Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ০৬ জুলাই, ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯

রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্সের অডিটে আপত্তি

জাহিদুল ইসলাম

মে ২২, ২০২২, ০২:২৩ এএম


রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্সের অডিটে আপত্তি

আইন অনুসারে কোম্পানি পরিচালকদের যে পরিমাণ শেয়ার ধারণ করার কথা, তা করেননি। ফলে অডিট রিপোর্টে বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এরপরও বিষয়টি নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি নিয়ন্ত্রক সংস্থা। পুঁজিবাজারে থাকা বিমা খাতের রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্সে এমনটাই ঘটেছে। শুধু রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্সেই নয়, বিমা খাতের অনেক কোম্পানিই মানছে না খোদ বিমা আইন। 

অথচ এরপরও এসব বিষয়ে অদৃশ্য কারণে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। ফলে নিয়ন্ত্রকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে আইডিআরএর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, বিমা পরিচালকদের ন্যূনতম শেয়ার ধারণের হার নির্ধারণ করে বিমাকারীর মূলধন ও শেয়ারধারণ বিধিমালা-২০১৬ প্রণয়ন করে সরকার। ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে পাঁচ বছর আট মাস। 

অথচ এখনো অনেক কোম্পানি এই আইনের বিধানাবলি প্রতিপালন করছেন না। সম্প্রতি রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষাকালে এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান মালেক সিদ্দিকী ওয়ালি চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টস। 

আর্থিক প্রতিবেদনের ইম্পফেসাইস অব ম্যাটার বিষয়ে জানাতে গিয়ে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানটি জানায়, বিমা আইন অনুসারে নন-লাইফ বিমা কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের পরিশোধিত মূলধনের ৬০ শতাংশ শেয়ারধারণ করতে হয়। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের (রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্স) উদ্যোক্তা-পরিচালকরা মাত্র ৩১.৬৭ শতাংশ শেয়ার ধারণ করেছে। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি অযোগ্য হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। 

মূলত প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়বদ্ধতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ৬০ শতাংশ শেয়ার ধারণের এই নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে খাত বিশ্লেষকরা। এর ফলে কোম্পানি পরিচালকদের অধিক সংখ্যায় শেয়ার ধারণ করতে হয় বলে প্রতিষ্ঠানের লাভ-লোকসানের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে সচেতনতা দেখা যায়। এখন পর্যন্ত দেখা গেছে, যে সব প্রতিষ্ঠানের পরিচালকরা আইনে বর্ণিত হারে শেয়ার ধারণ করেছেন, দু-একটি ছাড়া অধিকাংশ সে সব প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। 

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইট থেকে রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্সের সর্বশেষ শেয়ার ধারণের তথ্যে দেখা যায়, পরিচালকরা ৩১.৬৭ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ১৮.৫২ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ৪৯.৮১ শতাংশ শেয়ার ধারণ করেছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির অর্ধেক শেয়ার ধারণ করছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। অথচ কোম্পানি পরিচালনায় তাদের কোনো এখতিয়ার নেই। ফলে নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা পদে থেকে অসাধু উপায়ে ফায়দা নিলেও কিছু করার থাকে না ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের। এক্ষেত্রে তাদের স্বার্থ রক্ষার একমাত্র উপায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো আইন ও বিধি।

বিমা বিধি অনুসারে প্রতিটি বিমা কোম্পানি আইডিআরএ থেকে নিবন্ধন লাভের পর তিন বছরের মধ্যে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে জনসাধারণের জন্য ৪০ শতাংশ শেয়ার উন্মুক্ত করবে এবং পরিচালকরা ৬০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করবে। এছাড়া এই বিধি পালনে ব্যর্থতায় বিমা আইন অনুসারে এককালীন পাঁচ লাখ টাকা এবং আইন পরিপালন করার পূর্ব পর্যন্ত প্রতিদিনের জন্য পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। 

এক্ষেত্রে বিধি প্রণয়নের পর গত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখে বিধি মোতাবেক তিন বছরের সময়সীমা উত্তীর্ণ হয়। এরপর থেকে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অতিক্রম হয়েছে ৯৬৭ দিন বা প্রায় দুই বছর আট মাস। আইন অনুসারে এই সময়ের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে এককালীন পাঁচ লাখসহ প্রতিদিনের জন্য পাঁচ হাজার টাকা হারে মোট ৫৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বাধা বা জবাবদিহিতার মুখে পড়তে হয়নি।

শুধু রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্সই নয়, বিমা খাতে অনেক লাইফ ও নন-লাইফ বিমা কোম্পানি অহরহ ভেঙে চলেছে নিয়ন্ত্রণ সংস্থার আইন, বিধি ও নির্দেশনা। বিভিন্ন সময় কোম্পানিগুলোকে ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নির্দেশনা দেয়া হলেও তা মানা হয় না। এর ফলে সার্বিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে আইডিআরএর সক্ষমতা। 

ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর পরিচালকদের ৬০ শতাংশ শেয়ার ধারণে বাধ্য করা যাচ্ছে না। কেন এমনটা হচ্ছে, জানতে চাইলে আইডিআরএর কর্মকর্তা আবু মাহমুদ বলেন, ‘আসলে আমাদের আইনে দুর্বলতা আছে। তাই আমরা তাদের জোর দিয়ে এটা বলতে পারছি না।’ কিন্তু কি ধরনের দুর্বলতা রয়েছে তা জানাতে পারেননি। 

এদিকে বিমা খাতে গুঞ্জন রয়েছে আইডিআরএর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার কারণে কোম্পানিগুলো আইন ভাঙতে পরোয়া করছে না। অভিযোগ, খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ নেতৃবৃন্দও এসবের সাথে জড়িত। সাম্প্রতিককালে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ও ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে এর জ্বলন্ত উদাহরণ। ফলে বছরের পর বছর আইন লঙ্ঘন হলেও কোম্পানি ও তাদের পরিচালকদের কিছুই হয় না। খুব বেশি হলে একটি শোকজ নোটিস পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ করে আইডিআরএ। 

এসব বিষয়ে আইডিআরএর নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র এস এম শাকিল আখতারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসলে আমাদের লোকবল সংকট থাকায় চাইলেও অনেক পদক্ষেপ নিতে পারছি না। তবে ইতোমধ্যে আমরা লোক নিয়োগের পদক্ষেপ নিয়েছি। আশা করছি অচিরেই বিমা খাতের এসব সমস্যার সমাধান হবে।’