নিজস্ব প্রতিবেদক
ডিসেম্বর ৫, ২০২৫, ০৩:১৩ পিএম
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার লন্ডন স্থানান্তর নিয়ে আবারও তৈরি হয়েছে আলোচনা সমালোচনা। চিকিৎসার অতি প্রয়োজনীয়তার কারণে কিছুদিন ধরেই তাকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। অবশেষে কাতার থেকে বিশেষায়িত এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ঢাকায় পৌঁছাবে শনিবার, এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে দেখা দেয় কারিগরি ত্রুটি। সেই ত্রুটির কারণে বৃহস্পতিবার রাতে খালেদা জিয়ার লন্ডনে যাওয়া স্থগিত হয়ে যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটির দুইটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অংশের সমস্যার কারণে চিকিৎসক দল নিরাপদে নেওয়ার জন্য কোন ঝুকিতে যেতে চাইনি,
এদিকে দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রস্তুতিমূলক কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন থাকলে এবং নতুন বিমানের অনুমোদন পেলে আগামী রোববা লন্ডনের উদ্দেশে রওনা দিতে পারেন বেগম খালেদা জিয়া।
বিএনপি নেতারা বলছেন, দেশ ছাড়ার এই প্রক্রিয়া এখন সময়ের প্রশ্ন মাত্র; তবে প্রতিবারের মতো এবারও শেষ মুহূর্তে নানা জটিলতা তৈরি হওয়ায় দলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ইতোমধ্যেই ঢাকায় পৌঁছেছেন। তিনি নিজেই চেয়েছিলেন শাশুড়ির লন্ডন যাত্রা ও চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নিতে। তার উপস্থিতি বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে ভিন্নধর্মী আলোচনারও।
দলীয় সূত্র বলছে, গত দুই বছরে তারেক রহমানের দেশে না ফেরার পটভূমিতে ডা. জোবাইদা রহমানের আগমনকে অনেকেই ‘কৌশলগত রাজনৈতিক বার্তা’ মনে করছেন। কারণ বিএনপির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত, সাংগঠনিক পুনর্গঠন, আন্দোলনের দিকনির্দেশনা এবং নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতিতে পরিবারটির ভূমিকা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সবসময়। এই প্রেক্ষাপটে ডা. জোবাইদার উপস্থিতি অনেক বিশ্লেষকের মতে রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিতও বহন করছে।
বিএনপির কয়েকজন স্থায়ী কমিটির সদস্য জানিয়েছেন, বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থা দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার মধ্যে দ্রুতই জটিল হচ্ছে। বিদেশে নিবিড় চিকিৎসার জন্য কাতারের এয়ার অ্যাম্বুলেন্সই তাদের মূল ভরসা ছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়াই এসে আটকে গেছে প্রযুক্তিগত ত্রুটিতে।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের লাইফ সাপোর্ট ইউনিটে সংযুক্ত দুইটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রের সমন্বয়গত অসঙ্গতি ধরা পড়ে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী রোগী পরিবহন বিশেষজ্ঞরা যন্ত্রগুলো ঠিক করা না গেলে ফ্লাইট ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেন। বর্তমানে আরেকটি এয়ার অ্যাম্বুলেন্স নিশ্চিত করার উদ্যোগ চলছে। সব ঠিক থাকলে ৭ ডিসেম্বর সকালেই ফ্লাইট নিশ্চিত হতে পারে।
খালেদা জিয়ার লন্ডন যাত্রা ঘিরে যেখানে তার পুত্র তারেক রহমানের উপস্থিতির সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন দলীয় নেতারা, সেখানে তারেক এখনও লন্ডনেই অবস্থান করছেন। তাঁর দেশে না ফেরা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা সমালোচনা তীব্র হয়েছে।
শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে কিছু না বললেও দলীয় ভেতরে প্রশ্ন উঠছে এত সংকটেও কি তাকে দেশে ফিরতে প্ররোচিত করতে পারছে না পরিস্থিতি?
অন্যদিকে বিএনপি নেতাদের একটি অংশ বলছে, আইনি জটিলতা এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে তারেক রহমানের দেশে ফেরার কোন কারণ দেখি না সরকার বলছে বারবার।
তবে সমালোচকরা মনে করছেন, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের এই বিচ্ছিন্নতা মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে পরিবারসহ অবস্থানকারী ডা. জোবাইদা রহমান এত দিনে ঢাকায় ফিরে আসার মধ্য দিয়ে বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে তার সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, তারেক রহমান দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে, খালেদা জিয়া ক্রমাগত অসুস্থ। এই অবস্থায় বিএনপি যাকে ‘পরিচ্ছন্ন বিকল্প নেতৃত্ব’ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, তিনি হচ্ছেন ডা. জোবাইদা।
যদিও পরিবার ও দল দু’পক্ষই বিষয়টিকে চিকিৎসা–কেন্দ্রিক সফর হিসেবে ব্যাখ্যা করতে চাইছে, তবুও রাজনৈতিক মহলে আলোচনার ঢেউ থামছে না।
বিএনপির বাইরে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও ঘটনাপ্রবাহকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বেগম জিয়ার বিদেশযাত্রা ঘিরে বিএনপি রাজনৈতিক সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে বিএনপির অনেক নেতা মনে করছেন ভালো কিছুর জন্য একটু দেরি হলেও সমস্যা নেই। তবে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের কারিগরি ত্রুটি ছিল আন্তর্জাতিক কোম্পানির অভ্যন্তরীণ সমস্যা এটাই স্পষ্ট করে জানিয়েছে বিএনপি।
বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খালেদা জিয়াকে দ্রুত লন্ডনে নেওয়ার বিষয়টি দলব্যাপী অগ্রাধিকার পেলেও এর সাথে যুক্ত অনিশ্চয়তা এবং পরপর বিলম্ব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা মনে করছেন, নেত্রীকে দ্রুত বিদেশে পাঠানো না গেলে দলের মনোবল আরও দুর্বল হবে।
এদিকে ডা. জোবাইদার ঢাকায় আসাকে দলের তরুণ অংশ বেশ ইতিবাচকভাবে দেখছে। তাদের মতে, বাংলাদেশে তার সক্রিয় উপস্থিতি দলকে এক ধরনের ‘মানসিক সমর্থন’ দেবে।
চিকিৎসক দল জানিয়েছে, বেগম জিয়ার লিভার জটিলতা, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগের কারণে তাঁর চিকিৎসা বাংলাদেশের সীমিত ব্যবস্থায় কার্যকরীভাবে করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দেশেই তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হলেও বিদেশে উন্নত চিকিৎসা এখন সময়ের দাবি। এই কারণেই লন্ডনে নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে পরিবার ও দল দু’পক্ষই চাপের মধ্যে রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, খালেদা জিয়ার লন্ডন যাত্রা শুধু চিকিৎসা–কেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ তাঁর অনুপস্থিতিতে দলের সাংগঠনিক দিকনির্দেশনা, নেতৃত্বের ভারসাম্য এবং তারেক রহমান ডা. জোবাইদার ভূমিকায় নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের নতুন ব্যবস্থা ঠিক থাকলে ৭ ডিসেম্বর হবে এই পুরো ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। আর যদি আবারও কোনো জটিলতা দেখা দেয়, তবে বিএনপির ভেতরে চাপ আরও বাড়বে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে জল্পনাও নতুন মোড় নেবে।
ইএইচ