নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
জানুয়ারি ১৯, ২০২৬, ০৮:২০ পিএম
বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে চরম শঙ্কার কথা জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
সোমবার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে এক দীর্ঘ বৈঠকে এনসিপি নেতারা দাবি করেছেন, মাঠপর্যায়ে নিরপেক্ষতার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
তাদের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, নির্বাচন যদি সুষ্ঠু না হয়, তবে এর ঐতিহাসিক দায়ভার অধ্যাপক ইউনূস ও তার অন্তর্বর্তী সরকারকেই বহন করতে হবে।
বিকেল পাঁচটা থেকে শুরু হওয়া প্রায় ৫০ মিনিটের এ বৈঠকে এনসিপির পক্ষে নেতৃত্ব দেন দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। সাথে ছিলেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, মনিরা শারমিন এবং জহিরুল ইসলাম। সরকারের পক্ষে অধ্যাপক ইউনূসের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।
বৈঠক শেষে যমুনার ফটকে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নাহিদ ইসলাম নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন বর্তমানে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের, বিশেষ করে বিএনপির ‘চাপের মুখে’ কাজ করছে।
তিনি বলেন, "নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন হতে হবে, কিন্তু আমরা দেখছি তারা মব কালচার বা চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে।"
এনসিপির পক্ষ থেকে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি আনা হয়েছে প্রার্থীদের যোগ্যতা নিয়ে। দলটির নেতাদের দাবি, বিএনপির চাপে পড়ে অনেক দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছে কমিশন। নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি ও তাদের ছাত্রসংগঠন নির্বাচন কমিশনের সামনে অবস্থান নিয়ে চাপ তৈরি করছে, যার ফলে আপিল নিষ্পত্তির আগেই রায় প্রভাবিত হচ্ছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, শুধুমাত্র বিএনপি নয়, জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যেও দ্বৈত নাগরিক রয়েছেন। এনসিপির অবস্থান পরিষ্কার, আইন সবার জন্য সমান হতে হবে। দ্বৈত নাগরিকরা তথ্য গোপন করে নির্বাচনে অংশ নিলে এনসিপি তা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যাবে বলে ঘোষণা দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সরাসরি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিশানায় রেখে বেশ কিছু প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, তারেক রহমান দেশে ফেরার পর বলেছিলেন তাঁর একটি বিশেষ পরিকল্পনা আছে। এখন জনগণের মনে প্রশ্ন জাগছে, একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে চাপ দেওয়া, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করা, প্রশাসনকে দলীয়করণ করা এবং ঋণখেলাপিদের সংসদে নিয়ে যাওয়াই কি তাঁর সেই পরিকল্পনার অংশ?
নাহিদ ইসলাম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি ২০০৮ সালের মতো কোনো 'ইঞ্জিনিয়ার্ড' বা সাজানো নির্বাচনের পরিকল্পনা করা হয়, তবে তরুণ সমাজ তা রুখে দেবে। এবারের নির্বাচন হতে হবে ১৯৯১ সালের মতো স্বচ্ছ ও উৎসবমুখর।
নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগে ঢাকা ১১ আসনে এনসিপির প্রার্থী নাহিদ ইসলাম ও ঢাকা ৮ আসনের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে রিটার্নিং কর্মকর্তার দেওয়া শোকজ নোটিশ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে দলটি। এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এটিকে 'মিডিয়া ট্রায়াল' ও 'উদ্দেশ্যপ্রণোদিত' বলে অভিহিত করেছেন।
আসিফ মাহমুদ বলেন, যদি পোস্টারে ছবি ব্যবহারের কারণে আমাদের শোকজ করা হয়, তবে তারেক রহমানের ছবি তো সারা দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। আইন সবার জন্য সমান হলে আগে তাকে তারেক রহমানকে শোকজ করা উচিত। এ শোকজ দ্রুত প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি।
এনসিপি নেতাদের সব অভিযোগ ও শঙ্কার কথা ধৈর্য সহকারে শোনেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে, তিনি এনসিপিকে আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, এ নির্বাচনে সরকারের কোনো পক্ষপাতের সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, এ নির্বাচন দেশের ভাগ্য পরিবর্তন এবং দেশ পাল্টে দেওয়ার নির্বাচন। এটি সুষ্ঠু হতেই হবে। অধ্যাপক ইউনূস আরও বলেন, নির্বাচন নিয়ে যেকোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সরাসরি সরকারকে জানাতে হবে। কেউ আইন অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' বা সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর।
এছাড়া আসন্ন গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোটের পক্ষে সরকারের প্রচারণা যে আইনসম্মত, সেটিও তিনি স্পষ্ট করেন। সরকারকে দেশ পুনর্গঠনের ম্যান্ডেট দিতে কেন 'হ্যাঁ' ভোট প্রয়োজন, তা জনগণকে বোঝানো সরকারের দায়িত্ব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নির্বাচনের তারিখ যত ঘনিয়ে আসছে, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আর আস্থার সংকট ততই ঘনীভূত হচ্ছে। একদিকে এনসিপির মতো নতুন রাজনৈতিক শক্তির তীব্র প্রতিবাদ, অন্যদিকে বড় দলগুলোর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা, সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মুখে। নির্বাচন কমিশন কি পারবে সব চাপ উপেক্ষা করে নিরপেক্ষ থাকতে? না কি প্রধান উপদেষ্টার বারবার দেওয়া আশ্বাসই শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে? এ প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আগামী কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক ঘটনপ্রবাহে।