Amar Sangbad
ঢাকা রবিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩, ২৩ মাঘ ১৪২৯

স্টেশনের ছাদে সশস্ত্র ছিনতাইকারী

নুর মোহাম্মদ মিঠু

অক্টোবর ১৮, ২০২২, ০১:১৮ এএম


স্টেশনের ছাদে সশস্ত্র ছিনতাইকারী

কমলাপুরসহ দেশের প্রায় সব রেলস্টেশনের ছাদ এখন ভাসমান অপরাধীদের অস্ত্র রাখার স্থান আর পরিত্যক্ত বগি যেন ক্রাইম বক্স। রেলওয়ে পুলিশের নজর এড়িয়ে প্ল্যাটফর্মের ছাদে নিরাপদেই রাখা হচ্ছে অস্ত্রসস্ত্র। নিরাপদে থাকা সেসব অস্ত্রের ব্যবহারেই পরিত্যক্ত বগি ও স্টেশন এলাকায় ঘটছে বহুমাত্রিক অপরাধ। বিশেষ করে গভীর রাতে বৃদ্ধি পায় স্টেশনকেন্দ্রিক সশস্ত্র সেই অপরাধীদের বিচরণ। যাদের বেশির ভাগই পথশিশু, কিশোর, মাদকসেবী।

মোট কথা, ভাসমান অপরাধী। যাদের বাসস্থানও রেলওয়ে স্টেশন। স্টেশন এলাকার ফুটপাতসহ স্টেশন পারাপারের ফুটওভারব্রিজ ব্যবহারকারী যাত্রী, পথচারীদের সর্বস্ব তারা লুটে নিচ্ছে অস্ত্রের মুখে। চলতি ট্রেনের ছাদেও এসব অপরাধী দেশীয় সেসব অস্ত্রের ব্যবহারে ঘটাচ্ছে প্রাণহানির ঘটনাও। প্রাণহানির ঘটনা ছাড়া অধিকাংশ ঘটনায় ভুক্তোভোগীরা হয়রানির ভয়ে অভিযোগ না করায় সংগঠিত অপরাধের সঠিক তথ্যও জানা যায় না।

অস্ত্র ছাড়াও পরিত্যক্ত বগিগুলোতে বহু  আগ থেকেই হয়ে আসছে অসামাজিক কার্যকলাপ। স্টেশন এলাকার ফুটপাতের হকার, চায়ের দোকানিসহ ভাসমান হকাররাও আমার সংবাদকে জানিয়েছেন এমন তথ্য।

সম্প্রতি আমার সংবাদের ক্যামেরায় কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের ছাদে অস্ত্র রাখার বিষয়টি ধরা পড়ে। প্ল্যাটফর্মের মধ্যে থাকা তালগাছের পাশেই এক কিশোরকে দেশীয় অস্ত্র রাখার সেই ছবিও রয়েছে আমার সংবাদের হাতে। দিনের এ ঘটনার পর রাতের দৃশ্য দেখতে (রাত ৯টা-১১টা) স্টেশনে গিয়ে কারও দেখা না মিললেও মিলেছে ফুটওভারব্রিজ থেকে অনায়াসে প্ল্যাটফর্মের ছাদে গিয়ে অপরাধীদের অস্ত্র রাখার দৃশ্য।

রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, যদিও ফুটওভারব্রিজ থেকে ছাদে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে সরেজমিন দেখা গেছে, দুটি ব্রিজের দুই অংশেই দুটি লোহার অ্যাঙ্গেল কেটে অনায়াসে ছাদে যাতায়াত করছে অপরাধীরা। এছাড়াও খোদ কমলাপুর রেলওয়ে থানার সামনেই ফুটওভারব্রিজে উঠতেই ডান পাশের কাঁটাতারের বেড়াও কেটে ছাদে যাতায়াত করছে অপরাধীরা।

যদিও রেলওয়ে পুলিশ বলছে, স্টেশনের ছাদগুলোতে নিয়মিত তল্লাশি করা হয়। এমনটি হওয়ার সুযোগ নেই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, যেসব ভাসমান কিশোর অপরাধীরা প্ল্যাটফর্মের ছাদে অস্ত্র রাখছে; সেসব অস্ত্র জোগানের নেপথ্যেও রয়েছে একটি চক্র। দেশীয় এসব অস্ত্রের ব্যবহারে করা ছিনতাইয়ে আদায়কৃত মালামালও যাচ্ছে চক্রের হাতে। ভাসমান কিশোর অপরাধীরা ধরা পড়লে তাদের ছাড়ানোর কাজটিও দূরে থেকে করে থাকে ওই চক্র। সারা দেশেই স্টেশনকেন্দ্রিক এমন চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। ওইসব চক্রের মধ্যেও রয়েছে বিরোধ। অপরাধ চক্রের নিয়ন্ত্রণ নিতেই গ্রুপভিক্তিক সেসব অস্ত্রের জোগান দেয় চক্রটি।

এছাড়াও কিশোর অপরাধীদের মাদক সেবনের জন্যও নিরাপদ হয়ে উঠেছে প্ল্যাটফর্মের ছাদ।

অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে থানায় অভিযোগ করেননি এমন একজনের সন্ধান পায় আমার সংবাদ। আজাদ হোসাইন। মতিঝিলের একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। থাকেন মুগদা এলাকায়। তিনি নিয়মিত কমলাপুর স্টেশনের ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার করেন। প্রতিদিনের মতো সম্প্রতি রাত ১১টার দিকে কমলাপুর রেলওয়ে থানার সামনে ফুটওভারব্রিজে চার-পাঁচজন সশস্ত্র ছিনতাইকারী তার পথরোধ করে। সাহসী আজাদ হোসাইন তার সাথে থাকা ব্যাগ থেকে হাতুড়ি বের করে ছিনতাইতকারীদের একজনকে সজোরে আঘাত করলে পালিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। তাদের সাথে দেশীয় অস্ত্র ছিল বলেও জানান তিনি। তবে নিচেই থাকা রেলওয়ে থানায় কেন অভিযোগ করেননি— এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘পুলিশ কিছুই করবে না।

এরা তো পুলিশের নাকের ডগায়ই এসব করছে। যে কারণে আমি আগে থেকেই প্রতিদিন আসা-যাওয়ার পথে ব্যাগে হাতুড়ি রেখে দিই।’ এ ঘটনার কিছু দিন পরই একই ছিনতাইকারীদের আক্রমণের শিকার হন একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকের ছেলে। তবে তিনি ছিনতাইকারীদের আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি। ছিনতাইকারীরা দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে তার কাছ থেকে নগদ ২০ হাজার টাকা, দুটি মোবাইল ফোনসহ ব্যাগে থাকা জিনিসপত্র নিয়ে যায়। থানাপুলিশসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে দৌঁড়াঝাপ করেও কোনো প্রতিকার পাননি তিনি।

রেলওয়ের ছাদ ও পরিত্যক্ত বগিতে অস্ত্র রাখছে ভাসমান অপরাধীরা, ভাসমান পতিতাদের দৌরাত্ম্যসহ চলছে অসামাজিক কার্যকলাপ— এমনটি জানিয়ে রেলওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি দিদার আহম্মদের কাছে জানতে চাইলে আমার সংবাদকে তিনি বলেন, ‘যার যেটা দায়িত্ব সে সেটি বলবে। এটি আমার দায়িত্বের অংশ নয়’। 

তা হলে ছাদসহ পরিত্যক্ত বগিতে অস্ত্র রাখার বিষয়ে রেলওয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের কোনো নির্দেশনাও কি থাকবে না— এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, হ্যাঁ, সেই নির্দেশনা সবারই আছে। অবৈধ জিনিস ধরার নির্দেশনা সব পুলিশেরই আছে। রেল পুলিশেরও আছে। রেল পুলিশ তো আর আলাদা পুলিশ না, বাংলাদেশ পুলিশেরই অংশ।’ সব শেষে তিনি বক্তব্য দেবেন না জানিয়ে সংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তার বক্তব্য নেয়ার কথা বলেন।

সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ঢাকা রেলওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) আনোয়ার হোসেন আমার সংবাদকে বলেন, ‘প্ল্যাটফর্মের ছাদের ওপরে এসব রাখার কথা নয়। আমরা সেখানে নিয়মিত তল্লাশি করি। এরপরও আমাদের অগোচরে যদি ছাদে এসব থাকেও সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ইউনিটকে শিগগিরই তল্লাশি জোরদারের নির্দেশনা দেবো।’ 

তিনি বলেন, ‘ছাদে কিংবা পরিত্যক্ত বগিতে অস্ত্র রাখার বিষয়ে আমরা আরও সচেতন হবো।’ এছাড়া এমন দৃশ্য কেউ দেখে থাকলেও যেন সাথে সাথে তাকে অবহিত করা হয়, সে অনুরোধও করেছেন তিনি।

কমলাপুর রেলওয়ে থানার ওসি ফেরদৌস আহমেদ বিশ্বাস আমার সংবাদকে বলেন, ‘আমি এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম শুনলাম। আমাদের সদস্যরা (রেল পুলিশ) প্রতিনিয়ত সন্ধ্যার পর ফুটওভারব্রিজসহ প্ল্যাটফর্মে থাকা মানুষদের নিরাপত্তার স্বার্থে সবসময় দায়িত্ব পালন করে। এ অভিযোগটি আপনার কাছে প্রথম শুনলাম। যদিও আমি এসেছি বেশি দিন হয়নি, দু’মাস হয়েছে মাত্র। এ নিয়ে আজ থেকেই ব্যবস্থা গ্রহণ করব। 

কমলাপুর রেলওয়ে থানার সামনেই থাকা কাঁটাতারের ভাঙা বেড়ার বিষয়ে জানালে তিনি বলেন, এগুলো সম্ভবত আইডব্লিউ দেখে। আমি তাদের সাথে কথা বলে এটিও ঠিক করিয়ে নেবো।’

এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কমলাপুরসহ বিভিন্ন রেলস্টেশনে ট্রেনের পরিত্যক্ত কোচ-বগিতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হচ্ছে। এখানে অপরাধীরা আখড়া বানিয়ে দিন-রাত থাকছে। এসব স্থানে অনেক সময় রেলওয়ে পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যর অভিযানও চালায়। তবে অব্যাহত না থাকায় অভিযান শেষ হতে না হতেই অপরাধীরা আবার সেখানে আখড়া বানিয়ে বসে। কমলাপুর, তেজগাঁও, বিমানবন্দর, টঙ্গীসহ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথের রেলওয়ে স্টেশনগুলোতে অপরাধীরা ওঁৎপেতে থাকে। সুযোগ পেলেই তারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালায়। এতে সাধারণ ট্রেনযাত্রীসহ পথচারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্টেশন এলাকায় থাকা ট্রেনের পরিত্যক্ত কোচ-বগি দ্রুত সময়ের মধ্যে সরানো না গেলে এমন অপরাধ ঘটতেই থাকবে।

Link copied!