Amar Sangbad
ঢাকা সোমবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৩, ১০ আশ্বিন ১৪৩০

বড় সুবিধাভোগী গ্রামের মানুষ

ঈদে চাঙ্গা অর্থনীতি

রেদওয়ানুল হক

এপ্রিল ২০, ২০২৩, ১২:৪১ এএম


ঈদে চাঙ্গা অর্থনীতি
  • ১৪ দিনে রেমিট্যান্স এসেছে ১০ হাজার কোটি টাকা
  • ঈদ বোনাস, জাকাত, ফিতরা অর্থের সঞ্চালন বাড়াচ্ছে
  • নগদ প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায়বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতি


ঈদ সামনে রেখে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে দেশের অর্থনীতি। বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে অর্থের বড় জোগান আসছে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের বোনাস, গতিশীল অভ্যন্তরীণ বাজার, জাকাত ও ফিতরা থেকে। এ ছাড়াও অর্থের অন্যতম একটি উৎস রেমিট্যান্স (প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ)। এরই মধ্যে রাজনৈতিক নেতা, এমপি, মন্ত্রীরা ছুটছেন গ্রামে। ঈদের অর্থনীতি নিয়ে সরকারিভাবে এখনো কোনো গবেষণা হয়নি। তবে বেসরকারি গবেষণা অনুসারে ঈদ ও রমজানে অর্থনীতিতে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার অতিরিক্ত লেনদেন হয়। এ টাকার বড় অংশই যায় গ্রামে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ভোগ-বিলাস খাতেই বেশির ভাগ টাকা যাচ্ছে। তবে কিছু অংশ যাচ্ছে গ্রামের বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও কুঠিরশিল্পভিত্তিক উৎপাদন খাতে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশ্ব ব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আমার সংবাদকে বলেন, ‘রমজান ও ঈদের মতো উৎসব এলেই গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের সঞ্চালন বাড়ে। বিশেষ করে রেমিট্যান্স, জাকাত, ফিতরা, ঈদ উপহার এবং মসজিদ মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন  সামাজিক প্রকল্পে অনুদান দেয়া হয়। এসব টাকা গ্রামের বিভিন্ন কাজে ব্যয় হয়। অর্থনীতিতে এর সাময়ীক একটি প্রভাব রয়েছে।’ বিশ্লেষকরা বলছেন, ঈদের সময় নিম্ন আয়ের মানুষের হাতেও টাকা থাকে। এতে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু বাড়তি টাকার প্রবাহের কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। এ জন্য ঈদের পর ওই টাকা উৎপাদন খাতে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ থাকা জরুরি।

গ্রামে বিশেষ প্রভাব থাকলেও ঈদ উপলক্ষে চাঙ্গা ভাব থাকে সারা দেশেই। এবার অতিরিক্ত গরম ও বিভিন্ন মার্কেটে অগ্নিকাণ্ড সত্ত্বেও চাঙ্গা হয়ে উঠেছে ঈদের বাজার। করোনা ভাইরাসের প্রকোপ না থাকায় প্রায় তিন বছর পর এবার প্রাণ খুলে ঈদ উৎসব পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন সর্বস্তরের মানুষ। শবে বরাতের পর থেকে শুরু হয়েছে ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটা। ক্রেতাদের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে মার্কেট, শপিংমল, ফ্যাশন হাউস এবং বিভিন্ন পণ্যের শোরুমগুলোতে। ঈদকে সামনে রেখে সেজে উঠেছে রাজধানীসহ দেশের ছোট-বড় সব বিপণিবিতান ও শপিংমল। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী  এখন কেনাকাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। ফলে বাড়ছে ঈদের অর্থনীতির আকার। টাকার অঙ্কে যা প্রায় দুই লাখ কোটি টাকারও বেশি। ইতোমধ্যে ঈদের এই বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে অর্থের বড় জোগান আসছে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের বোনাস। এই ঈদের বাজারে অর্থের যোগান দিচ্ছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। এ ক্ষেত্রে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা করতে ভূমিকা রাখছে মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম। ঈদের অর্থনীতি নিয়ে সরকারিভাবে কোনো গবেষণা নেই। তবে বেসরকারি পর্যায়ে চালানো গবেষণার তথ্য অনুযায়ী ঈদ, রমজান ও বৈশাখী উৎসব ঘিরে অর্থনীতিতে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার অতিরিক্ত লেনদেন হবে। এ টাকার বড় অংশই যাবে গ্রামে। 

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্যমতে, ঈদে সারা দেশের ২৫ লাখ দোকানে কেনাকাটা হবে। মুদি থেকে শুরু করে এসব দোকানের মধ্যে কাপড়ের দোকান, শোরুম ও ফ্যাশন হাউসগুলোও রয়েছে। এসব দোকানে বছরের অন্য সময় গড়ে প্রতিদিন তিন হাজার কোটি টাকার পণ্য বিক্রি হলেও রোজার মাসে সেটি তিনগুণ বেড়ে হয় ৯ হাজার কোটি টাকা। ওই হিসাবে রোজার এক মাসে এই ২৫ লাখ দোকানে ঈদ পোশাক থেকে শুরু করে ভোগ্যপণ্য বিক্রি হবে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকারও বেশি। ঈদুল ফিতরে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয় পোশাকের বাজারে। পোশাকের দোকানেই ঈদের কেনাকাটা এবার ৮০ হাজার থেকে এক লাখ কোটি কোটি টাকার বেশি। অভ্যন্তরীণ পোশাকের সবচেয়ে বড় জোগান আসে পুরান ঢাকার উর্দু রোডের পোশাক মার্কেট থেকে। ঢাকার বিভিন্ন মার্কেটসহ দেশের বিভাগ ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ের মার্কেটগুলোতে দেশি পোশাক সরবরাহ হয় পুরান ঢাকার এই মোকাম থেকে। এর বাইরে ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড এবং চীন থেকেও প্রচুর তৈরি পোশাক আমদানি করা হয়।  তবে এবার নববর্ষ আর ঈদ একাকার হয়ে ঈদের অর্থনীতির আকার কিছুটা বড় হয়ে উঠেছে।  অন্য বছর পয়লা বৈশাখকে সামনে রেখে বা পয়লা বৈশাখকে ঘিরে যে বেচাকেনা হয় এবার ঈদের কেনাকাটাও যোগ হয়েছে তার সঙ্গে। 

বরাবরের মতো এ বছরও সাড়ে ১২ লাখ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী অষ্টম বেতন কাঠামোর আলোকে ঈদ বোনাস পাচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে তিন বাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারী। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও নিজস্ব কাঠামোতে বোনাস দিচ্ছে। এ ছাড়া পোশাক ও বস্ত্র খাতের প্রায় ৭০ লাখ কর্মীও বোনাস পাচ্ছেন। যার পুরোটাই যোগ হচ্ছে ঈদ অর্থনীতিতে। ঈদ উৎসব অর্থনীতিতে সারা দেশের দোকান কর্মচারীদের বোনাসও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাবে দেশে ২০ লাখ দোকান, শপিংমল, বাণিজ্য বিতান রয়েছে। গড়ে একটি দোকানে তিন জন করে ৬০ লাখ জনবল কাজ করছে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাবে একজন কর্মীকে পাঁচ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বোনাস দেয়া হয়। ওই হিসাবে গড়ে বোনাস আট হাজার টাকা ধরে চার হাজার ৮০০ কোটি টাকা বোনাস পাচ্ছে এ খাতের শ্রমিকরা যা পুরোটাই ঈদ উৎসব অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর হিসাবে প্রতি বছর জাকাত ও ফিতরা বাবদ খরচ হচ্ছে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এই টাকার বেশির ভাগই যাচ্ছে গ্রামে। এছাড়া রোজা ও ঈদে নানা কর্মসূচিতে শহরের চাকরিজীবীরা গ্রামে যাচ্ছেন। সেখানে তারা অর্থ ব্যয় করছেন। যে কারণে টাকার প্রবাহ বাড়ছে। এছাড়া গ্রামের দরিদ্র মানুষের সহায়তায় শহরের লোকজন সাধ্য অনুযায়ী অর্থের জোগান দিচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ঈদ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর ব্যবসায়ীরা সারা বছর এই সময়ের জন্য মুখিয়ে থাকেন। ঈদকে ঘিরে ব্যবসায়ীরা নতুন নতুন বিনিয়োগ করেন। বছরের প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যবসা হয় এই এক মাসে। তিনি বলেন, করোনার কারণে বিধিনিষেধের মুখে গত তিন বছর ব্যবসায়ীরা সেভাবে মুনাফা করতে না পারলেও এবার তারা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন বলে আশা করছি। ুতবে ভিন্ন কথা বলছেন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এবং এফবিসিআইর সাবেক সহ-সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন। গণমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন, এবার ঈদে ব্যবসায়ীরা বিপদে আছে। তিনি বলেন, সাধারণত পয়লা বৈশাখকে ঘিরে চার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। কিন্তু এবার রোজার মাসে পয়লা বৈশাখ, আবার সামনেই ঈদ, ফলে দুইটি উৎসব এক হয়ে গেছে। আর দ্রব্যমূল্য অনেক বেশি হওয়ায় মানুষ আগের চেয়ে কম কিনছেন। বাজেট কাটছাঁট করছেন।

তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে ঈদুল ফিতরে সাধারণভাবে এক লাখ ৭০-৮০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। হেলাল উদ্দিন বলেন, এবার ঈদে এই পরিমাণ লেনদেন না-ও হতে পারে। কারণ, মানুষের খাবার কিনতেই আয়ের প্রায় পুরোটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে সবাই যে ঈদের পোশাক কিনতে পারবেন, তা বলা যায় না। সবাই কম খরচ করতে চাইছেন। মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, জাকাত ও ফিতরার প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা, তৈরি পোশাকের ৩৫ হাজার কোটি, ভোগ্যপণ্যের বাজার ২৫ হাজার কোটি এবং ঈদ বোনাস, পরিবহন ও অন্যান্য মিলিয়ে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য খাতে ৫০ হাজার কোটি টাকা সরাসরি ঈদকেন্দ্রিক লেনদেন হয়। এ ছাড়াও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ২৭ হাজার কোটি টাকার কিছু অংশ ঈদকেন্দ্রিক লেনদেন হয়ে থাকে। এদিকে আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে এটিই শেষ রোজার ঈদ হওয়ায় রাজনৈতিক নেতাদের সাহায্য-সহযোগিতা ও দানের তৎপরতা বাড়ায় ঈদ অর্থনীতিতে এর জোরাল প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য গরিব, দুস্থ, এতিমদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন তারা। এ ছাড়া বাড়তি খরচের জন্য প্রবাসীরা তাদের স্বজনদের কাছে অতিরিক্ত অর্থ পাঠাচ্ছেন। এর বড় অংশই যাচ্ছে গ্রামে। রোজার শুরু থেকেই বে?শি বে?শি রেমিট্যান্স পাঠা?চ্ছেন প্রবাসী বাংলা?দে?শিরা। চলতি এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখ পর্যন্ত বৈধ বা ব্যাংকিং চ্যানেলে ৯৫ কোটি ৮৭ লাখ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ দেশে এসেছে। দেশীয় মুদ্রায় (প্র?তি ডলার ১০৭ টাকা ধ?রে) যার পরিমাণ ১০ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া মার্চ মাসে ২০২ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।

 

Link copied!