ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

প্রতিহিংসার রাজনীতি ও একটি মানবিক রাষ্ট্রের অপমৃত্যু: সাদ্দাম, সুবর্ণা এবং আমাদের সামষ্টিক দায়

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

জানুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০৩:৪৭ পিএম

প্রতিহিংসার রাজনীতি ও একটি মানবিক রাষ্ট্রের অপমৃত্যু: সাদ্দাম, সুবর্ণা এবং আমাদের সামষ্টিক দায়

বাগেরহাটের সাবেকডাঙ্গা গ্রামের ধূলিকণায় আজ মিশে আছে এক বিভীষিকাময় আর্তনাদ। ২২ বছরের তরুণী কানিজ সুবর্ণা এবং তাঁর ৯ মাস বয়সী শিশু সেজাদ হাসান নাজিফের নিথর দেহ যখন পাশাপাশি কবরে শুইয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখন সেই মাটির প্রতিটি স্তর যেন আমাদের বিচারব্যবস্থা আর রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এক রাশ ঘৃণা ছুড়ে দিচ্ছিল। এই মৃত্যু কেবল একটি সাধারণ আত্মহত্যা বা হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতি আর আমলাতান্ত্রিক অমানবিকতার এক চরম দলিল।

৯ মাসের শিশু সেজাদ যখন এই পৃথিবীর আলো দেখেছিল, তখন তার বাবা জুয়েল হাসান সাদ্দাম অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। বাবার আঙুল ধরে হাঁটা শেখা তো দূরের কথা, জীবনের ৯টি মাসে বাবার একটি স্নেহের পরশও তার কপালে জোটেনি। সুবর্ণা হয়তো স্বপ্ন দেখেছিলেন, একদিন জেলের তালা খুলবে, স্বামী ফিরবে, আর এই ছোট্ট সেজাদকে বুকে জড়িয়ে ধরবে। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে সেই স্বপ্নগুলো কখন যে ধুলোয় মিশে গেছে, তা আমরা টের পাইনি।

সুবর্ণার এই চরম পথ বেছে নেওয়া আসলে আমাদের সমাজের এক গভীর ক্ষতকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। স্বামী কারাবন্দী, ঘরে কোলের শিশু, হাতে নেই সঞ্চয়—এই ত্রিমুখী চাপে পিষ্ট হয়ে একজন মা যখন নিজের সন্তানকে মেরে নিজে আত্মহুতি দেন, তখন সেই দায়ভার কি কেবল তাঁর একার? নাকি এই প্রতিহিংসার রাজনীতির কারিগরদেরও?

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে নিষ্ঠুর সত্য হলো—যাদের নির্দেশে জুয়েলদের মতো কর্মীরা মাঠে থাকে, সেই 'বড় ভাই'রা আজ নিরাপদ আশ্রয়ে, বিলাসবহুল জীবনে। কিন্তু মাঠের কর্মী যখন মামলা লড়তে গিয়ে নিঃস্ব হয়, স্ত্রী-সন্তানকে হারানোর শোক সয়, তখন সেই নেতারা থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

জুয়েলের বিরুদ্ধে করা মামলার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পাসপোর্টের তথ্য বলছে তিনি ঘটনার সময় বিদেশে ছিলেন, অথচ দেশে তাঁর নামে মামলা হয়েছে। এই 'গায়েবি মামলার' সংস্কৃতি আমাদের রাজনীতিতে এক মরণব্যাধি। আওয়ামী লীগ আমলের সেই বিষবৃক্ষ এখন আরও ডালপালা মেলছে, যা অসংখ্য কানিজ সুবর্ণার সাজানো সংসার তছনছ করে দিচ্ছে।

জুয়েল হাসানের স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রযন্ত্রের সবচেয়ে কদর্য রূপটি আমরা দেখলাম। নিজের স্ত্রী ও সন্তানের জানাজা পড়ার জন্য প্যারোলে মুক্তির আবেদন করা হলেও তা মঞ্জুর করা হয়নি। আইনি মারপ্যাঁচ আর সাপ্তাহিক ছুটির দোহাই দিয়ে একজন পিতাকে তাঁর সন্তানের জানাজা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

২০১৬ সালের প্যারোল নীতিমালা অনুযায়ী, সাত ধরনের নিকটাত্মীয়ের মৃত্যুতে ১২ ঘণ্টার প্যারোল মুক্তি দেওয়ার স্পষ্ট বিধান আছে। কিন্তু জুয়েলকে সেই মুক্তি না দিয়ে বরং কারাফটকে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর স্ত্রী-সন্তানের লাশ দেখতে বাধ্য করা হয়েছে। এটি কেবল অমানবিক নয়, এটি চরম অপমানজনক। আমাদের সংবিধানে যে মানবিক মর্যাদার কথা বলা হয়েছে, কারাফটকের এই দৃশ্য কি তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

অতীতে আমরা দেখেছি, প্যারোলে মুক্তি পেলেও আসামিদের ডান্ডাবেড়ি ও হাতকড়া পরিয়ে জানাজায় নিয়ে আসা হয়। শোককে শৃঙ্খলিত করার এই অসভ্য প্রথা কেন এখনো চলছে? একজন মানুষ যখন তাঁর মা বা সন্তানের জানাজা পড়ছেন, তখন তিনি কি পালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখেন? এই মানসিকতা প্রমাণ করে যে, আমরা এখনো ঔপনিবেশিক আমলের জেল কোডের বাইরে বের হতে পারিনি।

সরকারের উচিত অবিলম্বে প্যারোলে মুক্তির বিধানটি আরও সহজ এবং সরাসরি জেল কর্তৃপক্ষের হাতে ন্যস্ত করা। যাতে ছুটির দিন বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কোনো শোকাতুর মানুষকে এমন পরিস্থিতির শিকার হতে না হয়।

জুয়েল হাসান হয়তো একদিন কারাগার থেকে মুক্তি পাবেন, কিন্তু যে সম্পদ (তার স্ত্রী ও সন্তান) তিনি হারিয়েছেন, তা কি কোনো আদালত বা কোনো সরকার ফিরিয়ে দিতে পারবে? সেজাদ হাসান নাজিফ এই রাষ্ট্রের কাছে নিরাপদ শৈশব চেয়েছিল, কিন্তু রাষ্ট্র তাকে দিয়েছে একটি নিথর দেহ।

আমরা যদি একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি, তবে এই প্রতিহিংসার বৃত্ত ভাঙতে হবে। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে না পারলে, ২০২৬ সালের সংস্কার কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সেজাদদের এই অকাল মৃত্যু আমাদের ইতিহাসের পাতায় এক কালো দাগ হয়ে থাকবে।

আমরা কি সত্যিই সেজাদদের ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আজ প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।

এএন

Link copied!