চট্টগ্রাম ব্যুরো
অক্টোবর ২৫, ২০২৫, ১১:১৭ পিএম
চট্টগ্রামের জেলার রাউজান উপজেলায় দিনের বেলায় প্রকাশ্যে নিজ বাড়ির অদূরে গুলি করে এক যুবদল কর্মীকে খুন করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মোটরসাইকেল চালিয়ে যাওয়ার পথে আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে অতর্কিতে গুলি ছোড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
শনিবার বিকেলে রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চারাবটতল এলাকার রশিদারপাড়া সড়কে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষা, শনিবার বিকেল পাঁচটার কিছু আগে আলমগীর পাশের রশিদার পাড়া থেকে আত্মীয়ের বাড়ি থেকে দাওয়াত খেয়ে মোটরসাইকেলে নিজ বাড়ির পথে ফিরছিলেন। তার স্ত্রী ও সন্তান একটি অটোরিকশায় পেছনে ছিলেন। চারাবটতল এলাকার কায়কোবাদ জামে মসজিদের পাশে কবরস্থানে ওঁৎ পেতে থাকা অন্তত আটজন অস্ত্রধারী হঠাৎ বেরিয়ে এসে আলমগীরের মোটরসাইকেল লক্ষ্য করে গুলি চালায়। ঘটনা স্থলেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
স্থানীয়রা জানান, গুলি চালানোর পর হামলাকারীরা দ্রুত রাঙ্গামাটি সড়ক দিয়ে পালিয়ে যায়। আলমগীরের শরীরে অন্তত পাঁচটি টি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ সময় আলমগীরের আত্মীয় মুহাম্মদ রিয়াদ (২৫) গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, আলমগীর আগে অপরাধ জগতে যুক্ত ছিলেন।
এ হত্যাকাণ্ডে এলাকায় ফের ছড়িয়ে পড়েছে উত্তেজনা। স্থানীয়রা বলছেন, গত কয়েক মাসে রাউজান যেন পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক সহিংসতার নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে।
প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, পুরোনো শত্রুতা কিংবা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযান চলছে।
রাতে নিহত আলমগীরের বাড়ি গেলে দেখা যায়, পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্ত্রী সুলতানা বেগম বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন।
তিনি বলেন, ও আজ খুশি মনে দাওয়াত খেয়ে ফিরছিল। কে জানত পথে ওঁৎ পেতে ছিল খুনি!
নিহতের বড় ভাই নুরুল ইসলাম বলেন, আমার ভাই রাজনীতি করত, কিন্তু কারও ক্ষতি করত না। কয়েক মাস হলো জেল থেকে মুক্ত হয়ে সংসারের দায়িত্ব নিচ্ছিল। কে বা কারা ওকে মারল, বুঝতে পারছি না।
এ মাসের ৭ অক্টোবর রাউজানের আরেক বিএনপি কর্মী মুহাম্মদ আবদুল হাকিমকে (৫২) মদুনাঘাট এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। তখনও তিনি নিজ বাড়ি খামারবাড়ি থেকে ফিরছিলেন। ১৮ দিনের ব্যবধানে ফের ঘটল একই রকম হত্যাকাণ্ড।
এই দুই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে মিল থাকায় পুলিশের ধারণা, একই ধরনের সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী চক্র এসব ঘটনার পেছনে থাকতে পারে।
নিহত আলমগীর আলম রাউজান পৌরসভার ঢালার মুখ এলাকার বাসিন্দা। তার পিতা আবদুস সত্তার।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘদিন কারাভোগ করেন। চলতি বছরের আগস্টে সরকার পতনের পর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।
রাউজান পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি সৈয়দ মনজুরুল হক অবশ্য দাবি করেন, নিহত ব্যক্তি বিএনপি বা এর কোনো সহযোগী সংগঠনের কর্মী ছিলেন না। আলমগীর কখনো দলের পদে ছিলেন না, এখনো নন বলেন তিনি।
তবে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির বিলুপ্ত কমিটির আহ্বায়ক গোলাম আকবর খোন্দকার এক বিবৃতিতে নিহতকে যুবদল কর্মী বলে দাবি করেন এবং হত্যার তীব্র নিন্দা জানান।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, আওয়ামী শাসনামলে দীর্ঘ ১২ বছর কারাভোগের পর আলমগীর সম্প্রতি মুক্তি পান। রাউজানে বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিবেশে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তিনি অবিলম্বে হত্যাকারী ও এর নির্দেশদাতাদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, সরকার পরিবর্তনের পর গত ৫ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত রাউজানে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৭ জন নিহত হয়েছেন, এর মধ্যে ১২ জনই রাজনৈতিক হত্যার শিকার।
বিএনপি–আওয়ামী লীগ ছাড়াও বিএনপির ভেতরের দুই পক্ষের সংঘর্ষেও রক্তপাত হয়েছে। শতাধিক সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন অন্তত ৩৫০ জন মানুষ।
স্থানীয়রা বলছেন, দলীয় আধিপত্য, পুরোনো শত্রুতা, আর অপরাধচক্রের মিশ্রণে রাউজান এখন এক অগ্নিগর্ভ এলাকা।
চারাবটতল এলাকার দোকানপাট হত্যাকাণ্ডের পর দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়। সন্ধ্যার আগেই বাজারে নেমে আসে নীরবতা।
স্থানীয় দোকানদার নুরুল কবির বলেন, এখন আর কেউ নিশ্চিত নয়, কখন কাকে গুলি করবে। এখানে রাজনীতি মানেই ভয়।
রাউজান পৌরসভার এক শিক্ষক বলেন, প্রায় প্রতি সপ্তাহেই নতুন করে কারও লাশ পড়ছে। প্রশাসন কড়াকড়ি না বাড়ালে পুরো এলাকা অচল হয়ে যাবে।
রাউজান থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঘটনাস্থলের আশপাশে অভিযান চলছে, সন্দেহভাজন কয়েকজনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। খুব শিগগিরই হত্যাকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।
চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার বলেন, রাউজানে সাম্প্রতিক হত্যাগুলো পারস্পরিক প্রতিশোধের শৃঙ্খল। রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সঙ্গে অপরাধী চক্রগুলো নিজেদের স্বার্থ মেলাচ্ছে। আমরা চক্রটিকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি।
স্থানীয় বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সরকার পরিবর্তনের পর রাউজানে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য ভেঙে পড়েছে। এর ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে প্রতিহিংসার দৌড় চলছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলেন, এটি কেবল রাজনৈতিক নয়, সামাজিক আধিপত্যেরও লড়াই। প্রশাসন যদি নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ না করে, তাহলে এই সহিংসতা আরও ছড়িয়ে পড়বে।
ইএইচ