নিজস্ব প্রতিবেদক
মে ১৪, ২০২৬, ০৩:২৮ পিএম
২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংস ঘটনার মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় নতুন করে আইনি অগ্রগতি হয়েছে। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, একাত্তর মিডিয়া লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু এবং একই প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
কড়া নিরাপত্তার মধ্যে আসামিদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাদের এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দেন। শুনানি শেষে পরবর্তী তারিখ আগামী ৭ জুন নির্ধারণ করা হয়। ওই দিন তদন্ত সংস্থাকে ঘটনার বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, ওই ঘটনার রাতে সংঘটিত সহিংসতাকে তারা পরিকল্পিত মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম থেকে মোট ৫৮ জন নিহতের তথ্য ও পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে এবং এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
এই মামলায় তৎকালীন সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে। তালিকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের নাম রয়েছে।
এছাড়া সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক, হাসান মাহমুদ খন্দকার, বেনজীর আহমেদ এবং পুলিশের উপমহাপরিদর্শক মোল্যা নজরুল ইসলামকেও আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারের নামও মামলার তালিকায় রয়েছে বলে জানা যায়।
মামলায় দুই গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের গ্রেপ্তার দেখানোকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে। প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী, ওই সময় কিছু গণমাধ্যম ঘটনাকে উসকানিমূলকভাবে উপস্থাপন করে প্রকৃত তথ্য আড়াল করতে সহায়তা করেছিল।
ডা. দীপু মনির বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে বলা হয়েছে, তৎকালীন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থেকে তিনি ঘটনাপ্রবাহে ভূমিকা রেখেছিলেন।
ঘটনার রাতে কতজন নিহত হয়েছেন, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মতভেদ রয়েছে। বিভিন্ন পক্ষ ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা দাবি করে আসছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ওই ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানির অভিযোগ তুললেও সরকারি অবস্থান ভিন্ন ছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
শুনানিকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনাল এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং সেখানে উৎসুক মানুষের ভিড় দেখা যায়। দীর্ঘ সময় পর এই ঘটনার বিচারিক কার্যক্রম নতুন করে আলোচনায় আসায় রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রভাব পড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আগামী ৭ জুনের শুনানি এবং তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে এখন সবার নজর। ওই প্রতিবেদন থেকে ঘটনার কমান্ড কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরও তথ্য উঠে আসতে পারে বলে আইনজীবীরা মনে করছেন।
এম জি