নিজস্ব প্রতিবেদক
ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬, ১২:০৯ এএম
বাংলাদেশে গত কয়েক মাসের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির পর পটপরিবর্তনের হাওয়া এখন বইছে খেলার মাঠেও। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায় এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেশের ক্রিকেট অঙ্গনে নাটকীয় মোড় লক্ষ্য করা গেছে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গত মঙ্গলবার শপথ নিয়েছে নতুন সরকার। আর দায়িত্ব নিয়েই ক্রীড়াঙ্গনে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন নবনিযুক্ত যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।
সাকিব-মাশরাফীকে ফেরানোর বিষয়: বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হওয়া বাংলাদেশের দুই ক্রিকেট আইকন সাকিব আল হাসান এবং মাশরাফী বিন মোর্ত্তজাকে ঘিরে চলমান আইনি জটিলতা নিরসনের আশ্বাস দিয়েছেন নতুন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী।
আমিনুল হক, যিনি নিজে জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক এবং বিএনপির রাজনীতির সাথে দীর্ঘকাল যুক্ত, তিনি স্পষ্ট করেছেন যে সাকিব ও মাশরাফীর মতো বড় মাপের খেলোয়াড়দের মাঠের বাইরে রাখা দেশের ক্রিকেটের জন্য ক্ষতি।
সচিবালয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নই। সাকিব আল হাসান এবং মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা দেশের ক্রিকেটে অনেক অবদান রেখেছেন। তাদের বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো রয়েছে, সেগুলো যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করে দ্রুত তাদের ক্রিকেটে ফিরিয়ে আনার পরিবেশ তৈরি করতে চাই।
পটভূমি: রাজনীতি ও ক্রিকেটের সংমিশ্রণ- গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে রাজনীতি এবং ক্রিকেট একাকার হয়ে গিয়েছিল। সাকিব আল হাসান মাগুরা-১ এবং মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা নড়াইল-২ আসন থেকে আওয়ামী লীগের টিকিটে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। তবে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতায় আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই দুই মহাতারকা আইনি গ্যাঁড়াকলে পড়েন। সাকিবের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা থেকে শুরু করে নানা দুর্নীতির অভিযোগ এবং মাশরাফীর বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়।
ফলস্বরূপ, সাকিব আল হাসান আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নিলেও নিরাপত্তার শঙ্কায় দেশে ফিরতে পারছিলেন না। অন্যদিকে মাশরাফী তো ক্রিকেট থেকে একপ্রকার নির্বাসিতই ছিলেন।
বিএনপি সরকারের কৌশলী অবস্থান: বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত কৌশলী। জনপ্রিয় ক্রিকেটারদের প্রতি নমনীয়তা দেখিয়ে সরকার মূলত একটি ‘নিউট্রাল’ বা নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে চাচ্ছে। আমিনুল হক নিজেও একজন ক্রীড়াবিদ হওয়ায় তিনি অনুধাবন করছেন যে, বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ব্র্যান্ড ভ্যালু ধরে রাখতে সাকিবের মতো অলরাউন্ডার এখনো অপরিহার্য। তবে প্রশ্ন উঠছে, যারা সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, সাধারণ ক্রিকেট সমর্থকরা তাদের এই ‘ফেরা’ সহজভাবে নেবেন কি না। বিশেষ করে ছাত্র আন্দোলনের সময় সাকিবের নীরবতা নিয়ে এখনো সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ রয়েছে।
এক নজরে বর্তমান পরিস্থিতি- বর্তমান অবস্থা: নতুন সরকারের অবস্থান। সাকিব আল হাসান: দেশের বাইরে অবস্থান, একাধিক মামলার আসামি । আইনি জটিলতা কমিয়ে দলে ফেরানোর আশ্বাস। মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা: নড়াইলে মামলার মুখে, ক্রিকেট থেকে দূরে। মামলার আইনি সমাধান ও ক্রিকেটে ফেরার সুযোগ। আমিনুল হক: নবনিযুক্ত ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। প্রতিহিংসা পরিহার করে সংস্কারের পরিকল্পনা।
ক্রিকেট বোর্ডেও কি পরিবর্তনের হাওয়া? শুধুমাত্র খেলোয়াড়দের ফেরার বিষয় নয়, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)-র কাঠামোতেও বড় পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তারেক রহমান সরকারের এই নতুন পদক্ষেপে বিসিবির বর্তমান শীর্ষ পদের রদবদল সময়ের ব্যাপার মাত্র। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনাই তাদের মূল লক্ষ্য।
সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমর্থকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একদল মনে করছেন, অপরাধ আর ক্রিকেটকে আলাদা করে দেখা উচিত। সাকিব ফিরলে বাংলাদেশ দল আবার শক্তিশালী হবে। অন্যদলের মতে, যারা জনগণের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিল, তাদের বিচার হওয়াটা ক্রিকেটে ফেরার চেয়ে বেশি জরুরি।
ইউনূস সরকারের আমলে সাকিবের ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ মনে হলেও, তারেক রহমানের সরকার গঠনের প্রথম দিনেই পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। এখন দেখার বিষয়, আইনি প্রক্রিয়াগুলো ঠিক কতটা দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং মাশরাফী-সাকিব আবার কবে মিরপুরের সবুজ গালিচায় ব্যাট-বল হাতে নামতে পারেন।
জেএইচআর