Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ০৬ জুলাই, ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯

অনিরাপদ রাতের মহাসড়ক

নুর মোহাম্মদ মিঠু 

নুর মোহাম্মদ মিঠু 

মে ২২, ২০২২, ০১:৪২ এএম


অনিরাপদ রাতের মহাসড়ক

দেশের মহাসড়কগুলো বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-ফরিদপুর-ঝিনাইদহ মহাসড়ক যেন ক্রমেই পরিণত হচ্ছে ‘ডেঞ্জার জোনে’। মহাসড়কে কৃত্রিম যানজটের পাশাপাশি বিশৃঙ্খলা কিংবা দুর্ঘটনার কারণে সৃষ্ট যানজট ও ধীরগতির গাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটছে হরহামেশাই। একাধিক ঘটনার দৃশ্য দেখে এমনটাই ধারণা করা যেতে পারে যে, মহাসড়ক যেন দখলে নিয়েছে অপরাধীচক্র।

যেখানে হাইওয়ে কিংবা থানা পুলিশের কোনো নজরদারি নেই। ভুক্তভোগীরাও বলছেন, যানজটেও দেখা মেলে না পুলিশের টহল দলের। ফাঁকা সড়কেও দৃশ্যমান নয় পুলিশি তৎপরতা। বিশেষ করে রাত গভীর হলেই মহাসড়ক অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়; কিন্তু রাতভর যাদের থাকার কথা, সেই পুলিশের কোনো উপস্থিতি খুঁজে পাওয়া কঠিন। শুধু ডাকাত-ছিনতাইচক্রই নয়, পুলিশের বিরুদ্ধেও হরহামেশা চালকদের হয়রানি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠছে।

আবার ঘটনার পর এলাকা নির্ধারণ নিয়েও পুলিশের হেনস্তার মুখে পড়তে হচ্ছে ভুক্তভোগীদের। সাম্প্রতিককালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রায় পুরো অংশই যেন ডেঞ্জার জোনে পরিণত হয়েছে। শুধু নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লাই নয়— মিরসরাই, চট্টগ্রাম এলাকাতেও ঘটছে ডাকাতির ঘটনা। পণ্যবাহী ট্রাক, লরি ও কাভার্ডভ্যান ছাড়াও প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাসে ডাকাতি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। 

একাধিক ঘটনায় জানা গেছে, নির্বিঘ্নে ডাকাতি করতে অপরাধীরা পুলিশের নকল পোশাকও ব্যবহার করছে। এসব ঘটনায় মালামাল খোয়ানোর পাশাপাশি ডাকাতদের আক্রমণে প্রায়ই হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। এ অবস্থায় প্রাণ হাতে নিয়েই মহাসড়কে চলাচল করছেন হাজারো চালক-যাত্রী। অথচ মহাসড়কের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার জন্য হাইওয়ে পুলিশ ইউনিট গঠন করা হলেও কার্যত মহাসড়কে অপরাধ প্রবণতা যেন থামছেই না।

চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই সারা দেশের সড়ক-মহাসড়কে বাস. ট্রাক, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন যানবাহনে ডাকাতির ঘটনায় সাহায্য চেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন আসে ৩৪৪টি। ডাকাতির শিকার ব্যক্তিরা তাৎক্ষণিক সাহায্য চেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ফোন করেছেন বলে জানিয়েছেন পরিদর্শক আনোয়ার সাত্তার। 

তিনি বলেন, জানুয়ারি মাসে যানবাহনে ডাকাতির ঘটনায় প্রাপ্ত কলের সংখ্যা ৯৬টি, ফেব্রুয়ারিতে ৭৭, মার্চে ৭৫ এবং এপ্রিলে ৯৬টি। প্রথম চার মাসের এই হিসাবে দেখা যাচ্ছে দৈনিক প্রায় তিনটি কলের ঘটনা ঘটছে। 

তবে বাস্তবে যানবাহনে ডাকাতির সংখ্যা আরও অনেক বেশি। অধিকাংশ ঘটনায় সরাসরি থানা পুলিশের কাছে যাওয়া কিংবা কেউ কেউ অভিযোগই না করার কারণে ৯৯৯-এ আসা ফোনকলের চেয়ে বাস্তবে এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি। এছাড়া ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডাকাতের কবলে পড়ে পুলিশের তাৎক্ষণিক সহায়তা চাওয়া ফোনের সংখ্যা ছিল এক হাজার ৪৩৩টি।

গত বৃহস্পতিবার রাতেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পিকআপ দাঁড় করিয়ে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। যে ঘটনা মুহূর্তেই ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়। যদিও ডাকাতির স্পট মুন্সীগঞ্জ, নাকি কুমিল্লা— তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি পুলিশের ঠেলাঠেলিতে।

দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার দাবি, এলাকাটি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া থানার ভবেরচরে। আর ভবেরচর হাইওয়ে থানা ও গজারিয়া থানার দাবি, এটি তাদের এলাকা নয়। প্রায় আড়াই মিনিটের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, মহাসড়কে একটি পিকআপ ভ্যান আড়াআড়িভাবে দাঁড় করানো। এতে গতি কমে আসে চলাচলরত যানবাহনের। তখন কয়েকজন যুবক গাড়িতে ঢিল ছোড়ে। একজনের হাতে লাঠিও ছিল। 

কুমিল্লা উত্তর জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ সাধারণ সম্পাদক লিটন সরকার দাবি করেন, তিনি এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি বলেন, প্রাইভেটকারে আমি ঢাকা থেকে কুমিল্লা ফিরছিলাম। গাড়িতে আমরা চারজন ছিলাম। রাত আড়াইটা বা ৩টার দিকে মহাসড়কে আড়াআড়ি করে রাখা একটি পিকআপ ভ্যান দেখে ড্রাইভার গাড়ির গতি কমিয়ে দেন। 

দেখে মনে হয়েছিল, গাড়িটি ডান থেকে বামে ঘুরবে। এমন সময় ১০ থেকে ১৫ জন এসে আমাদের প্রাইভেটকারে এলোপাতাড়ি কোপ দিতে থাকে। কয়েকজন এসে ইট দিয়ে জানালার কাচ ভাঙে। তাদের কেউ কেউ মুখোশ পরা ছিল। 

তিনি আরও বলেন, ওই হামলায় আমাদের গাড়ির চালক ইমাম আহমেদের মাথায় কোপ লাগে। তাকে চারটি সেলাই দিতে হয়েছে। আমার কর্মী শাখাওয়াৎ হোসেন ও মাসুম বিল্লার হাত কেটে গেছে। তিনি বলেন, ডাকাতরা আমাদের মোবাইল, মানিব্যাগ সবকিছু নিয়ে গেছে। যতটুকু খেয়াল করেছি, তাতে ডাকাতরা মাইক্রোবাস আর প্রাইভেটকার টার্গেট করেছিল। 

এসব বিষয়ে জানতে হাইওয়ে পুলিশের সদর দপ্তরে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপারদের সঙ্গে কথা বলতে বলা হয়।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে হাইওয়ে পুলিশ সুপার (গাজীপুর) আলী আহম্মদ খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে আমার সংবাদকে তিনি বলেন, মহাসড়কে টহল হাইওয়ে পুলিশের রুটিন ওয়ার্ক। এরই মধ্যে ডাকাতির ঘটনা একেবারেই ঘটছে না এমন নয়। কিছু কিছু যানবাহন যেমন লোকাল বাসগুলোতেই ডাকাতির ঘটনা বেশি ঘটে। বাসগুলোতে যাত্রীর ছদ্মবেশে ওঠে এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে ডাকাত কিংবা ছিনতাইকারীচক্র। 

গত বৃহস্পতিবার রাতের ঘটনায় যে পিকআপটি মহাসড়কে আড়াআড়িভাবে রাখা হয়েছিল, সেটি আমরা জব্দ করেছি। একইসঙ্গে সন্দেহভাজন তিনজনকেও আটক করেছি। তাদের কাগজপত্র পরীক্ষার জন্য বিআরটিএতে দেয়া হয়েছে।

এছাড়া বিআরটিএর দেয়া তথ্যে আমরা এ ঘটনায় জড়িতদের স্থায়ী ঠিকানাসহ সার্বিক তথ্য অনুসন্ধান করব। আটক তিনজন মুচলেকা দিয়ে বর্তমানে জামিনে রয়েছে। এছাড়া সাম্প্রতিককালে এসব ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় টহল জোরদার করা হয়েছে।

এরই মধ্যে শুক্রবার রাতে ফের কুমিল্লার দাউদকান্দিতে আরেকটি মাইক্রোবাসে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার পর ভুক্তভোগীদের করা ভিডিও ফেসবুকেও ছড়িয়ে পড়েছে আগের ঘটনার মতোই। ভিডিওতে ভুক্তভোগীরা বলেন, ডাকাতরা তাদের সঙ্গে থাকা নগদ টাকা, মোবাইল সবই নিয়ে গেছে। এছাড়া মাইক্রোবাসের ভিডিও করে দেখান ভুক্তভোগী। 

সেখানে দেখা যায়, পুরো মাইক্রোবাসের সামনে-পেছনে এবং দুই পাশের সব গ্লাসই ভেঙে ফেলে ডাকাতরা। যদিও ভিডিওতে ভুক্তভোগীরা তাদের নাম-পরিচয় জানাননি, জানাননি আইনি পদক্ষেপের কথাও। তবে আমার সংবাদের হাতেও এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ রয়েছে।

জানতে চাইলে  হাইওয়ে পুলিশ সুপার (কুমিল্লা) মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ আমার সংবাদকে বলেন, মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনা আগেও ছিল; গ্রেপ্তারও হতো। এখন আবার এদের উৎপাত দেখা দিয়েছে। শুধু কুমিল্লা নয়— চট্টগ্রাম, মিরসরাই এলাকাতেও হয়। এদের ডাকাতও বলা যায় না, এরা মূলত মৌসুমি ছিঁচকে ছিনতাইকারী। 

তবে এদের আমরা গ্রেপ্তার করলেও কিছুদিন পর জামিনে বের হয়ে যায়। পরবর্তীতে আমরা এদের অনুসরণও করতে পারি না। যেহেতু আমরা মামলার তদন্ত করতে পারি না। তবে এদের আর ছাড় নয়। মহাসড়কে এসব ছিঁচকে ছিনতাইকারীকে প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলছেন তিনি।

এ বিষয়ে তিনি কুমিল্লার পুলিশ সুপারের সঙ্গেও কথা বলেছেন। এসব ঘটনা প্রতিরোধে কৌশলগত কিছু পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে ইতোমধ্যে। যেহেতু ইতোমধ্যে দু-তিনটি ঘটনা ঘটে গেছে, তাই আর ছাড় নয়। এছাড়া টহল জোরদার করা হয়েছে। পেট্রোল টিমও কাজ করছে।

এদিকে সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের মারুয়াদী বাজার এলাকা থেকে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে ডাকাতচক্রের ৯ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-১১। এছাড়াও আন্তঃজেলা ডাকাত দলের দুর্ধর্ষ আরেক চক্রের কয়েক সদস্যও বর্তমানে গোয়েন্দাদের নজরদারিতে রয়েছে।

জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ডাকাতি-ছিনতাইসহ মাদক কারবারি এ চক্রের অন্যতম হোতা কক্সবাজারের চকরিয়ার বাদল ডাকাত। বাদল ছাড়াও কোরবান ডাকাত ও সুমনসহ আরও কয়েকজনের নেতৃত্বে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনা ঘটছে বলেও জানা গেছে। 

নারায়ণগঞ্জের র‌্যাব-১১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল তানভীর মোহাম্মদ পাশা বলেন, ঈদের আগে ও পরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বেশ কয়েকটি ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে র‌্যাব মাঠে কাজ করতে গিয়ে দেখেছে, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁকেন্দ্রিক একটি ডাকাতচক্র বেশ তৎপরতা চালিয়ে থাকে। এই চক্রটি আড়াইহাজার এলাকার দিকেও ডাকাতি করে থাকে। 

ইতোমধ্যেই গত বৃহস্পতিবার রাতে আড়াইহাজার এলাকায় ডাকাতির প্রস্তুতিকালে ৯ সক্রিয় ডাকাতকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১১।

তিনি বলেন, কুমিল্লার চান্দিনা এলাকায়ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দুর্ধর্ষ ডাকাতচক্রের তৎপরতার খবর রয়েছে। এই চক্রের সদস্যরা সাধারণত আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে না। অস্ত্র হিসেবে তারা ধারালো চাপাতি, কিরিচ, ছোরা ও রামদা ব্যবহার করে থাকে। মহাসড়কে কোনো কারণে কোনো গাড়ি থামলে বা যানজটে পড়লে সে সুযোগ কাজে লাগায় চক্রটি। এছাড়া গাছের ডালপালা ফেলে বা গাড়ির কাচে ইট-পাথর নিক্ষেপ করেও গতিরোধের চেষ্টা করে।

সূত্র জানায়, মহাসড়কের ৩০-৩৫টি জায়গায় প্রায়ই ডাকাতি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ছাড়াও ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-ফরিদপুর-ঝিনাইদহ মহাসড়ক। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ, সোনারগাঁ, কাঁচপুর, কুমিল্লার চান্দিনা, পদুয়ারবাজার, বাড়বুকুণ্ড, সুয়াগাজী, সীতাকুণ্ড এলাকায় ডাকাতচক্রের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। 

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আড়াইহাজার, রূপগঞ্জ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ ও রাজবাড়ী; ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের রাজেন্দ্রপুর (ন্যাশনাল পার্ক), ভালুকা, আশুলিয়া, এলেঙ্গা, চম্পাগঞ্জ, মির্জাপুর, কালিয়াকৈর, কবিরপুর, বাইপাইল, নবীনগর, সাভার, হেমায়েতপুর, চন্দ্রা, কোনাবাড়ী, ধামরাই ও কামালপুরসহ আরও কিছু স্থানে ডাকাত-ছিনতাইকারীদের তৎপরতার খবর পাওয়া গেছে। 

এসব রুটে সাধারণত বিভিন্ন পণ্যবাহী লরি ও পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের কাভার্ডভ্যান এবং গরুর গাড়িগুলোকে বেশি টার্গেট করা হয়। এছাড়াও প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, এমনকি যাত্রীবাহী বাসকেও অনেক সময় টার্গেট করে ডাকাতচক্রের সদস্যরা।