আমার সংবাদ ডেস্ক
এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ০৫:৪৫ পিএম
সারাদেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে হাম। গত কয়েক সপ্তাহে রাজধানীসহ দেশের ৫৮টি জেলায় এই রোগের সংক্রমণ তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারাদেশে হামের উপসর্গ নিয়ে কয়েক হাজার শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং প্রাণ হারিয়েছে দুই শতাধিক শিশু।
সোমবার হাইকোর্ট থেকেও হামের বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে শিশুদের সুরক্ষায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের ওপর প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য বুলেটিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এ পর্যন্ত সারাদেশে ৩১ হাজারের বেশি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ হয়েছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র মতে, হামের জটিলতায় মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক। ঢাকা বিভাগে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি।
এছাড়া চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতেও আশঙ্কাজনক হারে হাম ছড়িয়ে পড়ছে। আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ৫ বছরের কম বয়সী শিশু। এর মধ্যে একটি বড় অংশ ৯ মাসের কম বয়সী শিশু, যারা এখনো নিয়মিত টিকা কর্মসূচির আওতায় আসেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে নিয়মিত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ২০১৯ ও ২০২০ সালের পর সারাদেশে বড় কোনো হাম ও রুবেলা ক্যাম্পেইন না হওয়ায় প্রায় ৪৩ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় বাইরে থেকে গেছে। মূলত এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অভাবই বর্তমান প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এর প্রাথমিক লক্ষণগুলো হলো তীব্র জ্বর যা ১০৩ থেকে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং কাশি। এছাড়াও চোখ লাল হওয়া এবং চোখ দিয়ে পানি পড়া, মুখে ও মাড়িতে সাদাটে দাগ এবং ৩ থেকে ৫ দিন পর মুখমণ্ডল থেকে শুরু করে সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা রেশ দেখা দেওয়া।
হাম আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে সঠিক যত্ন ও চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণ হাম থেকে অনেক সময় নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহ হতে পারে, যা মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আক্রান্ত শিশুকে পর্যাপ্ত বিশ্রামে রাখতে হবে। তাকে প্রচুর পরিমাণে পানি, খাবার স্যালাইন এবং পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, হাম আক্রান্ত সব শিশুকে চিকিৎসকের পরামর্শে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই ডোজ ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে। এটি অন্ধত্ব ও মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। শিশু যদি বুকের দুধ পান করে, তবে কোনোভাবেই তা বন্ধ করা যাবে না। সংক্রমণ রোধে আক্রান্ত শিশুকে সুস্থ শিশুদের থেকে আলাদা ঘরে রাখতে হবে অন্তত ১০ দিন। যদি শিশুর শ্বাসকষ্ট হয়, খিঁচুনি দেখা দেয় বা দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া হয়, তবে বিলম্ব না করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে।
হাম প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। একমাত্র সময়মতো টিকাদানই পারে শিশুকে এই প্রাণঘাতী রোগ থেকে বাঁচাতে। নিয়মিত টিকাদান সূচি অনুযায়ী শিশুকে ৯ মাস পূর্ণ হলে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ হাম ও রুবেলা টিকা অবশ্যই দিতে হবে।
যারা আগে টিকা নিতে পারেনি, তাদের জন্য সরকার বর্তমানে বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করছে। নিকটস্থ টিকাদান কেন্দ্রে যোগাযোগ করে শিশুকে টিকা দিন। হাম হলে কবিরাজি বা অপচিকিৎসা না করে আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণ করুন। হাম হলে গোসল করানো যাবে না বা তেল লাগানো যাবে না, এ ধরণের কুসংস্কারে কান দেবেন না।
বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার গত ৫ এপ্রিল থেকে দেশের ১৮টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। এছাড়া ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের সুরক্ষায় ৬ মাস বয়স থেকেই এক ডোজ বিশেষ টিকা বা আউটব্রেক ডোজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, টিকার ঘাটতি মেটাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং গ্যাভির সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে শুধুমাত্র সরকারি প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা।
আপনার শিশুকে সময়মতো টিকা দিন এবং আশেপাশে কেউ আক্রান্ত হলে দ্রুত স্বাস্থ্যকর্মীকে জানান। মনে রাখবেন, সঠিক সময়ে এক ডোজ টিকাই পারে একটি শিশুর জীবন বাঁচাতে। আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়াই এখন সময়ের দাবি।
জেএইচআর