নিজস্ব প্রতিবেদক
এপ্রিল ৭, ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় এক বড় ধরনের মোড় হিসেবে গ্রেপ্তার হয়েছেন জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।
মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকা থেকে আটকের পর তাকে লালবাগ থানার একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করা হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক মোহসীন উদ্দীন তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই দিনের রিমান্ড আবেদন জানিয়েছেন।
দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর আজ ভোররাতে ধানমন্ডিতে এক আত্মীয়ের বাসা থেকে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ছয়টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে তিনটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হলেও বাকি তিনটি মামলা বর্তমানে তদন্তাধীন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে আজ দুপুরে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয় থেকে কড়া পাহারায় আদালতে নিয়ে আসা হয়।
স্পিকারকে গ্রেপ্তারের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে গত বছরের জুলাই মাসে লালবাগ থানায় দায়ের করা একটি মামলা (মামলা নম্বর: ১৭)। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় আজিমপুর সরকারি কলোনি এলাকায় নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলি বর্ষণের ঘটনায় এই মামলাটি করা হয়।
মামলার বাদী মো. আশরাফুল (ফাহিম) অভিযোগে উল্লেখ করেন যে, শেখ হাসিনার নির্দেশে এবং ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও বিপ্লব বড়ুয়ার পরিকল্পনায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগের ক্যাডার বাহিনী আন্দোলনকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এতে ফাহিমের বাম চোখ, মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলি লাগে। উন্নত চিকিৎসার পরেও চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যে, ফাহিমের বাম চোখের দৃষ্টিশক্তি চিরতরে হারিয়ে গেছে।
এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করা হলেও, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে করা হয়েছে ৩ নম্বর আসামি।
আদালতে পেশ করা রিমান্ড আবেদনে ডিবি পুলিশ উল্লেখ করেছে যে, ১৮ জুলাই ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ চলাকালে দেশে যে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছিল, তার পেছনে তৎকালীন সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উসকানি ছিল।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে জানান, আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারীদের দমনে যে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়েছিল, তার নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নির্দেশনাগুলো কার কাছ থেকে এসেছিল তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
ওই দিন মিছিলে যে ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল, সেগুলোর উৎস এবং হামলাকারীদের শনাক্ত করতে ৩ নম্বর আসামি হিসেবে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি।
স্পিকার হিসেবে তিনি সরকারের উচ্চপর্যায়ের কোন কোন সভায় উপস্থিত ছিলেন এবং আন্দোলন দমনে কী ধরনের ভূমিকা পালন করেছিলেন, সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্যেই এই ২ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।
আদালতের কার্যক্রম
আজ মঙ্গলবার দুপুর ১টার পর ডিবির গাড়িতে করে সাবেক স্পিকারকে যখন সিএমএম আদালতে আনা হয়, তখন আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালতে রিমান্ড আবেদনের ওপর শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষে পাবলিক প্রসিকিউটর রিমান্ডের যৌক্তিকতা তুলে ধরছেন, অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জামিন ও রিমান্ড বাতিলের আবেদন করেছেন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সেই উত্তাল দিনগুলোতে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর ভূমিকা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল। বিশেষ করে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে যখন দেশ উত্তাল, তখন সংসদীয় প্রধান হিসেবে তার নীরবতা বা অবস্থান নিয়ে জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। ডিবি সূত্রে জানা গেছে, কেবল এই একটি মামলা নয়, অন্যান্য তদন্তাধীন মামলাগুলোতেও তাকে পর্যায়ক্রমে জিজ্ঞাসাবাদ বা গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়া চলতে পারে।
ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর এই গ্রেপ্তার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে টানা তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা একজন ব্যক্তিত্বের রিমান্ড আবেদন ও আইনি লড়াই এখন জনমতের কেন্দ্রে। আদালতের রায়ের ওপরই নির্ভর করছে তাকে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হবে নাকি কারাগারে পাঠানো হবে।
লালবাগ থানার এই মামলার তদন্ত কতটুকু গভীরে যায় এবং সেখানে সাবেক স্পিকারের ব্যক্তিগত দায় কতটুকু প্রমাণিত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে ডিবি কর্মকর্তাদের দাবি, আন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকারের যে সম্মিলিত পরিকল্পনা ছিল, তার বিচারিক প্রক্রিয়ায় এই জিজ্ঞাসাবাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এএন