Amar Sangbad
ঢাকা রবিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩, ২৩ মাঘ ১৪২৯

কী ঘটবে ১০ ডিসেম্বর

আবদুর রহিম

নভেম্বর ২৭, ২০২২, ০২:০৪ এএম


কী ঘটবে ১০ ডিসেম্বর
  • ব্যবসায়ীরাও বড় ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা করতে সতর্ক হচ্ছেন 
  • কূটনীতিকপাড়ার সূক্ষ্ম দৃষ্টি, নড়েচড়ে বসছে আওয়ামী লীগ  
  • যশোর থেকে শেখ হাসিনার আহ্বানে নির্বাচনি সমীকরণ
  • ১০ ডিসেম্বর বিএনপির নির্বাচনের রূপরেখা উপস্থাপন 
  • যুগপৎ গণআন্দোলন, রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা ঘোষণা
  • সরকারবিরোধী দলগুলোরও ১০ ডিসেম্বর নিজ নিজ কর্মসূচি 
  • খালেদা আসবে সমাবেশে, তারেক দেশে, ঘোষণা বিএনপির

কী ঘটবে ১০ ডিসেম্বর! রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। বিএনপির এক ঘোষণার পর থেকে গরম হাওয়া। হামলা-বাধা, আটক ও নিহত হওয়ার ঘটনায়ও দলটি বিচলিত নয়। এক যুগেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা দলটির বিভাগীয় গণসমাবেশগুলোতে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে অন্যরকম দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে। কূটনীতিকপাড়া থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনেও হিসাব চলছে। দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীরাও বড় ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা করতে সতর্ক হচ্ছেন। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগও নড়েচড়ে বসছে, পাল্টা বক্তব্যের পাশাপাশি শুরু করে পাল্টা কর্মসূচিও চলছে। এমন পরিস্থিতে বিএনপি ভোটের মাঠে নামার আগেই আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা অতীত স্টাইলে এবার অনেক আগেই ভোট প্রার্থনা শুরু করেছেন।

গত বৃহস্পতিবার যশোর জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত সমাবেশে তিনি বলেছেন, ‘ভোট দিন, যা চাইবেন বেশি দেবো। আপনারা সুযোগ দিলে আগামী দিনেও উন্নয়ন করব। কাজেই ওয়াদা দিন, আবারও নৌকায় ভোট দিয়ে আমাদের জয়যুক্ত করবেন।’ প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা ও বিএনপির ১০ ডিসেম্বর নিয়ে ১৩ মাস আগ থেকে নির্বাচনি বার্তার সমীকরণ শুরু হয়ে গেছে।

১০ ডিসেম্বরের জনসভা থেকে বিএনপি নির্বাচনের বিষয়টি রূপরেখা উপস্থাপন করবে। সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে অথবা সরকারকে পদচ্যুত করা হবে। তারপর একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। সেই সরকার বর্তমান নির্বাচন কমিশন বাতিল করে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করবে এবং সেই নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এমন দাবি বাস্তবায়নে ওই সমাবেশ থেকে করা হবে যুগপৎ আন্দোলনের রোডম্যাপও। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগকে দেয়া হবে চ্যালেঞ্জ। আগামী ১০ ডিসেম্বরের আলোচিত মহাসমাবেশে যুগপৎ গণআন্দোলনের ১০ দফা ও রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা ঘোষণা করা হবে। একই দিন সমমনা দলগুলো নিজ নিজ দলীয় মঞ্চ থেকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের রূপরেখা ঘোষণাও দিতে পারে।

সমপ্রতি এ নিয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমান বলেন, ‘আগামী ১০ ডিসেম্বরের পরে দেশ চলবে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের কথায়।’ দলের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী লক্ষ্মীপুরে দলীয় কর্মসূচিতে বলেন, ‘শিগগির তারেক রহমান দেশে আসবেন’।

তার পরদিন দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, ‘১০ ডিসেম্বর ঢাকায় সমাবেশ হবে আটলান্টিক মহাসাগরের মতো। এই সমাবেশে খালেদা জিয়া যাবেন।’ এমন ঘোষণার উত্তেজনায় সমাবেশ নিয়ে চলছে তর্ক-বিতর্ক।

জানা গেছে, রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১০ ডিসেম্বর বিএনপিকে মহাসমাবেশের অনুমতি দিচ্ছে সরকার। তবে মহাসমাবেশের জন্য নয়াপল্টন নিয়েই বিএনপি নেতাদের কঠোর ঘোষণা। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনেই মহাসমাবেশ করার ব্যাপারে অনড় তারা।

গত বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘বিএনপির রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে। শর্তসাপেক্ষে বিএনপিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১০ ডিসেম্বর সমাবেশের অনুমতি দেয়া হবে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানো যাবে না। প্রতিবন্ধকতা ও জনদুর্ভোগ করা যাবে না।’

এ নিয়ে তাৎক্ষণিক বিএনপির প্রচার সম্পাদক ও মিডিয়া সেলের সদস্য সচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী জানান, ‘বিএনপি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি চায়নি। শুধু নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অনুমতি চেয়েছে।’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপির ঢাকার সমাবেশ নয়াপল্টনেই হবে। এখানে বাধা দেয়ার সুযোগ নেই।’

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘নয়াপল্টনে সমাবেশ করতে অনুমতি চেয়েছি। অনুমতি দিলেও ওখানে সমাবেশ করব, না দিলেও সমাবেশ করব সেখানে।’ গত সোমবার গুলশান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমাবেশের ভেন্যুর স্থান নিয়ে দলের অবস্থান স্পষ্ট করে জানান, ‘১০ ডিসেম্বর ঢাকার বিভাগীয় সমাবেশ ঘোষিত স্থানেই হবে ও নির্দিষ্ট দিনেই হবে।’

এর পরের দিন মঙ্গলবার নয়াপল্টনে এক সমাবেশেও তিনি একই বিষয় উল্লেখ করে বলেন, ‘১০ ডিসেম্বর নয়াপল্টনেই মহাসমাবেশ হবে। এটি জনগণের ঘোষণা। ওই দিন শান্তিপূর্ণ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। সেই সমাবেশ থেকে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

বিএনপি নেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গণআন্দোলনে সরকারবিরোধী দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছেছে। এরই মধ্যে নিজ নিজ ব্যানারে দাবি আদায়ের আন্দোলনের কর্মসূচিও পালন করছে তারা। এখন শুধু যুগপৎ আন্দোলন আনুষ্ঠানিকতা বাকি। চলতি সপ্তাহে সমমনা দলগুলোর সাথে চূড়ান্ত বৈঠকে আলোচনা শেষ করে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হবে। ইতোমধ্যে যুগপৎ আন্দোলন থেকে দাবিগুলোও তিন দফায় রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে ঠিক করা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন, বর্তমান কমিশন বিলুপ্ত করে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন, খালেদা জিয়াসহ সব বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী, সাংবাদিক ও আলেমদের সাজা বাতিল এবং মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের পাশাপাশি নতুন মামলায় গ্রেপ্তার বন্ধ ও সভা-সমাবেশে বাধা সৃষ্টি না করা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ ও বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪-সহ মৌলিক মানবাধিকার হরণকারী সব কালাকানুন বাতিল, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস, পানিসহ জনসেবার সব খাতে দর বাড়ানোর গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা।

গত ১৫ বছরে বিদেশে অর্থপাচার, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত ও শেয়ারবাজারসহ রাষ্ট্রীয় সব ক্ষেত্রে সংঘটিত দুর্নীতি চিহ্নিত করার লক্ষ্যে কমিশন গঠন, গুমের শিকার সব নাগরিককে উদ্ধার, বিচার বহির্ভূত হত্যা ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের প্রতি ঘটনার দ্রুত বিচারসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, উপাসনালয় ভাঙচুর ও সম্পত্তি দখলের বিচার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও বিচার বিভাগে সরকারি হস্তক্ষেপ বন্ধ করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়ার কথা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) সভাপতি ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ আমার সংবাদকে বলেছেন, ‘বিগত ছয় মাস আগে পর্যন্ত ধৈর্য ধরে এবং ভয়ে মানুষ চুপচাপ ঘরে বসে ছিল। কিন্তু বিগত দুই মাস ধরে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং অমানবিক কষ্ট সহ্য করে, ভয়কে জয় করে, নিজের পয়সা খরচ করে, নিজ উদ্যোগে জীবনের মায়া ত্যাগ করে, বিএনপির জনসভাগুলোতে অংশগ্রহণ করে যাচ্ছে, যা অকল্পনীয়। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলায় বিএনপির সাত-আটজন নেতাকে রাজনৈতিক কারণে হত্যা করেছে। কয়েকশ নতুন মিথ্যা মামলা করেছে। হাজার হাজার বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীকে হয়রানি করার জন্য আসামি করা হয়েছে। পুলিশের নির্যাতনের কারণে অনেকে নিজ গৃহে ঘুমাতে পারে না। কিছু কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারী অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ ও তাদের নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য, অবৈধ সরকারকে নগ্নভাবে অবৈধ কর্মকাণ্ডে সাহায্য করে যাচ্ছে। সরাসরি জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছে। যে বা যারা অতীতে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছিল, তাদের কিন্তু শেষ পরিণতি সুখকর হয়নি।’
 

Link copied!