Amar Sangbad
ঢাকা রবিবার, ০৩ মার্চ, ২০২৪,

ধুঁকতে হচ্ছে আবেদন অজ্ঞতায়

সুবিধাবঞ্চিত দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা

আব্দুল কাইয়ুম

আব্দুল কাইয়ুম

নভেম্বর ২৯, ২০২৩, ১১:৪৫ এএম


সুবিধাবঞ্চিত দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা
  • প্রচারের অভাবে ধারণা নেই অনেকের
  • নিয়মের জালে সুফল দেখছেন না ভুক্তভোগীরা
  • ক্ষতিগ্রস্তদের ৮২ শতাংশই কর্মক্ষম ব্যক্তি 
  • ইন্ডিপেনডেন্ট ফান্ড হলে থাকবে বিনা খরচে চিকিৎসার সুবিধা
  • মোটরযান থেকে জরিমানার টাকায় ফান্ড গঠন

বছরে তিন হাজার কোটি টাকার ফান্ড হলে প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্তের চিকিৎসা ও সহযোগিতা করা সম্ভব
—সাইদুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক, রোড সেফটি ফাউন্ডেশন

দুর্ঘটনার সাথে চিকিৎসা ও অনুদান পদ্ধতি কোনো দেশেই নেই
—শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী, পরিচালক 
(রোড সেফটি), বিআরটিএ

সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-তে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করার আইন থাকলেও তার সঠিক প্রয়োগ নেই। বিভিন্ন নিয়মের জালে সুফল পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারি এই সুযোগ থাকলেও প্রচারের অভাবে এ বিষয়ে ধারণা নেই অনেকের। ফলে সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা। ঠিক তেমনি একজন সাইফুল ইসলাম। চলতি বছরের ৮ সেপ্টেম্বর ভোরে মোটরসাইকেলে ঢাকা থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে যাওয়ার পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ট্রাকচাপায় আহত হয়ে কোমরের হাঁড় ভেঙে যায়। এ ছাড়া কোমর থেকে বাম পা পর্যন্ত থেঁতলে যায়। মুমূর্ষু অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হলে ডাক্তারের পরামর্শে বাম পা কোমর থেকে কেটে ফেলতে হয়। এরপর আবার তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। ঢামেকে দীর্ঘ দুই সপ্তাহ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। 

সাইফুলের পরিবারের সাথে কথা বললে জানান, থানায় যোগাযোগ করলে জানা যায়, পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। তবে ঘাতক গাড়ি আটক করতে পারেনি। ট্রাকের নম্বরসহ ছবি পুলিশের কাছে থাকার পরও এখনো বিচার হয়নি। শুধু বিচার নয়, কখনো সাইফুলের পরিবারের খোঁজও নেয়নি কেউ। আবেদনের ধারণা না থাকায় পায়নি সরকারি সহযোগিতাও। তার পরিবার বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় করে। সরকারি অর্থিক সুবিধার বিধান থাকলেও পরিবার পায়নি তার সুফল। এদিকে আর্থিক সহযোগিতার অভাবে সাইফুলকে দেয়া যায়নি সময়মতো চিকিৎসা। সড়ক পরিবহন আইনে বিদ্যমান ট্রাস্টি ফান্ড থাকলেও সাইফুলের মতো অনেক ভুক্তভোগীই পাচ্ছেন না সহযোগিতা। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা সঠিক সময়ে সহযোগিতা ও চিকিৎসা না পাওয়ায় হারাচ্ছেন প্রাণ। 

সড়ক ও সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ‘রোড সেফটি ফাউন্ডেশন’ প্রস্তাব করেছে, ইন্ডিপেনডেন্ট ফান্ড গঠিত হলে সড়ক দুর্ঘটনার সাথে আহত রোগীকে উপযুক্ত চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হবে ব্যক্তিগত অর্থ ছাড়াই। রোগীকে একটি মেডিকেল কোড নম্বরে চিহ্নিত করে উপযুক্ত যেকোনো হাসপাতাল তার চিকিৎসা শুরু করবে। পরবর্তীতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীর চিকিৎসা খরচ ইন্ডিপেনডেন্ট ফান্ড থেকে গ্রহণ করবে। সিভিল প্রশাসন, পুলিশ, চিকিৎসক, সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি, সড়ক নিরাপত্তায় কাজ করা সংস্থাগুলোর প্রতিনিধির সমন্বয়ে এই কমিটি গঠন করতে হবে।

সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এর ৪৭ নং আইনের নবম অধ্যায়ের ৫২ নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো মোটরযান হতে উদ্ভূত দুর্ঘটনার ফলে কোনো ব্যক্তি আঘাতপ্রাপ্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত ও আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে ওই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা ক্ষেত্রমতো, তার উত্তরাধিকারীদের পক্ষে মনোনীত ব্যক্তি ধারা ৫৩-এর অধীন গঠিত আর্থিক সহায়তা তহবিল থেকে ট্রাস্টি বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে, চিকিৎসার খরচ প্রাপ্য হবেন।’ বিশেজ্ঞরা মনে করছেন, আবেদনের জটিলতা ও তহবিল সংকটের কারণে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সহযোগিতা পাচ্ছেন না। তা ছাড়া ট্রাস্টি ফান্ডের যে সাংগঠনিক কাঠামো ও ব্যবস্থাপনা, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ এবং প্রদানের যে পদ্ধতি, তাতে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের পক্ষে এই ফান্ড থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়া সময়সাপেক্ষ ও দুরূহ। ট্রাস্টি ফান্ড থেকে সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে আবেদন করা, পুলিশি তদন্ত ও প্রতিবেদন জমা হওয়া, এরপর যাচাই-বাছাই ইত্যাদি করতেই অনেক সময় কেটে যাবে। উল্লিখিত সময়ের মধ্যে কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন না হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দুর্ঘটনার স্থান, সময়, দুর্ঘটনার কারণ, আক্রান্তের স্থায়ী ঠিকানা এবং ওয়ারিশ— এসব বিষয়ে ব্যাপক জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অথচ সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের সর্বাগ্রে প্রয়োজন চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহযোগিতা। কিন্তু এই ট্রাস্ট ফান্ড তাৎক্ষণিক তো নয়-ই, তিন মাসের মধ্যেও চিকিৎসাসেবায় কোনো প্রকার অবদান রাখতে পারবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। 

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য প্রতি বছর সর্বোচ্চ তিন হাজার কোটি টাকা হলেই সবার সাহায্য করা সম্ভব। এই বাস্তবতায় সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ইন্ডিপেনডেন্ট ফান্ড গঠন করলে বেশি কার্যকর হবে। এই ফান্ডে যেসব উৎস থেকে ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থ সংগ্রহ করা হবে, সেসব উৎসসহ পুলিশ কর্তৃক মোটরযান থেকে জরিমানার অর্থের একটি অংশ এবং বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সিএসআর ও অনুদান থেকে এই পরিমাণ অর্থ খুব সহজেই সংগ্রহ করা সম্ভব। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের একটি গবেষণা জরিপে দেখা যায়, দেশের পঙ্গু ভিক্ষুকদের ৮৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হওয়া মানুষ। দুর্ঘটনা পরবর্তী ছয় ঘণ্টা হলো গোল্ডেন আওয়ার। এই সময়ের মধ্যে উপযুক্ত চিকিৎসা দিতে পারলে দুর্ঘটনায় মৃত্যুহার অনেকখানি কমানো সম্ভব। পঙ্গুত্ববরণও কমে যাবে। সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ৮২ শতাংশই কর্মক্ষম মানুষ, যাদের বয়স ১৮ থেকে ৬৫ বছর এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আক্রান্তরা তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুর কারণে পরিবারের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে এবং দুর্ঘটনায় আহত সদস্যকে সম্পদ বিক্রি করে চিকিৎসা করতে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সর্বস্বান্ত হচ্ছে। মাটরযানে তৃতীয় পক্ষীয় ঝুঁকি বিমা পুনঃপ্রবর্তন করার কথাও উল্লেখ করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানায়, প্রয়োজনে প্রিমিয়ামের পরিমাণ বৃদ্ধি করে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বিমা সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। যেকোনো মূল্যে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ফান্ডের প্রয়োজনীয় অর্থের চাহিদা ক্রমান্বয়ে কমতে থাকবে। 

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা কখনো সাহায্য পায় না। ইন্ডিপেনডেন্ট ফান্ড করা হলে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সাহায্য পাবে। প্রতি বছর তিন হাজার কোটি টাকার একটি ফান্ড করলে প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্ত চিকিৎসা ও সহযোগিতা পাবে। যে সব যানবাহনের মাধ্যমে দুর্ঘটনার শিকার হবে, তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির দায়ভার গ্রহণ করতে হবে। ট্রাফিক জরিমানা দিয়েই ইন্ডিপেনডেন্ড ফান্ড গঠন করা যাবে। জরিমানা আদায় হলেও তা পুলিশদের মধ্যে ভাগাভাগির অভিযোগও রয়েছে। ফলে এই টাকা সরকারের কাছে পৌঁছায় না। তা ছাড়া আরও দেখা যায়, এক ব্যক্তির চার-পাঁচটা গাড়ি রয়েছে। কিন্তু তাকে টেক্স ও বিভিন্ন ফি দেয়ার ভয়ে আত্মীয়দের নামে রেজিস্ট্রেশন করা থাকে। এতে করে সড়ক দুর্ঘটনা শেষে তাদের ধরা যায় না।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) রোড সেফটি পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী আমার সংবাদকে বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ট্রাস্টি ফান্ডে আবেদন করেছে কিন্তু সহযোগিতা পায়নি এমনটি কখনো হয়নি। পৃথিবীর কোথাও একাধিক ফান্ডের ব্যবস্থা নেই। আমাদের সরকার যেই ফান্ড করেছে তা আশেপাশের কোনো দেশেও নেই। আর এটিই হলো স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি ফান্ড। দুর্ঘটনার ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন করলে তাকে সহায়তা করা হয়। দুর্ঘটনার সাথে সাথে আর্থিক ও চিকিৎসা সহযোগিতার পদ্ধতি কোনো দেশেই নেই। ইন্ডিপেনডেন্ডের মতো ফান্ড মানে সম্পূর্ণরূপে অবাস্তব একটি পরিকল্পনা।’
 

Link copied!