Amar Sangbad
ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৪,

দৃষ্টি এখন আসন ভাগে

আবদুর রহিম

ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৩, ০৮:১০ এএম


দৃষ্টি এখন আসন ভাগে

চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এখন ইসিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে। সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটি সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে নতুন আর কোনো সংলাপ করবে না। ভোটে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক দলগুলোকে নিয়েই নির্বাচনের আয়োজন করবে। ভোটে বিএনপি কিংবা অন্যরা না আসতে চাইলেও কারো জন্য অপেক্ষা করবে না ইসি। কমিশনের নির্ভরযোগ্য সূত্র এমন তথ্য নিশ্চিত করেছে। সুষ্ঠু ভোটে বিদেশিদের কাছ থেকেও সহযোগিতা পাওয়ার ইঙ্গিত পেয়েছে কমিশন। ভোটের প্রস্তুতির এমন খবর এখন রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক উত্তেজনায় সব দলেই এখন ভেতরে ভেতরে ভোটের আবহ চলছে। পর্দার আড়ালে চলছে সিরিজ বৈঠক। চলতি সপ্তাহে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সংবিধানের ভেতর থেকে আলোচনার পথ খুঁজে বের করতে বিএনপিকে আহ্বান জানান। এরপরই আলোচনায় আসে সংলাপ। 

এর আগে ইসির রাজনৈতিক সংলাপে বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি। আওয়ামী লীগ যদি এবার কোনো সংলাপের আয়োজনও করে, তাতে বিএনপিসহ সরকারি জোটের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর বড় একটি অংশ সায় দেবে না। শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে তারা অনড়। তবে বয়োজ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদরাও এবার সংলাপে সমাধানের কোনো ইঙ্গিত পাচ্ছেন না। তারা বলছেন, অন্তরালে যদি নির্বাচনি আসন আনুপাতিক হারে ভাগাভাগি না হয়, তাহলে এবার বড় ধরনের অস্বাভাবিক কিছু অপেক্ষা করছে। এ সরকারের অধীনে বিএনপি সংলাপে বসবে না— এটি দলের মধ্যে এখন চূড়ান্ত বিষয়। 

তবে ভেতরে ভেতরে যদি আসন ভাগের বিষয় সমাধান হয়, তাহলে বিএনপি শেষবেলায় নির্বাচনে যাবে— এমনটি মনে করছে বিএনপির ভেতরের একটি অংশ। অতিসম্প্রতি কূটনৈতিক তৎপরতা, জাতীয় নির্বাচন ও খালেদা জিয়াকে নিয়ে হওয়া আলোচনাসহ সংলাপের বিষয়টি সামনে এসেছে। এতে এখন অনেকটাই স্পষ্ট যে, যথাসময়ে নির্বাচন কমিশন ভোটের আয়োজন সম্পন্ন করবে— এমন ধারণা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। আওয়ামী লীগ ভোটের মাঠে রাজনৈতিক বার্তার সবকিছুই দিয়ে যাচ্ছে। বসে নেই সরকারবিরোধীরাও। গোপনে ও প্রকাশ্যে চলছে সব ধরনের তৎপরতা। সম্প্রতি আইনমন্ত্রী বলেছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারবেন না; কিন্তু রাজনীতি করতে পারবেন। আবার আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতা বলছেন, খালেদা জিয়া মুচলেকা দিয়েছেন, তিনি রাজনীতিও করতে পারবেন না। 

তবে বিএনপির ভেতরে এটি প্রায় চূড়ান্ত খালেদা জিয়া রাজনীতি থেকে বাইরে থাকবেন। তার পরামর্শে তারেক রহমান দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিএনপির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়ার ব্যাপারে সরকার হয়তো আরও নমনীয়তা দেখাবে। উন্নত চিকিৎসার ব্যাপারে সরকার নমনীয় হতে পারে, চিকিৎসার জন্য মুক্তিও দিতে পারে। আর এগুলো সবই করবে নির্বাচন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে। যাতে নির্বাচনে আসার ক্ষেত্রে বিএনপি আগ্রহী হয়। 

তবে সংলাপের বিষয়ে আওয়ামী লীগ চেষ্টা চালালেও এবার বিরোধীরা সায় দেবে না। সর্বশেষ ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে সংলাপে বসেছিল বিএনপিসহ অন্যান্য সরকারবিরোধী দল। কিন্তু এতে তাদের কোনো লাভ হয়নি। এর আগে ১৯৯৪ সালে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বিরোধে মধ্যস্থতা করতে কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত হিসেবে ঢাকায় আসেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গভর্নর জেনারেল স্যার নিনিয়ান স্টেফান। তখন সেই উদ্যোগও সফল হয়নি। ২০০৬ সালের অক্টোবরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি কেএম হাসানকে আওয়ামী লীগ মেনে না নেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তৎকালীন বিএনপি মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া এবং আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল সংসদ ভবনে সংলাপে বসেন। 

সে সংলাপেও সফলতা আসেনি। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের শুরুর দিকে বাংলাদেশ সফরে আসেন জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। সেবার শেখ হাসিনাকে সরকারপ্রধান রেখেই নির্বাচনের একটি ফর্মুলা বের করার চেষ্টা করেন জাতিসংঘের এই প্রতিনিধি। কিন্তু বিএনপি তাতে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। নির্বাচন বর্জনই করে বিএনপি। অর্থাৎ গত প্রায় দুই দশকে দেশে অনুষ্ঠিত সব সংলাপই নস্ফিল হয়েছে। এবার দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে সংলাপ নিয়ে দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ এখন বিরক্ত। 

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না আমার সংবাদকে বলেন, আওয়ামী লীগ পুরোনো কৌশলে আবারও সংলাপের কথা বলছে। আসলে এটা তাদের দুই নম্বরি কাজ। অনির্বাচিত সরকার সব সময় কোনো না কোনো অপকৌশল বের করবে। নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ আবার অতীতের মতো কৌশলের পথ বেছে নিয়েছে। আমাদের দাবি একটাই— কোনো সংলাপ নয়, আগে সরকারকে চলে যেতে হবে। আমরা আন্দোলন করছি, দেখি কী করা যায়।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু আমার সংবাদকে বলেন, আওয়ামী লীগ কেন সংলাপের বিষয় সামনে নিয়ে আসছে, আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না; সংলাপ নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না। আমি কিছুই বলব না। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আমার সংবাদকে বলেন, আমাদের কথা স্পষ্ট—  নিরপেক্ষ সরকার ব্যতীত কোনো নির্বাচন হবে না। এর বাইরে বিএনপিতে কিছু নেই। এর বাইরে বাংলাদেশে নির্বাচন হবে না, এটা সবাই জানে। এটাই আমাদের দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। কারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার অবশ্যই সংবিধানের অংশ। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, আমরা বলতে চাই, নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই হতে হবে। কারণ, এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধানেই ছিল। 

এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার জামায়াত ও আওয়ামী লীগের দাবির কারণেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ আমার সংবাদকে বলেন, রাজনীতিতে সংলাপ একটি চলমান বিষয়। অতীতেও আমরা বিএনপির সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের নির্বাচনকালীন সরকারে অংশ নেয়ার জন্য বলেছেন। কিন্তু বিএনপি সাড়া দেয়নি। এবারও আমরা চাই একটি অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন, যেখানে সব দল অংশ নেবে। সেই প্রস্তাব বিএনপিসহ সব দলের ওপরই থাকবে। 

সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম আমার সংবাদকে বলেন, এ মুহূর্তে দেশে সংলাপে সমাধান খোঁজা কিছুটা কঠিন। তবে সমাধানের জন্য পর্দার অন্তরালে জাতীয় সংসদের আসন অনুপাতে ভাগাভাগির (৬০:৪০) চেষ্টা হতে পারে। যদি তা না হয়, তাহলে বড় ধরনের অস্বাভাবিক কিছুর আশঙ্কা থেকে যায়। 

বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী আমার সংবাদকে বলেন, সংসদ বিলুপ্তি ছাড়া নির্বাচন হয় না। সংলাপের প্রধান শর্তই হবে সংসদের বিলুপ্তি। শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে অন্যের হাতে ক্ষমতা দেবেন। এরপর যদি সংলাপ হয়, তাহলে সেখানে ফলপ্রসূ কিছু হতে পারে।

Link copied!