মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং বর্তমানে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে তাঁর এই বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক স্টান্টবাজি’ এবং বিএনপির ‘ঈদের পরের আন্দোলনের’ মতো বলে মন্তব্য করছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশ্লেষকদের ধারণা, শেখ হাসিনা দেশে ফেরার মতো এত বড় ঝুঁকি শেষ পর্যন্ত নেবেন না।
সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা এই আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অডিও ক্লিপ ফাঁসের মাধ্যমেও তিনি একাধিকবার দেশে ফেরার কথা বলেছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারী, শেখ হাসিনার এই বক্তব্যকে পুরোপুরি রাজনৈতিক স্টান্টবাজি মনে করছেন। কোন ডিসেম্বরে তিনি আসবেন, তা স্পষ্ট করেননি বলে মন্তব্য করেন এই শিক্ষক। তাঁর মতে, ২০২৬ সালের ডিসেম্বর নাকি তার পরের কোনো ডিসেম্বরের কথা বলা হচ্ছে, তা অনিশ্চিত। বিএনপির ঈদের পরের আন্দোলনের প্রতিশ্রুতির মতোই এটি একটি ফাঁকা আওয়াজ হতে পারে।
ড. নুরুল আমিন বেপারী আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতন হওয়ায় আওয়ামী লীগের সেই সাহস এখন আর নেই। আন্তর্জাতিক লবিও এখন দলটির পেছনে নেই। দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে আদালতের মুখোমুখি হয়ে ফাঁসির আসামির পোশাক ও ট্রিটমেন্ট নিতে হবে। ভারতও এক সময় শেখ হাসিনাকে বোঝা মনে করবে। বর্তমান সরকার চীনমুখী হওয়ায় এবং তিস্তা প্রকল্পের কাজ শুরু হলে ভারতের কৌশলগত অবস্থান বদলে যেতে পারে। মূলত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভয় কাটাতে ও হুমকি দিতেই এই বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে।
শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আওয়ামী লীগের পক্ষে জনমত গড়ে ওঠার কোনো পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। ড. নুরুল আমিন বেপারী মনে করেন, শেখ হাসিনা এলে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের সব শক্তি তাৎক্ষণিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যাবে। ফলে নিষিদ্ধ দলটির কর্মীরা কোনো সাহস পাবে না, বরং গ্রেপ্তার হবে।
দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রচুর অর্থসম্পদের মালিক হয়ে ভোগবাদী দলে পরিণত হয়েছেন। টাকা-পয়সার মালিক হলে কেউ আর সহজে আন্দোলনমুখী হয় না। দলটির অনেক জনপ্রতিনিধি ও নেতাকর্মী ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। ২৪-এর মতো আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সফল হওয়ার পরিবেশ না হওয়া পর্যন্ত তারা দেশে ফেরার ঝুঁকি নেবে না। ফলে এই বক্তব্য দিয়ে নেতাকর্মীদের ব্যাপকভাবে উজ্জীবিত করা সম্ভব নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের আরেক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আইনুল ইসলামও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এই দাবিকে স্রেফ স্টান্টবাজি বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন বা আত্মসমর্পণ করবেন, এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। এটি কেবল কর্মীদের চাঙ্গা রাখার একটি রাজনৈতিক চাল।
অধ্যাপক আইনুল ইসলাম আরও যোগ করেন, বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত। তবে দেশে এলে তাঁকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। মূলত আইনি প্রক্রিয়া ফাঁকি দেওয়ার জন্যই তাঁরা দেশ ছেড়েছেন। তাই এখন আইন মোকাবেলা করতে আদৌ তিনি দেশে আসবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন