Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ০৬ জুলাই, ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯

উৎসব-আনন্দে মাতবে দেশ

রফিকুল ইসলাম

জুন ২৪, ২০২২, ১২:৩২ এএম


উৎসব-আনন্দে মাতবে দেশ

নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত বাঙালির স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন আগামীকাল শনিবার। এদিন সকাল ১০টায় আনুষ্ঠানিকভাবে সেতুটি উদ্বোধন করবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইতোমধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করেছে সেতু বিভাগ। সেতুর দু-পাড়ে রাস্তার দু-ধারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি দিয়ে ব্যানার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড টাঙানো হয়েছে। উদ্বোধন অনুষ্ঠান নির্বিঘ্ন করতে কঠোর অবস্থানে থাকবেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। 

সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ও অপপ্রচার রোধে বাড়ানো হয়েছে সাইবার মনিটরিং। ১০ লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশ স্থলে করা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের সাজসজ্জা। দেশি-বিদেশি অতিথিদের দেয়া হয়েছে আমন্ত্রণপত্র। নিজ অর্থায়নে নির্মিত সেতু দেশ ও দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কতটা গুরুত্ব রাখবে তা তুলে ধরে এদিন জাতির উদ্দেশে বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সারা দেশে আনন্দ মিছিল, শোভাযাত্রা, আতশবাজিসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উৎসব আনন্দে মাতবে পুরো বাঙালি জাতি। 

জানা যায়, বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের স্বপ্নের স্থাপনা পদ্মা সেতু। কিন্তু এই নদীর ওপর সেতু নির্মাণকাজ এত সহজ ছিল না। কারণ বিশ্বের অন্যতম খরস্র্রোতা নদী পদ্মা। তবে সব প্রতিকূলতা ও নানামুখী ষড়যন্ত্র ভেদ করে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে সেতু নির্মাণকাজ উদ্বোধন করা হয়। ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটিতে বসে প্রথম স্প্যান। ঠিক পাঁচ বছরের মাথায় পূর্ণ আকৃতি পায় স্বপ্নের সেতু, যুক্ত হয় পদ্মার দুই পাড়। দেশের বৃহৎ এ অবকাঠামো আগামীকাল শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধনের পরদিন রোববার সেতু যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হবে। 

ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে সেতুর সব ধরনের খুঁটিনাটি কাজ। সেতু এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করতে বসানো হয়েছে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা। সেতুর দু-পাড়ে রাস্তার দু-ধারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবিসহ নানা ব্যানার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড টাঙানো হয়েছে। তাতে তুলে ধরা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফলতার গল্প। পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে সার্বিক নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকবে র্যাবসহ সাড়ে পাঁচ হাজার পুলিশ সদস্য। এ জন্য সাজানো হয়েছে ত্রিমাত্রিক নিরাপত্তাবলয়। এছাড়াও সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ও অপপ্রচার রোধে গ্রহণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ নজরদারি ব্যবস্থা। পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, একটি মহল নাশকতা ও ধ্বংসাত্মক কিছু ঘটিয়ে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেশের প্রতিটি থানায় নিরাপত্তা জোরদারে নির্দেশ পাঠিয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে। গুজব-অপপ্রচার রোধে বাড়ানো হয়েছে সাইবার মনিটরিং। নৌপথে শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত থাকবে নৌ-পুলিশ। 

একই সাথে কাজ করছে হাইওয়ে পুলিশ। সমাবেশস্থল, টোল প্লাজা, ফলক উন্মোচন ও হেলিপ্যাড এলাকার নিরাপত্তার লক্ষ্যে র্যাবের প্রয়োজনীয় সংখ্যক টহল মোতায়েন থাকবে। অনুষ্ঠান চলাকালীন সার্বিক নিরাপত্তার জন্য র্যাবের কন্ট্রোল রুম, স্ট্রাইকিং রিজার্ভ, আউটার পেরিমিটার, পেট্রোল, মোটরসাইকেল পেট্রোল, ফুট পেট্রোল, বোট পেট্রোলিং, অবজার্ভেশন পোস্ট, চেকপোস্ট ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক সিসিটিভি মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে। 

এছাড়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সেতুর দুই প্রান্তেই র্যাবের মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক কাজ করবে বলেও জানা গেছে। অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের কেউ হঠাৎ অসুস্থ হলেই তাদের দ্রুত হাসপাতালের নেয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের ইতিহাসের অনন্য মাইলফক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সততা ও আদর্শের প্রতীক। দিনটি স্মরণীয় করে রাখতে সরকারের পাশাপাশি ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে আওয়ামী লীগ। ১০ লক্ষাধিক মানুষ নিয়ে সমাবেশ করবে দলটি। ইতোমধ্যে দলের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। সাজসজ্জা করা হয়েছে সমাবেশ স্থল। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর সেখানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাখবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শত ষড়যন্ত্র ও নানা প্রতিকূলতার ভেদ করে নিজ অর্থায়নে নির্মিত সেতু দেশ ও দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কতটা গুরুত্ব রাখবে তা তুলে ধরে জাতির উদ্দেশে বক্তব্য রোখবেন আওয়ামী লীগ প্রধান। 

জনসভায় ফানুস ওড়ানো, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নদীতে বিভিন্ন ধরনের নৌকা সুসজ্জিত করা হয়েছে। শুধু পদ্মা সেতুর দুই পাড়ের মানুষই নয়, উদ্বোধনের দিন সারা দেশের মানুষ এই উৎসবে অংশ নেবে। সমাবেশ স্থলের পাশাপাশি দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে আনন্দ মিছিল, শোভাযাত্রা, আতশবাজিসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনন্দ উৎসবের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। 

পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে সব আনুষ্ঠিকতা শেষ করেছে সেতু বিভাগ। দেশি-বিদেশি অতিথিদের দেয়া হয়েছে আমন্ত্রণপত্র। পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের দেয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। এদিন সকাল ৯টায় অতিথিদের অনুষ্ঠানস্থলে আসন গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে আমন্ত্রণপত্রে। চাবি, চাবির রিং, কলম, মোবাইল, ছাতা, হাতব্যাগ, ক্যামেরা ও ইলেকট্রনিক্স বস্তু না নিয়ে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে। অনুষ্ঠানস্থলে মাস্ক পরাসহ কোভিড-১৯ সংশ্লিষ্ট সব প্রটোকল অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। আমন্ত্রণপত্রের সাথে দেয়া স্টিকারটি গাড়ির সামনের কাচের বাম পাশে দৃশ্যমান স্থানে লাগানোর জন্য বলা হয়েছে।

 এরপর সকাল ১০টায় মাওয়া প্রান্তের অনুষ্ঠানস্থলে আসবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর এক মিনিট পরই প্রদর্শন হবে প্রামাণ্য চিত্র। এরপর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সকাল ১০টা পাঁচ মিনিটে সভাপতির বক্তব্য দেবেন। পদ্মা সেতুর থিম সং দেখানো হবে সকাল ১০টা ১০ মিনিটে। প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল সোয়া ১০টায় বক্তব্য দেবেন। বক্তব্য শেষে মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন করবেন তিনি। পরে সেখানে মোনাজাত হবে। এরপর প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে জাজিরা প্রান্তে এসে উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন করবেন। ধারণা করা হচ্ছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রায় ১০ লাখের অধিক লোকের সমাগম হবে। উদ্বোধনের পরদিন ২৬ জুন ভোর থেকে যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হবে বহুল প্রত্যাশিত বাংলাদেশের এই মেগা স্ট্রাকচার।
 
আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর সেতুর সুবিধা পাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলা। তাদের সঙ্গে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব অঞ্চলের যোগাযোগে আমূল পরিবর্তন আনবে। ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আনতে যা এ অঞ্চলের দিনবদলের যুগের সূচনা করবে বলে মনে করা হচ্ছে। দেশের অর্থনীতির বাঁক বদলেও ভূমিকা রাখবে দেশের বড় অংশের জনপদের এ উন্নয়ন। স্বপ্নের এ সেতু ঘিরে অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইকোনমিক জোন), পর্যটন, ইকোপার্কের পরিকল্পনা হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে হিমায়িত মৎস্য ও পাটশিল্পের নতুন সম্ভাবনা। পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসার অপেক্ষায়। পদ্মা সেতুর কারণে দেশে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য আরও সহজ হবে। গর্ব আর অহঙ্কারের এ সেতু বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার ঐতিহাসিক মাইলফলক। পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তে (মাওয়া ও জাজিরা) গড়ে উঠছে শিল্প-কারখানা। প্রমত্তা পদ্মাকে জোড়া দেয়া এ সেতু সময় বাঁচানোর পাশাপাশি দূরত্বও ঘোচাবে। ফেরি পারাপার আর ঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার দুর্ভোগের অবসান করবে। ফলে উদ্বোধন ঘিরে সারা দেশে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়েছে।