ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে এক মেগা প্রকল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

এপ্রিল ৬, ২০২৬, ০২:২৫ পিএম

সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে এক মেগা প্রকল্প

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দেশের বিমান চলাচল খাতের সবচেয়ে বড় অবকাঠামোগত বিনিয়োগগুলোর একটি যা এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। নির্মাণ শেষ হওয়ার দীর্ঘ সময় পার হলেও অপারেটর নিয়োগে অনিশ্চয়তা, নীতিগত দ্বিধা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাবে প্রকল্পটি কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। এর ফলে একদিকে যেমন বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে যাত্রীরা।

নির্মাণ শেষ, কিন্তু অপারেশন অনিশ্চিত : আধুনিক স্থাপত্যশৈলী, উন্নত প্রযুক্তি এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন যাত্রীসেবা ব্যবস্থার সমন্বয়ে নির্মিত এই টার্মিনালটি ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ চালুর কথা ছিল। কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলেও বাস্তবে তা চালু হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন হলেও অপারেশনাল ব্যবস্থাপনা চূড়ান্ত না হওয়ায় টার্মিনালটি কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রাথমিকভাবে পরিকল্পনা ছিল, বিনিয়োগকারী দেশ জাপানের একটি কনসোর্টিয়ামকে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হবে। আগের সরকারের সময় এই বিষয়ে একটি প্রাথমিক সমঝোতা তৈরি হয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পরিচালনায় জাপানের সীমিত অভিজ্ঞতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল।

সরকার পরিবর্তন, নীতির পরিবর্তন- তবু অচলাবস্থা : ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন করে প্রকল্পটি মূল্যায়ন করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে অপারেটর নির্বাচন উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে করা হবে। কিন্তু প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকার আবারও জাপানের সঙ্গেই আলোচনায় বসেছে। এতে করে নীতিগত ধারাবাহিকতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

কেন আবার জাপান : সরকারি সূত্রগুলো বলছে, জাপান ইতোমধ্যে প্রকল্পে বড় বিনিয়োগ করেছে এবং তারা সংশোধিত প্রস্তাবও দিয়েছে। এতে খরচ কিছুটা বেড়েছে, তবে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র ও বেসামরিক বিমান বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানান, ‘জাতীয় স্বার্থ এবং এভিয়েশন খাতের অর্থনৈতিক লাভজনকতা বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আমরা দেখছি প্রস্তাবগুলো কতটা কার্যকর এবং টেকসই।’ তবে সমালোচকরা বলছেন, বিনিয়োগকারী হওয়া মানেই অপারেটর হিসেবে যোগ্য হওয়া নয়। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পরিচালনা একটি বিশেষায়িত দক্ষতা, যা বিশ্বের কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

অভিজ্ঞতার প্রশ্নে বিতর্ক : এভিয়েশন খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্বের অনেক স্বীকৃত অপারেটর রয়েছে যারা বড় বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পরিচালনায় অভিজ্ঞ। তাদের তুলনায় জাপানি কনসোর্টিয়ামের অভিজ্ঞতা কম। এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অববাংলাদেশ-এর মহাসচিব মফিজুর রহমান বলেন, ‘জাপানের কোনো বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। অথচ বিশ্বের অনেক নামকরা অপারেটর এখানে কাজ করতে আগ্রহী। তাহলে আমরা কেন প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করছি না?’ তার মতে, উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া সরাসরি দায়িত্ব দিলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে।

ওপেন টেন্ডারের দাবি জোরালো : বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের বড় প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক ওপেন টেন্ডার অপরিহার্য। এতে করে সেরা প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব, খরচ কমানো যায়, আন্তর্জাতিক মান বজায় থাকে, দুর্নীতির ঝুঁকি কমে। তারা আরও বলেন, প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো একটি দেশ বা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হলে তা ভবিষ্যতে নীতিগত ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ঋণের চাপ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা : এই টার্মিনাল নির্মাণে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা পেরিয়ে গেছে প্রায় দুই বছর। কিন্তু টার্মিনাল চালু না হওয়ায় প্রত্যাশিত রাজস্ব আসছে না। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, যত দেরি হবে, ততই বাড়বে সুদ ও আর্থিক চাপ। ফলে প্রকল্পটি লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে।

গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং নিয়েও নতুন সমীকরণ : টার্মিনাল পরিচালনার পাশাপাশি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। বর্তমানে এই দায়িত্বে রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। তবে গুঞ্জন রয়েছে, নতুন টার্মিনালে এই আধিপত্য কমতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রতিষ্ঠান এই খাতে প্রবেশের চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে। এতে করে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

যাত্রীসেবায় প্রভাব : টার্মিনাল চালু না হওয়ায় যাত্রীদের ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান টার্মিনালগুলোতে যাত্রী চাপ বাড়ছে, যার ফলে- চেক-ইন ও ইমিগ্রেশনে দীর্ঘ সময় লাগছে, লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ে সমস্যা হচ্ছে, সামগ্রিক যাত্রী অভিজ্ঞতা খারাপ হচ্ছে। নতুন টার্মিনাল চালু হলে এসব সমস্যা অনেকটাই কমে আসার কথা ছিল।

আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির প্রশ্ন : বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একটি দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তার অর্থনীতি ও ভাবমূর্তির প্রতিফলন। সেই দিক থেকে এই দীর্ঘসূত্রতা আন্তর্জাতিক মহলে নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বড় প্রকল্পে সিদ্ধান্তহীনতা দেখলে ভবিষ্যতে বিনিয়োগে অনীহা দেখাতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দ্রুত সিদ্ধান্তের চাপ : সরকার এখন একদিকে দ্রুত টার্মিনাল চালুর চাপ, অন্যদিকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। তারা চাইছে- দ্রুত অপারেশন শুরু করতে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে।

আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে কিন্তু এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা সহজ নয়। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে- ১. জাপানের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি চূড়ান্ত করা, ২. আন্তর্জাতিক ওপেন টেন্ডার আহ্বান করা, ৩. অন্তর্বর্তীকালীনভাবে স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় চালু করা প্রতিটি পথেরই সুবিধা ও ঝুঁকি রয়েছে।

সর্বোপরি, শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনাল এখন শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, এটি দেশের নীতি নির্ধারণ, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। একদিকে দ্রুত চালুর তাগিদ, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যে সিদ্ধান্তই নেয়া হোক না কেন, তা যেন হয় স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক এবং জাতীয় স্বার্থের পক্ষে এটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।

Link copied!