Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর, ২০২২, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

জালিয়াতির সুযোগ দিতে প্রজ্ঞাপন

বিআইএফসি কেলেঙ্কারিতে জড়িত বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৫০ কর্মকর্তা

রেদওয়ানুল হক

নভেম্বর ২১, ২০২২, ০১:২৭ এএম


বিআইএফসি কেলেঙ্কারিতে জড়িত বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৫০ কর্মকর্তা
  • জালিয়াতিতে প্রত্যক্ষ অংশীদার ছিল আরজেএসসি, বিএসইসি ও অডিটফার্ম
  • পিকে হালদারের হাতে বিআইএফসি তুলে দিতে সহায়তা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা
  • বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিনা জামানতে টাকা এনে ঋণের নামে হরিলুট
  • নামে-বেনামে সাড়ে ১১শ কোটি হাতিয়েছেন মেজর (অব.) মান্নান
  • এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে : টিআইবি

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফসি) থেকে এক হাজার ১৫৬ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে মেজর (অব.) মান্নান। একইসাথে অনিয়মকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে কৌশলে প্রতিষ্ঠানটিকে বহুল আলোচিত ও বিপুল অর্থপাচারকারী প্রশান্ত কুমার (পিকে) হালদারের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। অর্থ আত্মসাতকারী জালিয়াতচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো আর্থিক খাতে অস্থিরতা সৃষ্টির অজুহাত দেখিয়ে তদন্ত কর্মকর্তাদের নিবৃত করে রাখে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্তারা।

এমনকি জালিয়াতচক্রকে সুবিধা দিতে আইন লঙ্ঘন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। যা আর্থিক খাতে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি চরম আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয়। কর্মকর্তাদের ইচ্ছাকৃত অবহেলা ও অনিয়মের ফলে বিআইএফসির দায় সম্পদের দ্বিগুণ হওয়ার পর মহা-কেলেঙ্কারি উদ্ঘাটন হয়। উচ্চ আদালতের নির্দেশে গঠিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির বিশেষ তদন্তে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

দীর্ঘ তদন্ত শেষে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি বা বিশেষ তদন্ত দল বিআইএফসিতে সংঘটিত অনিয়ম-দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ এনে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ, অফসাইট ও অনসাইট সুপারভিশন বিভাগ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ মোট ২৫০ জনকে দায়ী করে।

এছাড়া বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), রেজিস্টার অব জয়েনস্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসি) ও সংশ্লিষ্ট অডিট কোম্পানিগুলোকে দায়ী করে প্রতিবেদন দাখিল করে বিশেষ তদন্ত দল।

বিশেষ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিআইএফসিতে আর্থিক অনিয়ম-জালিয়াতির মূল হোতা পিকে হালদার ও তার সহযোগী (মেজর অব.) মান্নান। গভর্নরের নির্দেশ ছাড়াই ২০১৫ সালের ১১ মার্চ নোট ইস্যু করা হয়।

এতে ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য পর্যালোচনা করে বিআইএফসি ও ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেডে বিশেষ পরিদর্শন পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। যদিও ঋণের গুণগতমান একই রকম হওয়ায় ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিঃ. এবং পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিঃ.-এর বিষয়েও বিশেষ পরিদর্শন পরিচালনা বাঞ্ছনীয় ছিল।

প্রতিবেদনে বিআইএফসির প্রাক্তন এমডি মাহমুদ মালিকের জবানবন্দি উল্লেখ করে বলা হয়, পিকে হালদার কৌশলে বিআইএফসির বোর্ড টেকওভার করার লক্ষ্যে একটি কোম্পানি গঠন করে। এর প্রেক্ষিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ স্বাভাবিক কার্যক্রমের বাইরে বিশেষ উদ্দেশে ২০১৫ সালের বিশেষ পরিদর্শন পরিচালনা করেছিল বলে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির তদন্তে উঠে আসে। তদন্তে দেখা যায়, কয়েক বছর ঋণের গুণগত মান ক্রমাগতভাবে অসন্তোষজনক থাকা সত্ত্বেও বিআইএফসিতে তেমন কোনো কার্যকর ও ফলপ্রদ ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

বিশেষ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিআইএফসিতে আর্থিক অনিয়ম ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের জন্য তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ মালিক দায়ী থাকলেও তাকে দায়মুক্তি দেয়ার উদ্দেশে ২০১৫ সালের বিশেষ পরিদর্শনে আর্থিক অনিয়ম ও অবৈধ কর্মকাণ্ডসমূহের সংঘটনকাল সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি পরিদর্শন প্রতিবেদনে তার প্রসঙ্গই আনা হয়নি।

কিন্তু বর্তমান তদন্তে দেখা গেছে, ওই পরিদর্শন চলাকালে মাহমুদ মালিক সুকুজা ভেঞ্চার লিঃ. গঠনের কাজে পিকে হালদারের সাথে কাজ করছিলেন এবং বিশেষ পরিদর্শন পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের নামে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ বিআইএফসির নিয়ন্ত্রণভার সুকুজা ভেঞ্চার ও কাঞ্চি ভেঞ্চার লিঃ.-এর প্রকৃত মালিক পিকে হালদারের হাতে তুলে দেন। এই বিশেষ উদ্দেশ্যেই বিশেষ পরিদর্শন ও তৎপরবর্তী কার্যক্রমসমূহ পরিচালিত হয়েছে। একই কারণে মাহমুদ মালিককে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিআইএফসিতে পরিচালক পর্ষদ সদস্যদের আর্থিক অনিয়ম ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে সবাইকে অপসারণ করে আইন মোতাবেক প্রশাসক নিয়োগ কিংবা অবসায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার ছিল। পরিদর্শকদের প্রস্তাব সত্ত্বেও ডিএফআইএমের মহাব্যবস্থাপক নামমাত্র পর্যবেক্ষক নিয়োগ করে কালক্ষেপণ করে সুকুজা ভেঞ্চার ও কাঞ্চি ভেঞ্চার লিমিটেড নামে একেবারে নতুন প্রাইভেট কোম্পানি যাদের ব্যবসা কখনই শুরু হয়নি তাদের নামে বহুল আলোচিত ঋণ জালিয়াতিচক্রের হোতা পিকে হালদারের নিয়ন্ত্রণে বিআইএফসি তুলে দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে।

উপযুক্ত ও স্বচ্ছ ইমেজের শেয়ার হোল্ডার পরিচালক ও নিরপেক্ষ স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের নামে সুকৌশলে পিকে হালদারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচালক ও স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দিয়ে বিআইএফসি নিয়ন্ত্রণে নেয়। বিশেষ তদন্ত দলের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, সুকুঞ্চা ভেঞ্চার ও কাঞ্চি ভেঞ্চার লিঃ. মূলত অস্তিত্বহীন কাগুজে প্রতিষ্ঠান। যার কোনো এজিএম কিংবা বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন নেই।

কোম্পানি আইনে এসব প্রতিষ্ঠান বাতিলযোগ্য হলেও আরজেএসসি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই শেয়ার হস্তান্তরের নামে লেয়ারিংয়ের সুযোগ করে দিয়েছে। এই সুযোগে কোম্পানির নাম দেখিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও অবৈধ কার্যক্রমের পাশাপাশি বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে মেজর মান্নান বিআইএফসি থেকে আত্মীয়-স্বজনের নামে-বেনামে ৬৭টি ঋণ হিসাবের বিপরীতে ৫১৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। পরবর্তীতে আরজেএসসির সহায়তায় চেক লেয়ারিংয়ের মাধ্যমে টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে।

এসব ঋণের ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘন করে অধিক পরিমাণে ও বিনা জামানতে এসব ঋণ মঞ্জুর ও বিতরণ করা হয়েছে। ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সিআইবি রিপোর্ট যাচাই করা হয়নি এবং ঋণ বিতরণের পর যথাসময়ে সিআইবিতে রিপোর্টও করা হয়নি। ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়নি বা রিস্ক গ্রেডিং করা হয়নি। একইসঙ্গে খুবই অপর্যাপ্ত ও অপ্রতুল তথ্যের মাধ্যমে মেমো প্রস্তুতপূর্বক পর্ষদে তা উপস্থাপন করে ঋণগুলো অনুমোদন করা হয়েছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের মালিক বা পরিচালকের নাম-পরিচয় গোপন করা হয়েছে।

বিশেষ তদন্ত দল বিআইএফসিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের তদারকির যথেষ্ট ত্রুটি খুঁজে পেয়েছে। এতে দেখা যায়, প্রতিবছর দায়সারাভাবে সরেজমিন রুটিন পরিদর্শন ছাড়া ২০১৫ সালের আগে অন্য কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়নি। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণের নামে অর্থ লুটপাটের বিষয়গুলো পরীক্ষা করে দেখেনি এবং এসব বন্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তদন্ত দল এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের বক্তব্য গ্রহণ করেন। এতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়া ও আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার মতো কিছু না করার কথা বলে সংঘটিত আর্থিক অনিয়ম ও অবৈধ কর্মকাণ্ড গভীরভাবে খতিয়ে না দেখার মনোভাব ও আবহ গড়ে তোলা হয়েছিল।

একইসঙ্গে পূর্ববর্তী বছরের পরিদর্শনে উদঘাটিত অনিয়মসমূহের পরিপালন পরবর্তীতে যথাযথ ও ধারাবাহিকভাবে ফলোআপ করা হয়নি। বিতরণকৃত ঋণের কতটুকু সদ্ব্যবহার করেছে তা খতিয়ে দেখা হয়নি। এটি দেখা হলে শুরুতেই অনিয়ম ও অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করা যেত। এছাড়া ঋণ বিতরণের অর্থের জোগান তথা তহবিল সংগ্রহের বিষয়টি পরিদর্শনে মোটেও দেখা হয়নি।

তদন্তে আরও বেরিয়ে আসে, বিআইএফসিতে ঋণের নামে বিতরণকৃত অর্থের বেশিরভাগ প্রায় ৫৫২ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিনা জামানতে বিভিন্ন মেয়াদে সংগ্রহ করা হয়েছে। যা বছরের পর বছর ধরে ব্যাংকসমূহে পরিশোধ করা হয়নি। এ বিষয়টি শুরু থেকে পরিদর্শনে দেখা হলে বিআইএফসির কাছে ব্যাংকসমূহের বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেরত না পাওয়ার অবস্থা সৃষ্টি হতো না। এর জন্য অন-সাইট সুপারভিশনের কর্মকর্তারা প্রত্যক্ষ দায়ী। বিশেষ তদন্তে বিআইএফসিকাণ্ডে বহির্নিরীক্ষক অডিট ফার্মসমূহের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

এতে দেখা যায়, বিআইএফসির অডিট সম্পাদনকারী বহির্নিরীক্ষক অডিট ফার্ম হিসেবে বিভিন্ন মেয়াদে এ. ওয়াহাব অ্যান্ড কোঃ, জে আর চৌধুরী অ্যান্ড কোঃ  ও মালেক সিদ্দিকি ওয়ালি দায়িত্ব পালন করে। এসব বহির্নিরীক্ষক অডিট ফার্মসমূহ বিরূপমানে শ্রেণীকরণযোগ্য ঋণকে অশ্রেণীকৃত দেখানোসহ অসত্য তথ্য দিয়ে মনগড়া প্রতিবেদন দিয়েছে। ওইসব রিপোর্টের ভিত্তিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ ছাড়াই নথিভুক্ত করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অবহেলায় বড় অপরাধ করেও পার পেয়ে গেছে এসব অডিট ফার্ম।

বিশেষ তদন্ত দল অফ সাইট সুপারভিশন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মতামত গ্রহণ করেন। এ ছাড়া তৎকালীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের দায়িত্বে থাকা ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু কুমার সুর চৌধুরী (এস কে সুর), নির্বাহী পরিচালক মো. মাহফুজুর রহমান ও বিভিন্ন মেয়াদে উক্ত বিভাগের ডিজিএমগণ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক যথাক্রমে ইলিয়াস সিকদার, মো. সোহরাওয়ার্দী, মো. শাহ আলমের বক্তব্য গ্রহণ করেন। এতে বেশ কিছু তথ্য বেরিয়ে আসে।

দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট দুটি বিভাগের কর্মকর্তারা তাদের দায়িত্ব পালনে মোটেও আন্তরিক ও সচেষ্ট ছিলেন না। তাদের এই ব্যর্থতা বিশেষ তদন্ত দলের কাছে অজ্ঞতাপ্রসূত সরল বিশ্বাসজনিত ভুল বলে মনে হয়নি বরং দায়িত্ব পালনে যথাযথ আন্তরিকতা ও মনোযোগের অভাব সুস্পষ্ট। ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন কর্মকর্তারা পরস্পরের দোষ আড়াল করেছে। এ ছাড়া কারো বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তদন্ত দলের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার বিষয়টি একপর্যায়ে সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিম সভা পর্যন্ত গেলেও বিষয়টির প্রতি নজর দেয়া হয়নি। তাই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রত্যেকেই যার যার ক্ষমতা ও পদমর্যাদার ক্রমানুপাতে কর্মকালের ব্যাপ্তিভেদে দায়ী করা হয়েছে।

তদন্তে যেসব ব্যাংক থেকে আমানত সংগ্রহ করা হয়েছে সেসব ব্যাংক কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতাও পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, আদায়ে অনিশ্চয়তা জানা সত্ত্বেও দায়িত্বহীনভাবে ব্যাংকসমূহ বিআইএফসিতে সাধারণ মানুষের আমানতের টাকা প্রদান করেছে এবং বছরের পর বছর ধরে আদায়ের দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করেনি। এমনকি খেলাপি তথ্য সময়মতো সিআইবিতে রিপোর্টও করেনি।

বিশেষ তদন্ত দল সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো থেকে ব্যাংক আইন পরিপন্থি বেশ কিছু সার্কুলার জারি করার প্রমাণ পেয়েছে। যা মূলত দুর্নীতিবাজদের সুবিধা দিতে জারি করা হয়। যা আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন ১৯৯৩ এর ১৮নং ধারার পরিপন্থি এবং এখতিয়ার বহির্ভূত। এসব সার্কুলারের সুযোগ নিয়ে বিআইএফসিসহ অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ সুদের লোভ দেখিয়ে জনসাধারণ এবং ব্যাংক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসমূহ থেকে অতি সহজে বিপুল আমানত সংগ্রহ করেছে। একই সাথে এসব অর্থ ঋণ বিতরণের নামে আত্মসাৎ করার অবাধ সুযোগ পেয়েছে। অথচ ১৮ ধারার ক্ষমতাবলে  ব্যাংক থেকে বিনা জামানতে অবাধে সাধারণ মানুষের আমানতের অর্থ সংগ্রহের পথ একেবারেই বন্ধ করা যেত। ফলে বিআইএফসিসহ অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও আর্থিক অনিয়ম ও অবৈধ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণসীমায় থাকত। রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ (আরজেএসসি) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ব্যর্থতাও খুঁজে পেয়েছে বিশেষ তদন্ত দল।

এতে দেখা যায়, বিআইএফসিতে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বছরের পর বছর ধরে পর্ষদ গঠনের ক্ষেত্রে অনিয়ম সংঘটিত হয়ে এসেছে। বছরের পর বছর ধরে প্রকৃত সত্য গোপন করে মিথ্যা তথ্য দিয়ে আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করে কোম্পানির প্রকৃত অবস্থা আড়াল করে কাল্পনিক লাভ দেখিয়ে ডিভিডেন্ড প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু আরজেএসসি এবং বিএসইসি কখনই কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বিশেষ তদন্তের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিআইএফসির মোট দায় ছিল প্রায় এক হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা।

এর বিপরীতে মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ৯২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৮১৭ কোটি টাকা ঋণ বা লিজ বাবদ বিনিয়োগকৃত। যার ৭৮ দশমিক ২৮ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৬৪০ কোটি টাকা মেজর মান্নানের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, জনসাধারণ, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান হতে কলমানি, ট্রেজারি লাইন থেকে গৃহীত অর্থের ৫১৭ কোটি টাকা নামে-বেনামে ঋণের আকারে মেজর (অব.) মান্নানের কাছে গেছে। অন্যদিকে ৮৪৭ কোটি টাকা বিআইএফসি কর্তৃক গ্রহণ করা হলেও বছরের পর বছর ধরে অপরিশোধিত অবস্থায় আটকা পড়ে রয়েছে।

বিশেষ তদন্ত দল কর্তৃক বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৫০ কর্মকর্তাকে কর্মকালের ব্যাপ্তি ও পদবী অনুযায়ী প্রতিবেদনে দায়ী করা হয়েছে। কিন্তু বিএসইসি, আরজেএসসির কর্মকর্তাদের নাম প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি তুলছে। তারা বলছেন, যেহেতু পিকে হালদারের ঘটনা মানি লন্ডারিং সংশ্লিষ্ট, আর  বিএফআইইউ নিয়মিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তদারকি করে, তাই প্রতিবেদনে বিএফআইইউর ব্যর্থতার বিষয়টি থাকা উচিত ছিল।

এছাড়া দায়ীদের চিহ্নিত করার জন্য কমিটি গঠন করা হলেও তারা বছরের বেশি সময় ধরে নিয়মিত বেতন-ভাতা নিয়ে কোটি কোটি টাকা সরকারি অর্থের অপচয় করে ঢালাও প্রতিবেদন দাখিল করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এখানে কারো স্বার্থ আছে কি-না তাও খতিয়ে দেখার দাবি তোলা হচ্ছে। তাদের মতে, পুরো তদারকি ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারত।

অন্যদিকে, বিআইএফসির সব ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরও বিপুল বেতন ভাতায় মাহমুদ মল্লিককে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইডকলে নিয়োগ দেয়ার কারণও তদন্তের দাবি রাখে। একইসাথে পিকে হালদারকাণ্ডে মাহমুদ মল্লিক জড়িত থাকায় তার বিরুদ্ধে দুদকের অসংখ্য মামলা থাকার পরও তাকে দেশত্যাগের অনুমতি কারা দিয়েছে তাও তদন্ত প্রয়োজন।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম আমার সংবাদকে বলেন, ‘অপরাধীদের ছাড় দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন জারির মতো ঘটনা অপ্রত্যাশিত এবং দুঃখজনক। দেরিতে হলেও প্রতিবেদনটি যেহেতু বেরিয়েছে, এখন উচিত হবে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেয়া।

একই সাথে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে সে বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।’ টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আমার সংবাদকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিশেষ তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য কোনো অবাক করার বিষয় নয় এবং এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়। এ ধরনের জালিয়াতি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের একাংশের যোগসাজশ ছাড়া যে প্রায় অসম্ভব, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিলম্বে হলেও যেহেতু চিহ্নিত হয়েছে, যারা জড়িত তাদের কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তথাকথিত বিভাগীয় পদক্ষেপের নামে ছাড় দেয়া হলে তা হবে জালিয়াতির মাধ্যমে আর্থিক কেলেঙ্কারির সুরক্ষা ও বিচারহীনতার নামান্তর।’

বিষয়টি সম্পর্কে মন্তব্যের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ফজলে কবিরের মুঠোফোনে বহুবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এরপর হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিয়েও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র জি এম আবুল কালাম আজাদ আমার সংবাদকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক তার গাইডলাইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে। ভবিষ্যতেও একইভাবে ব্যবস্থা নেবে।’

Link copied!