Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ০৬ জুলাই, ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯

বেড়েছে ডাকসেবার পরিধি

মহিউদ্দিন রাব্বানি

মহিউদ্দিন রাব্বানি

মে ১৬, ২০২২, ০১:৩৬ এএম


বেড়েছে ডাকসেবার পরিধি

হাতে চিঠি লিখে তা ডাকে প্রিয়জনকে পাঠানোর চিরায়ত পদ্ধতির পরিবর্তন হয়েছে। প্রযুক্তির প্রভাবে হারিয়ে গেছে চিঠিশিল্প। তবে তা সত্ত্ব্বেও বেড়েছে ডাক বিভাগের কাজের পরিধি। ব্যক্তিগত চিঠিপত্র আদান-প্রদান কমলেও ডাক মাধ্যম ব্যবহার করে কর্পোরেট চিঠিপত্র বা পণ্যদ্রব্য পরিবহন বেড়েছে। 

সংশ্লিষ্টদের দেয়া তথ্যমতে, দু’-তিন বছরে ডাক বিভাগের কাজ বেড়েছে কয়েকগুণ। বাংলাদেশ ডাক বিভাগের প্রধান পরিষেবাগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ডাক দ্রব্যাদি গ্রহণ, পরিবহন ও বিতরণ, রেজিস্ট্রেশন সেবা, ভ্যালু পেয়েবল (ভিপি) সেবা, বীমা সেবা, পার্সেল সেবা, বুকপোস্ট (বুক প্যাকেট ও প্যাটার্ন প্যাকেট), রেজিস্টার্ড সংবাদপত্র, মানি অর্ডার সেবা, এপ্রেস সেবা (জিইপি ও ইএমএস), ই-পোস্ট এবং ইন্টেল পোস্ট সেবা প্রদান। সাধারণত দূরত্ব এবং গন্তব্য যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে এই কাজে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগে। 

তবে এখন অনেক কাজই ডিজিটাল মাধ্যমে হয়ে থাকে। সেবা এখন নাগরিকের হাতের মুঠোয়। রানার ছুটেছে তাই ঝুমঝুম ঘণ্টা বাজছে রাতে/ রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে/ রানার চলেছে, রানার!

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের এ রানার এখনো আছে। অবশ্য এখন পদবি রানারের বদলে হয়েছে ডাকপিয়ন বা সহকারী পোস্টমাস্টার। পদবির সাথে সাথে বদলেছে তাদের কাজের ধরন ও পরিধি। পরিবর্তন এসেছে কাজের পদ্ধতিতেও। এখন আর খুব জরুরি ডাক না হলে রাতে ছুটতে হয় না কাউকে। ঘরে বসে ফোন বা মেইল করে দিতে পারেন তারাও। 

পোস্ট অফিসগুলোতে এখন আধুনিক ই-সেবা কার্যক্রম যুক্ত হয়েছে। ৬৮ হাজার গ্রামেই রয়েছে শাখা পোস্ট অফিস। যদিও পোস্ট অফিস ভবন নেই সবগুলোতে। এখনো স্কুল, কলেজ, ইউনিয়ন পরিষদের অফিস বা অন্য কোথাও বসে পোস্ট অফিসের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন পোস্টমাস্টাররা। অবশ্য 
কাজ ও কাজের ধরনে পরিবর্তন এলেও ডাককর্মীদের জীবনযাত্রার মানে আসেনি পরিবর্তন। বাড়েনি চাহিদার আলোকে বেতন-ভাতা।

ঢাকা জিপিওর ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল-কাম সিনিয়র পোস্টমাস্টার খন্দকার শাহনূর সাব্বির আমার সংবাদকে জানান, ‘ভূমির খতিয়ান, পর্চা ও ম্যাপ সংক্রান্ত সব কাজ আগে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সম্পন্ন হতো। কাজের চাপ বেশি হওয়ায় এবং পরিবহনে তাদের পর্যাপ্ত সুবিধাদি না থাকায় জমির খতিয়ান, ই-পর্চা ও ম্যাপ সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ এখন ডাক বিভাগের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। 

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ডাক বিভাগ একটি প্রকল্পের অধীনে ডিজিটাল মাধ্যামে এই সেবা দিয়ে যাচ্ছে। প্রকল্প পরিচালনার জন্য ৬১টি জেলায় ডাক বিভাগে চুক্তিভিত্তিক লোকবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তাদের পদবি হলো লেটার রাইটার। গ্রাহক অনলাইনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সেবার জন্য আবেদন করবেন। তারপর দাপ্তরিক সব কাজ শেষে লেটার রাইটাররা গ্রাহকের কাছে পর্চা, খতিয়ান বা ম্যাপের পেপার পৌঁছে দেন।

 ঢাকা জিপিওর লেটার রাইটার মেহেদী হাসান রুবেল বলেন, সারা দেশে জেলা ভিত্তিক অস্থায়ীভাবে ৬২ জন লেটার রাইটার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আমরা প্রতিটি আবেদনে বিপরীতে ১০ টাকা পেয়ে থাকি। এটি ডাক বিভাগের একটি লাভজনক প্রকল্প। খতিয়ানের জন্য আবেদনের জন্য গ্রাহককে ৪০ টাকা ও ম্যাপের ৬৪০ টাকা দিতে হয়। 

এছাড়াও ডাক বিভাগ পণ্য পরিবহনের জন্য নতুন করে কাগজজাত প্যাকেজ তৈরি করেছে। ছোট কার্টনের মূল্য ধরা হয়েছে ৩০ টাকা ও বড় কার্টনের মূল্য ধরা হয়েছে ২০০ টাকা। খাম ৪৫ টাকা। এ ছাড়া ম্যাপের জন্য বিশেষ খাম তৈরি করা হয়েছে। যার দাম নির্ধারণ করা হয় ১১০ টাকা।

ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. সিরাজ উদ্দিন আমার সংবাদকে জানান, ‘ডাক বিভাগের কাজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ১৪টি জেলায় ফ্রজেন মেইল প্রসেস বা হিমায়িত পরিবহন সেবা চালু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে ২৬টি এই ধরনের মেইল প্রসেস সার্ভিস চালু করা হবে। এর মাধ্যমে পচনশীল পণ্যও পরিবহন করা যাবে। আগে এই ধরনের সুব্যবস্থা ছিল না। 

তিনি আরও জানান, আগামী ২০ বছর পর দেশে ভৌত অবকাঠামোগত যে উন্নয়ন হবে ডাক বিভাবে সে ধরনের উন্নয়ন শিগগিরই হবে। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় কথা হলো গ্রামের কৃষক এখন ই-সেবা পাচ্ছে। পণ্য আদান-প্রদান বা বিক্রির সুযোগ পাচ্ছে। 

২০১২ সালে পাঁচ হাজার ৫০৬টি ডাকঘরকে পোস্ট ই-সেন্টারে রূপান্তরিত করা হয়। পরে আরও আট হাজার ৫০০টি ডাকঘরকে পোস্ট ই-সেন্টারে রূপান্তরিত করা হয়েছে এবং পোস্ট ই-সেন্টার থেকে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় ভাতা দেয়া হচ্ছে। মাথাপিছু আয়, কৃষি, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাণিজ্য, ক্রীড়া, যোগাযোগ, বিচারব্যবস্থাসহ সব দপ্তরে অগ্রগতির পথযাত্রায় সফল হচ্ছে। 

সেখানে ডাক বিভাগ কেন সমান তালে এগিয়ে আসতে পারে না এমন প্রশ্ন করা হলে ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ গণমাধ্যকে বলেন, সারা দেশে ডাক বিভাগের কর্মীদের মাত্র চার হাজার টাকার মাসিক ভাতায় কীভাবে দিন পার করছেন? এটা সরকারেরভাবে দেখা উচিত। ডাক বিভাগ দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব কিংবা ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন তুলে ধরার জন্য ডাকটিকিট প্রকাশ করে থাকে। ডাকটিকিট একটি দেশ ও জাতির ইতিহাসের বাহক হিসেবে কাজ করে।

ডাকঘরের অন্যতম একটি কার্যক্রম সেভিংস ব্যাংক বা ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক। এর আওতায় দুটি কর্মসূচি আছে। একটি হচ্ছে ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক সাধারণ হিসাব, অন্যটি ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক মেয়াদি হিসাব। ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক বোনাস হিসাব নামের একটি কর্মসূচি আগে ছিল। ১৯৯২ সালে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। ডাক বিভাগ সঞ্চয় ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রাহক সেবা দিয়ে থাকে তা এক বছর, দুই বছর অথবা তিন বছর মেয়াদি হিসাব খোলা যায়। 

এক্ষেত্রে মুনাফার হার এক বছরের জন্য ১০.২০ শতাংশ, দুই বছরের জন্য ১০.৭০ শতাংশ এবং তিন বছরের জন্য ১১.২৮ শতাংশ। আমানতকারী ইচ্ছা করলে প্রতি ছয় মাস অন্তর মুনাফা উত্তোলন করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে প্রথম বছরে ৯.০০ শতাংশ, দ্বিতীয় বছরে ৯.৫০ শতাংশ এবং তৃতীয় বছরে ১০.০০ শথাংশ হারে মুনাফা  দেয়া হয়। এতে দেশের সব শ্রেণি ও পেশার বাংলাদেশি নাগরিক অ্যাকাউন্ট চালু করতে পারেন। নাবালকের পক্ষেও এ হিসাব খোলা যায়। বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা একক হিসেবে ১০ লাখ টাকা এবং যুগ্ম হিসেবে ২০ লাখ টাকা।

ডাক অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ব্রিটিশ সরকারের সময়ে ১৮৭২ সালে ডাক হরকরাদের সুবিধা দিতে ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক কর্মসূচি চালু করা হয়। সাধারণ মানুষের সঞ্চয়প্রবণতা বৃদ্ধির স্বার্থে বাংলাদেশে তা চালু হয় ১৯৭৪ সালে। এ কর্মসূচি পরিচালনা করতে ১৯৮১ সালে করা হয় ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকবিধি। তবে এর নাম ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকবিধি হলেও বাস্তবে ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক বলতে কোনো ব্যাংক নেই। আবার পুরো বিষয়টি দেখভালও করে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর, ডাক অধিদপ্তরও নয়। 

সঞ্চয় অধিদপ্তরের ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সাধারণ হিসাব ও মেয়াদি হিসাব মিলিয়ে পুঞ্জীভূত দায় ৩৯ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা। এর মধ্যে মেয়াদি হিসাবেই বেশি। অর্থাৎ ৩৬ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। আর সাধারণ হিসাবে দুই হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা। ডাক সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর বড় তিনটি প্রকল্পের কাজ চলছে। এগুলো হলো— ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, মেইল অ্যান্ড লজিস্টিক ডেভেলপমেন্ট ও জরাজীর্ণ ও পুরাতন ডাক অফিস সংস্কার, মেরামত ও ভবন উন্নয়নে কাজ চলছে। 

এছাড়া ডাক বীমা, মেইলের গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধি, ডাক সেবার পরিধি সম্প্রসারণ, ডিজিটাল সেবা উন্নয়ন, গ্রাহকবান্ধব সেবার অধিক্ষেত্র চালুকরণ, ই-কমার্স, ই-গভর্ন্যান্স, ফিলাটলি, ডাকটিকিট, স্টম্প রেভিনিউসহ নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে ডাক বিভাগ। ইতোমধ্যে ডাকের মোবাইল ব্যাংকিং মাধ্যম ‘নগদ’ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।