Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ০৬ জুলাই, ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯

পাম তেল রপ্তানি শুরু করছে ইন্দোনেশিয়া

ভোজ্যতেলের দাম কমবে কবে

রেদওয়ানুল হক

রেদওয়ানুল হক

মে ২৩, ২০২২, ০১:৩৮ এএম


ভোজ্যতেলের দাম কমবে কবে

রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা থেকে ফিরে আজ (সোমবার) থেকে পাম তেল রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক করছে ইন্দোনেশিয়া। গত ১৯ মে দেশটির প্রেসিডেন্ট জোকো উইডোডো এ ঘোষণা দেন। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পাম তেল রপ্তানিকারক দেশ ইন্দোনেশিয়ার এমন ঘোষণায় বিশ্ববাজারে পামতেলের দাম আবার কমতে শুরু করেছে। 

সে হিসেবে দেশের বাজারেও পাম তেলসহ ভোজ্যতেলের দাম কমার কথা। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া রপ্তানি বন্ধের ঘোষণার সাথে সাথে দেশের বাজারে যেভাবে অস্বাভাবিক দাম বাড়তে থাকে, রপ্তানি প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হওয়ার ঘোষণার পর দাম কমার তেমন চিত্র দেখা যাচ্ছে না। আমদানিকারকদের মুখে ভিন্ন সুর।

তারা বলছেন, ইতোমধ্যে তারা বেশি দামে কিনে ফেলেছেন। এখন কিভাবে কমাবেন। অথচ আগে কম দামে কেনা থাকলেও বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার সাথে সাথেই দেশে বেড়ে যায়। এ বিষয়ে আমদানিকারক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়ে থাকেন। কিন্তু বাস্তবে বেশি দামেই কিনতে হয় সাধারণ ক্রেতাদের। 

দাম কমার প্রশ্নে আমদানিকারকরা বলছেন, এলসি ও এন্ট্র্রির গড় হিসাবে দাম সমন্বয়ের যে নিয়ম রয়েছে সেভাবেই দাম নির্ধারিত হবে। তবে কবে নাগাদ আবার দাম সমন্বয় হবে এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। 

ভোজ্যতেল আমদানিকারক ও রিফাইনারি প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপের জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক কাজি সালাউদ্দিন আহমেদ আমার সংবাদকে বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়া রপ্তানি বন্ধের ঘোষণার পর দাম যখন বেড়ে যায়, তখন সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারের অনুরোধে আমরা বেশি দামে ৭২ হাজার টন পাম তেল আমদানির এলসি খুলেছি। এখন দাম কমতে শুরু করেছে। এতে আমরা লোকসানে পড়তে যাচ্ছি বলে মনে হচ্ছে।’ ইন্দোনেশিয়া রপ্তানি বন্ধের প্রেক্ষাপটে দাম বেড়ে গেলে কম দামে আমদানি করা তেল বাড়তি দামে বিক্রি করা হয়েছে। 

এখন কমছে না কেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়ার ঘোষণায় কোনো প্রভাব পড়েনি। মূলত, আমদানি এলসি এবং এন্ট্রি এই দুটি বিষয় হিসাব করে দাম সমন্বয় করা হয়। আমদানিকারকদের বক্তব্য অনুযায়ী খুচরা বাজারে দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পাইকারি ও খুচরা দোকানিরা ভূমিকা রাখে। কিন্তু দোকানিদের বক্তব্য ভিন্ন। 

বলছেন, বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে গেলে সরবরাহ কমিয়ে দেয় মিলাররা। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে কমতে শুরু করলে সরবরাহ বাড়িয়ে দিয়ে নিজেদের লোকসান এড়িয়ে যায় তারা। একই সঙ্গে দাম বাড়লে সমন্বয়ের ব্যাপারে যেভাবে উদ্যোগী হয়, কমলে সহজে দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নেয়া হয় না। 

বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা আমার সংবাদকে বলেন, ‘এক মাস পরপর ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয় হয়। আমরা দাবি করেছি এটি ১৫ দিন পরপর করার জন্য। আমাদের হাতে দাম বাড়ানো বা কমানোর কিছু নেই। বাংলাদেশে যে পাঁচ-ছয়টি প্রতিষ্ঠান আমদানির সাথে জড়িত তাদের হাতে সব। আমরা এর আগেও বলেছি সরবরাহ কমবেশি করার বিষয়ে। আসলে এতে কোনো লাভ হয় না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও মিলাররা মিলে যা করে তাই আমাদের মেনে নিতে হয়।’ 

তিনি বলেন, এখন আর আমাদের হাতে কিছুই নেই। আগে খোলা তেল ও পামতেলের দাম নির্ধারিত ছিল না। তখন দাম বাড়লে বাড়াতাম, কমলে কমাতাম। এখন সরকার দাম নির্ধারণ করে দিচ্ছে।

গত ২৮ এপ্রিল থেকে অপরিশোধিত পামওয়েল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় ইন্দোনেশিয়া। এ নিষেধাজ্ঞার পরপরই দেশের বাজারে ভোজ্যতেলের দাম লাগামহীন বাড়তে শুরু করে। সরকারি পর্যায়ে দাম বৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই বাজার থেকে সয়াবিন তেল গায়েব করে দেয় সিন্ডিকেট চক্র। দেশে ভোজ্যতেলের তীব্র সংকট দেখা দেয়। 

এরপর গত ৫ মে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৩৮ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৪৪ টাকা বাড়ানো হয়েছে। পামতেলের দাম বাড়ানো হয় লিটারে ৪২ টাকা। কিন্তু খুচরা পর্যায়ে লিটারে আরও ৫-১০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদের। গত ১০ মাসে চার দফায় সয়াবিন তেলের দাম বাড়লেও গত মার্চে একবার সয়াবিন তেলের দাম কমানো হয়েছিল। 

বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, আগে মালয়েশিয়া থেকে অধিকাংশ তেল আমদানি করা হতো। এখন মালয়েশিয়ার তুলনায় ইন্দোনেশিয়ায় দাম প্রতি টনে ১০ থেকে ১৫ ডলার পার্থক্য থাকে। অর্থাৎ লিটারে এক টাকা কম। 

তাই মালয়েশিয়া থেকে খুব কম পরিমাণে পাম তেল আমদানি করা হয়। মোট আমদানির প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে ইন্দোনেশিয়া থেকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) পাম তেল আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা মোট ৯৫ কোটি ৯৬ লাখ ২৮ হাজার ডলারের পরিমাণ পাম তেল আমদানি করে। 

এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি হয়েছে ৮০ কোটি ৯৩ লাখ ১৭ হাজার ডলারের পাম তেল। এর বিপরীতে মালয়েশিয়া থেকে আমদানি হয়েছে ১১ কোটি ৭৪ লাখ ৭৩ হাজার ডলারের। এছাড়া সিঙ্গাপুর থেকে দুই কোটি ৯২ লাখ সাত হাজার ডলার, থাইল্যান্ড থেকে ৩৬ লাখ ১৭ হাজার ডলার ও অন্যান্য দেশ থেকে বাকি ১৪ হাজার ডলারের পাম তেল আমদানি হয়।  অর্থাৎ প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানি ইন্দোনেশিয়া থেকে। 

বর্তমানে সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, বোতলজাত প্রতি লিটার সয়াবিন তেল খুচরাপর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ১৯৮ টাকায়, যার আগের দাম ছিল ১৬০ টাকা। আর পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ৯৮৫ টাকা, যেটি ৭৬০ টাকায় বিক্রি হতো। এছাড়া খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৮০ টাকা এবং খোলা পাম তেল প্রতি লিটার ১৭২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম বাড়ার আগে বাজারে খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৩৬ টাকা ও পাম তেল ১৩০ টাকায় বিক্রি হতো। এ হিসাবে খোলা সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে লিটারে ৪৪ টাকা। আর পামতেলের দাম ৩৬ টাকা বাড়ানো হয়েছিল।