করার জন্য ডিএমপির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটকে খবর দেওয়া হয়।
সুপ্রিম কোর্টের মতো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ (KPI) এলাকায়, যেখানে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি ক্যামেরা ও নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নজরদারি থাকে, সেখানে কীভাবে বিচারকদের প্রবেশপথ পর্যন্ত ককটেল পৌঁছালো তা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা গুঞ্জন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এটি কোনো সাধারণ অপরাধী বা ছিঁচকে চোরের কাজ নয়। বিচারপতিদের প্রবেশপথ লক্ষ্য করে ককটেল রাখা নিঃসন্দেহে একটি গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে। আমরা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছি এবং কারা এই এলাকায় সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করছিল তা শনাক্ত করার চেষ্টা করছি।
আজকের দিনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঘটনাবহুল ছিল। একদিকে ইরান-সংঘাতের কারণে অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি সাশ্রয়ে স্বাধীনতা দিবসে আলোকসজ্জা বন্ধের সরকারি ঘোষণা (যা আজ সকালেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন), অন্যদিকে টিআইবির পক্ষ থেকে তথ্য কমিশনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন এমন এক গুমোট পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টে ককটেল উদ্ধারের ঘটনা নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
আইনজীবীদের একটি অংশ মনে করছেন, বিচার বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে বা জনমনে আতঙ্ক ছড়াতে কোনো একটি গোষ্ঠী এই অপতৎপরতা চালিয়ে থাকতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচনী বিরোধ নিয়ে মির্জা আব্বাস ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মধ্যকার আইনি লড়াই যখন আদালতে গড়িয়েছে, তখন আদালতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়াকে অনেকে উদ্বেগের সাথে দেখছেন।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ আইনজীবীরা এই ঘটনায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, বিচারালয় যদি নিরাপদ না থাকে, তবে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? তারা অবিলম্বে এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা কুশীলবদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
ককটেল উদ্ধারের পর পুরো সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। দর্শনার্থীদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে এবং প্রতিটি গেটে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। শাহবাগ থানা পুলিশ এই ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে এবং খুব শীঘ্রই একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হবে বলে জানা গেছে।
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত দেশের সর্বোচ্চ বিচারপীঠের গেটে ককটেল পাওয়া যাওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি যেমন নিরাপত্তার চরম ব্যর্থতা, তেমনি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার একটি অপচেষ্টাও হতে পারে। তদন্তের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসবে এটি কেবল আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা ছিল নাকি বড় কোনো নাশকতার নীল নকশা।
এএন