নিজস্ব প্রতিবেদক
ফেব্রুয়ারি ১, ২০২৬, ০১:২৩ পিএম
পঞ্জিকার পাতা উল্টে ক্যালেন্ডারে আজ পহেলা ফেব্রুয়ারি। ইংরেজি বর্ষের এই দ্বিতীয় মাসের প্রতিটি দিন বাঙালির অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে এক গভীর অনুরাগ আর গর্বের মিশেলে। শীতের আমেজ কাটিয়ে প্রকৃতির রুক্ষতা ভেদ করে যখন পলাশ আর শিমুল ফোটার ক্ষণ আসে, ঠিক তখনই বাঙালি হৃদয়ে ধ্বনিত হয় সেই অবিনাশী স্লোগান— ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। শুরু হলো আমাদের ভাষার মাস, রক্ত দিয়ে অক্ষর কেনা গৌরবের ফেব্রুয়ারি।
বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রথম সফল মহড়া ছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মাতৃভাষার মর্যাদায় ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার আর শফিউরের তাজা রক্তে। সেই রক্তের ধারা গড়িয়ে গেছে ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে, যার পথ ধরে আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা পালন করছি এই ঐতিহাসিক স্মারক।
দীর্ঘ ৭৪ বছরের এই পরিক্রমায় বাংলা ভাষা কেবল বাংলাদেশের ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সীমানায় আটকে নেই। বাঙালির অলংকার এই ভাষা আজ ইউনেস্কোর স্বীকৃতিতে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে সারা বিশ্বের ২০০টি দেশে পালিত হয়। ৫২-এর সেই মিছিল যেন এক অমর রিলে রেস, যার ব্যাটন হাতে নিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বয়ে নিয়ে চলেছে গৌরবের জয়গাথা।
ফেব্রুয়ারি মাসের আগমন মানেই এক অন্যরকম হাহাকার আর পরম পাওয়ার অনুভূতি। এই মাসে শহীদ মিনারে ঢল নামে লাখো মানুষের, খালি পায়ে শ্রদ্ধার অর্ঘ্য অর্পণ করা হয় সেই বীরদের প্রতি যারা কথা বলার অধিকারটুকু ছিনিয়ে এনেছিলেন। এবারের ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জন্য আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ডিজিটাল বিপ্লব আর বিশ্বায়নের যুগেও বাংলা ভাষা তার স্বকীয়তা ধরে রেখে বিশ্বের বুকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম মাতৃভাষা হিসেবে বাংলার যে ব্যাপ্তি ও প্রসার, তা শুরু হয়েছিল এই ফেব্রুয়ারি মাসেরই এক রক্তক্ষরা দিনে। স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত রাজপথ থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজ জাতিসংঘ পর্যন্ত পৌঁছেছে। তাইতো ফেব্রুয়ারি মানে কেবল শোকের মাস নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের জয়োৎসব।
ভাষা বহমান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাষার বিবর্তন ঘটে, নতুন শব্দ যুক্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিকৃতি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সত্য একটাই— এই ভাষা আমাদের মায়ের ভাষা। বর্তমানে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) যুগে বাংলার প্রয়োগ এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে এর ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে যে, ১৯৫২ সালের সেই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি।
আজ পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে মাসজুড়ে দেশজুড়ে চলবে নানা আয়োজন। অমর একুশে বইমেলা, কবিতা উৎসব আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখরিত থাকবে নগর-বন্দর। প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে এখন বেজে উঠছে সেই চিরচেনা সুর, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’
ফেব্রুয়ারি আসে বাঙালির চেতনাকে শানিত করতে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো অপশক্তিই বাঙালির কণ্ঠস্বরকে রোধ করতে পারে না। ভাষার মাসের এই প্রথম প্রভাতে বিনম্র শ্রদ্ধা সেই সকল ভাষাশহীদদের প্রতি, যাদের জীবনের বিনিময়ে আমরা আজ স্বাধীনভাবে নিজের ভাষায় কথা বলতে পারছি।
এএন