Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ২৫ মে, ২০২২, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

আজ বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস

দিনদিন কমছে পাখির সংখ্যা

এমএইচ তানভীর

এমএইচ তানভীর

মে ১৪, ২০২২, ০১:৫১ এএম


দিনদিন কমছে পাখির সংখ্যা

পাখির কলকাকলি পছন্দ করে না এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। অপরূপ এই প্রকৃতির সৌন্দর্যের মাঝে বড় একটি অংশ রয়েছে পাখির দখলে। শুধু সৌন্দর্যই নয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রয়েছে তাদের। শীতকালে বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে ছুটে আসে নানারকম অতিথি পাখি। এ ছাড়া বছরের অন্যান্য ঋতুতেও দেখা মিলে হরেক প্রজাতির এসব পরিযায়ী পাখিদের। 

কিন্তু দিনে দিনে কমতে শুরু করেছে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা। প্রতি বছর বাংলাদেশ বার্ডস ক্লাব ও বন অধিদপ্তর মিলে প্রকৃতি সংরক্ষণ-বিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের সহযোগিতায় পাখিশুমারি করে থাকে। এবারো দেশের কয়েকটি অঞ্চলে পাখি গণনা করে বার্ডস ক্লাব। 

এসব এলাকায় বিগত বছরের চেয়ে পাখির সংখ্যা কমতে দেখা গেছে। এর মধ্যে টাঙ্গুয়ার হাওরে ২ ও ৩ জানুয়ারি পাখিশুমারি পরিচালিত হয়। এই দুই দিনে ৩৬ প্রজাতির ২৭ হাজার ১৭০টি পাখি গণনা করা হয়, যাদের মধ্যে ৩৩ প্রজাতির ২৭ হাজার ১৬৭টি ছিল জলচর পাখি।

পরিযায়ী বুনোহাঁসদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে লালমাথা-ভুতিহাঁস সাত হাজার ৩৩২টি, এরপর আছে মরচেরঙ-ভুতিহাঁস সাত হাজার ২০৫টি। বিগত বছরে এখানে প্রায় দ্বিগুণ সংখ্যক পাখি এসেছিল।

জাতীয় পাখিশুমারির তথ্যমতে, ২০২১ সালে দেশে মোট এক লাখ ২৫ হাজার ১১৫টি পাখি দেখা গিয়েছিল। টাঙ্গুয়ার হাওরে ৬১ হাজার ১২৫টি, হাকালুকিতে ২৫ হাজারটি, উপকূল অঞ্চলে ৩০ হাজারটি, পদ্মার চরে চার হাজারটি ও অন্যান্য জলাভূমিতে পাঁচ হাজারটি পাখি গণনা করা হয়।

২০২০ সালে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা ছিল এক লাখ ৪৫ হাজার ৫১৯টি। এর মধ্যে টাঙ্গুয়ার হাওরে ৫১ হাজার ৩৬৮টি, হাকালুকিতে ৪০ হাজার ১২৬টি, উপকূল অঞ্চলে ৩৫ হাজারটি, পদ্মার চরে চার হাজার ২৫টি এবং অন্যান্য জলাভূমিতে ১৫হাজার পাখির দেখা মেলে। 

তারও আগে ২০১৯ সালে শুধু টাঙ্গুয়ার হাওরে এক লাখ ৪৬ হাজার পরিযায়ী পাখি দেখা গিয়েছিল। সে বছর দেশের গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিগুলোতে প্রায় আড়াই লাখ পরিযায়ী পাখি এসেছিল। এত বিপুল পাখি দেখা যাওয়ায় দেশের প্রকৃতিপ্রেমীরা বেশ আনন্দিত হয়েছিলেন। কিন্তু তার পরের বছর থেকেই বাংলাদেশে পরিযায়ী পাখি আসা কমতে শুরু করে।

পরিযায়ী পাখির আবাসস্থলকে নিরাপদ রাখা ও বিচরণস্থল সংরক্ষণে উদ্যোগী হওয়ার জন্য জাতিসংঘের পরিবেশ-বিষয়ক কর্মসূচির আওতায় প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় শনিবার ‘বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস’ পালিত হয়।

এবারের বিশ্ব পাখি দিবসের প্রতিপাদ্য ‘পাখি আমাদের বিশ্বকে সংযুক্ত করে’। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে প্রতিবার দেশে দিনটি উদযাপন করা হলেও এবার জাতীয়ভাবে কোনো কর্মসূচি থাকছে না। 

পাখি গণনার সাথে যুক্ত সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে ৯ থেকে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার উপকূলীয় ৬০টি চরে জলচর পাখিশুমারি-২০২২ পরিচালিত হয়।

ওই জরিপে ৫৮ প্রজাতির মোট ৩৩ হাজার ৬৪টি জলচর পাখি গণনা করা হয়। এর মধ্যে উল্লোখযোগ্য বৈশ্বিকভাবে বিপন্ন পাখি দেশি গাংচোষা ৫৪০টি এবং বাদামি মাথা গাংচিল চার হাজার ১৬২টি পাওয়া গেছে।

 সূত্রটি জানায়, ২০০০ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত জরিপে উপকূলে প্রায় ৭০ ভাগের মতো পাখি কমেছে। ২০০০ সালের শুমারিতে পাখির সংখ্যা এক লাখের মতো থাকলেও ২০২২ সালে তা কমে ৩৩ হাজার ৬৪টিতে দাঁড়িয়েছে। 

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব ও আইইউসিএনের পর্যবেক্ষণ বলছে, গত ২০ বছরে বাংলাদেশে এসব পাখির বসতি এলাকাও ৩৫ শতাংশ কমেছে। মূলত টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর, বাইক্কার বিল, উপকূলীয় এলাকা, নদীর চর ও দেশের অভ্যন্তরীণ বিল এবং জলাশয়গুলোতে বসতি গড়ে পরিযায়ী পাখি। দেশে যে ৭১১ প্রজাতির পাখি দেখা যায়, তার মধ্যে ৩৮৮ প্রজাতি হচ্ছে পরিযায়ী। 

এরা মূলত মঙ্গোলিয়া, তিব্বত, চীন, ভারত, কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান ও রাশিয়া থেকে আসে। এদের মধ্যে ২০০ প্রজাতির পাখি আসে শুধু শীতকালে। তবে গ্রীষ্মকালেও ১১ প্রজাতির পাখি বাংলাদেশে আসে। অন্যান্য পরিযায়ী পাখি বছরের অন্যান্য ঋতুতে এসে থাকে। 

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সদস্য ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী সানজীদ বলেন, পরিযায়ী পাখি ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে পাখিদের আবাসস্থল ধ্বংস করা। জনসংখ্যা ব্যাপক বৃদ্ধির কারণে পৃথিবীজুড়ে বন উজাড় করে কৃষিজমিতে রূপান্তর করা হচ্ছে এবং বসতি তৈরি হচ্ছে।

জলজ পাখিগুলো দূষণ, পানিস্বল্পতা ও কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে মারা যাচ্ছে। অথচ ওরাই ছিল আমাদের প্রাকৃতিক কীটনাশক। এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন হতে হবে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শায়ের মাহ্মুদ ইবনে আলম বলেন, ‘আমরা দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি চরে পাখি নিয়ে গবেষণা করি। বেশির ভাগ স্থানে পাখির জন্য যেমন নিরিবিলি জায়গা প্রয়োজন সেটা নেই। সব খানে মানুষের বিচরণ আছে।

আবার কোথাও কোথাও জলাভূমিগুলো ভরাট ও দূষিত হয়ে পাখির বসবাসের অনুপযোগী হয়ে ওঠছে। আমাদের বড় হাওর ও বিল এবং সুন্দরবনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সুরক্ষা দিতে হবে। তাহলে দেশে পরিযায়ী পাখি আসা আবারো বাড়বে।’ 

বন অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক মোল্যা রেজাউল করিম বলেন, ‘এবার আমরা জাতীয়ভাবে পরিযায়ী পাখি দিবস পালন করছি না। তবে বিভিন্ন অঞ্চলে স্বল্প পরিসরে কর্মসূচি পালন করা হবে। 

তিনি আরও বলেন, এখন মানুষ আর আগের মতো পাখি শিকার করে না। তরুণরা এখন পাখি সংরক্ষণে অনেক বেশি পরিবেশসচেতন, কোনো অসঙ্গতি দেখলে তারা এগিয়ে আসে। বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একেক সময় একেক রকম পাখি দেশে আসে।’