Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ০৬ জুলাই, ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯

চাষিরা পেঁয়াজের কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছেন না

এম এইচ তানভীর 

এম এইচ তানভীর 

মে ১৯, ২০২২, ০১:৪৮ এএম


চাষিরা পেঁয়াজের কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছেন না

করোনার আগে পেঁয়াজ নিয়ে ব্যবসায়ীদের হঠকারিতা দেখেছিল বাংলাদেশ। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ায় দেশের বাজারে দাম বৃদ্ধি পেয়েছিল।

এরপর থেকে দেশের কৃষকরা পেঁয়াজ উৎপাদনে বাড়তি মনোযোগ দিয়েছেন। তাই এ বছর পেঁয়াজ উৎপাদন বেড়েছে। বর্তমানে যে পরিমাণ মজুত আছে, তা দিয়ে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চাহিদা মিটবে। আপাতত ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখা হয়েছে। 

ফলে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেছে। কিন্তু যে কৃষকরা মাঠে ফসল ফলাচ্ছেন তারা কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছেন না। পাইকাররা বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষকদের প্রতি মণ পেঁয়াজ সর্বোচ্চ ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকা দিয়ে কিনে নিচ্ছেন। এতে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম পড়ছে ১৮.৭৫ পয়সা থেকে সাড়ে ২২ টাকা। অথচ প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকদের খরচ হয়েছে ২০ টাকা করে। 

এসব পেঁয়াজ ঢাকায় এসে পাইকারি ৩২ থেকে ৩৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এসব পাইকাররাই লাভের বড় অংশ নিয়ে যাচ্ছেন। ঢাকার কয়েকটি পাইকারি আড়ত ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতি মণ পেঁয়াজ সাইজ অনুযায়ী এক হাজার ৩০০ টাকা থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। আর খুচরা দোকানে কেজি প্রতি রাখা হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। 

এদিকে কৃৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাবে, এ বছর দেশি পেঁয়াজের প্রতি কেজির উৎপাদন খরচ পড়েছে ২০ টাকা। আর হাইব্রিড ও বিদেশি জাতের পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ পড়ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। তাই কৃষকদের সুরক্ষা দিতে ডিএই দেশে পেঁয়াজ আমদানির জন্য নতুন করে আমদানির ছাড়পত্র দিচ্ছে না। এ কারণে কয়েক দিন আগে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়ে যায়। 

ডিএই বলছে, চলতি বছর দেশে ৩৬ লাখ ৪১ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় দুই লাখ ৭৯ হাজার টন বেশি। পচে যাওয়া এবং ওজন কমে যাওয়ায় মোট উৎপাদনের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ পেঁয়াজ বিক্রয়যোগ্য থাকে। এ হিসাবে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের কাছে এখন পেঁয়াজ আছে কমপক্ষে ২৫ লাখ টন।

পেঁয়াজের দামের বিষয়ে কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের স্বার্থ রক্ষার কথা বলছে সরকার। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, কৃষকরা যেন অন্তত ২৫ টাকা দরে পেঁয়াজ বিক্রি ও দেশের মানুষ যেন প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৪৫ টাকায় কিনতে পারেন সেটি আমরা দেখছি। কিন্তু বাজারে দর বাড়লেও কৃষকরা এতে লাভবান হচ্ছেন না। এর পুরো মুনাফা ভোগ করছে মধ্যস্থাতায় যারা আছেন তারা। 

পেঁয়াজ চাষের জন্য বিখ্যাত কয়েকটি জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাজারে দাম বাড়লেও এতে কৃষকদের ফায়দা হচ্ছে না। 

কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় কৃষি অফিসার সৌতম কুমার শীল বলেন, কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় এবার এক হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে ১৪ টন করে দুই হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। ফলন ভালো হলেও কৃষকরা লাভবান হতে পারছেন না। কৃষকরা প্রতি মণ পেঁয়াজ সর্বোচ্চ ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা বিক্রি করতে পারছেন। কিন্তু এতে চাষিদের খরচই উঠবে না। ১১শ টাকার ওপরে বিক্রি করতে পারলে তাদের খরচ উঠত। মাদারীপুরের পেঁয়াজচাষি রমিজ মিয়া বলেন, ‘ফলন ভালো পাইলেও লাভ হয় নাই। ৮০০ টাকা করেই সব বিক্রি করে দিছি। খরচ উঠলেও লাভ কিছুই থাকে নাই।’

পাবনার সুজানগর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা রাফিউল ইসলাম বলেন, এবারের লক্ষমাত্রা ছিল ১৬ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ করা। সেখানে আমাদের উপজেলায় ১৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ও উচ্চফলনশীল জাতের পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে। প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে ১৮ টন করে টোটাল তিন লাখ ১৩ হাজার ৮০০ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। ইতোমধ্য ১৩ শতাংশ পেঁয়াজ কৃষকরা বিক্রি করে ফেলেছেন। বাকি ফসল কৃষকের ঘরে মজুত আছে। এখানে পেঁয়াজের মণ ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এখন কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। 

ফরিদপুর সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা আবুল হোসেন মিয়া বলেন, সদরে তিন হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে গড়ে ১৯ টন করে ৭০ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। কিন্ত এখানে চাষিরা পেঁয়াজের কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছে না। মাঝখানে দাম একটু বাড়লেও এখন ৯০০-৯৫০ টাকায় পাইকাররা কৃষকদের পেঁয়াজ কিনে নিচ্ছেন। প্রায় এক মাস আগে পেঁয়াজ তোলা হয়েছে, এখন এগুলো শুকিয়ে ওজন কমে গেছে। মণপ্রতি এক হাজার ৪০০ টাকার কমে বিক্রি করলে কৃষকদের কিছুই থাকবে না। 

কৃষি গবেষকরা বলছেন, এ সময় পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখা কৃষকদের জন্য সুখবর। কিন্তু এই সুযোগ নিয়ে মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা যাতে পেঁয়াজ মজুত রেখে বাজারে সংকট তৈরি না করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। দেশী পেঁয়াজের মওসুম শেষ হলেই কেবল প্রয়োজনমতো আমদানি করতে হবে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মো. রমিজ উদ্দিন বলেন, মওসুমে কৃষকদের আগ্রহ ধরে রাখতে তার উৎপাদিত পেঁয়াজের উপযুক্ত দাম দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে।