Amar Sangbad
ঢাকা শনিবার, ০২ মার্চ, ২০২৪,

মাঠ টার্গেটে নির্ভয়ে বিএনপি

আবদুর রহিম

মে ২২, ২০২৩, ১১:৩৯ পিএম


মাঠ টার্গেটে নির্ভয়ে বিএনপি

মধ্যম সারির নেতাদের দিয়েই আন্দোলন ভাবনা * জুলাইয়ে বিএনপির চূড়ান্ত আন্দোলনের পরিকল্পনা * শীর্ষ নেতারা আটক হলেও বিচলিত না হওয়ার বার্তা * এবারও ২০১৪-এর মতো ব্যর্থ হলে অস্তিত্ব হুমকিতে পড়বে * ষড়যন্ত্র করে ভোটে নিতে চেষ্টা করলেও সফল হবে না * আন্দোলনে অভিজ্ঞ দুই ডজন নেতাকে লন্ডনে ডাক

মানুষ সরকারের গ্রেপ্তার আতঙ্ককে আর ভয় পাবে না
—খন্দকার মোশাররফ হোসেন

শিগগিরই সরকারকে মসনদ থেকে টেনে নামানো হবে
—রুহুল কবির রিজভী

নঈম উল্লাহ চৌধুরী বরাত। ফেনী জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক। বর্তমানে ৩২টি মামলা চলমান। জেল খেটেছেন একাধিকবার। বাড়িতে হামলা হয়েছে তিনবার। এখনো কোনো কেন্দ্রীয় কর্মসূচি ঘোষণা হলে বাড়িতে ঘুমাতে পারেন না। পুলিশ বাড়িতে গিয়ে হানা দেন। এ পরিস্থিতিতেও দলের সব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছেন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আন্দোলন সফলে মাঠপর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের আবারও গ্রেপ্তার শুরু হলেও তিনি আতঙ্কিত নন। বলছেন, দলের অস্তিত্ব রক্ষায় জীবন দিয়ে হলেও আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকবেন। আন্দোলন সফল করবেন। এবার ভয় মানেই মৃত্যু, সাহস নিয়ে টিকে থাকলেই বিজয়। দলের হাইকমান্ড থেকে এমনই বার্তা দিয়েছেন। 

দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, প্রাথমিকভাবে জুলাইকে সামনে রেখে বিএনপি চূড়ান্ত আন্দোলনের পরিকল্পনা করেছে। তবে চলমান কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন জমে গেলে যেকোনো সময় নেতাকর্মীদের মাঠে নামানো হবে। এর মধ্যে দলের কিছু শীর্ষ নেতারা আটক হলেও বিচলিত না হতে বার্তা দেয়া হয়েছে। গতকাল মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনু আটক হওয়ার পর তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। এ থেকে ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে এবার বিএনপি কোনো কিছুতে নীরবতা বজায় রেখে চলবে না। শুধু কেন্দ্রীয় নেতাদের দিয়েই আন্দোলন নির্ভর করা হচ্ছে না, আন্দোলনের জন্য এবার ভিন্ন ছক করা হচ্ছে। ভরসা রাখা হয়েছে তৃণমূলের ওপর। দলটির নেতাকর্মীরা বলছেন, বিএনপি যখন আন্দোলনে নানা কর্মসূচি দিয়ে সরব হয়ে উঠছে তখন সরকার ফের পুরোনো কৌশলে কঠোর হয়ে উঠছে। নেতাকর্মীদের নামে মামলা দিচ্ছেন, গ্রেপ্তার করছেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছেন। বেশ পুরোনো মামলা নিয়েও অভিযান চালাচ্ছেন। মূলত, আন্দোলন দমাতে সরকার ভয় দেখাচ্ছে। তবে তারা এবার ভয় পাবে না। প্রথম সারির সব নেতাকে আটক করা হলেও মধ্যেম সারির নেতাদের দিয়েই আন্দোলন সফল করা হবে। লন্ডন থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এমনই নির্দেশনা দিয়েছেন। দল থেকে ম্যাসেজ দেয়া হয়েছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী আন্দোলনের মতো যদি এবারও বিএনপি ব্যর্থ হয় তাহলে অস্তিত্ব হুমকিতে পড়বে দল। পুরোনো সব মামলায় নেতাকর্মীদের আটক করা হবে, সাজা দেয়া হবে। নিজদের অস্তিত্ব ও দেশের মানুষকে মুক্তি দিতে যেকোনো পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে হবে। 

দপ্তর সূত্রে জানা গেছে , ২০০৯ থেকে ২০২২ সালের শেষ পর্যন্ত  নেতাকর্মীদের নামে যেসব মামলা হয়েছে, তার সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। এসব মামলায় আসামি ৩৬ লাখ। আর কারাগারে আটক ২০ হাজার। আর গেলো অক্টোবরে বিএনপির ধারাবাহিক আন্দোলন কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর নতুন করে মামলা হয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার। সমপ্রতি তৃণমূলে জনসভাকে কেন্দ্র করে গত তিন দিনে হাজার হাজার নেতাকর্মীর নামে মামলা ও বহু গ্রেপ্তার করা হয়েছে। খুলনায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনায় বিএনপির এক হাজার ৩০০ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। পটুয়াখালীতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় দুটি পৃথক মামলা করা হয়েছে। মামলা দুটিতে ৪৫ জন আসামির নাম উল্লেখ করে ৪৯৫ বিএনপি নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘হত্যার হুমকি’ দেয়ার অভিযোগে রাজশাহী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাইদ চাঁদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে। যশোরে বিএনপির নেতাকর্মীদের ‘গণগ্রেপ্তারে চার দিনে গ্রেপ্তার ১২০ জন। রাজবাড়ীতে বিএনপির ১৬১ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার ১৭ জন। এদিকে গত রোববার দিবাগত রাত পৌনে ১২টার দিকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব রফিকুল আলম মজনুকে শাহজাহানপুরের বাসার নিচ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ নিয়ে সকালে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বিক্ষোভ মিছিলও ঘোষণা করেছেন। জেলা উপজেলায় জনসমাবেশ ও মহানগরে পদযাত্রা কর্মসূচি চলমান অবস্থায় মজনুর মুক্তির দাবিতে আবারও নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। 

দলটির সূত্র মতে, বিএনপি এবার নির্ভয়ে সামনের সারিতে থাকবে। বিএনপিকে নানা ষড়যন্ত্র করে ভোটে নিতে চেষ্টা করলেও সফল হবে না। দলের শীর্ষ কিছু নেতা সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে চলে শেষ বেলায় ভেস্তে দেন। তাদের চিহ্নিত করা হলেও ভোটের আগে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে না। বিএনপি চেয়ারপারসন সমপ্রতি আন্দোলনের যে ফর্মুলা দিয়েছেন সেই আলোকে এগিয়ে যাবে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন থেকে তৃণমূলের অভিযোগ ছিল ঢাকা ও মহানগরগুলোতে আন্দোলন হয়নি। সেই অভিযোগের কারণ জেনে সমাধানও দিয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এবার বিএনপি শুধু হাইকমান্ডের ওপর ভরসা করে চলবে না। এ জন্য তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে দলের চেয়ারম্যান নিজেই কথা বলছেন। গতানুগতিক কর্মসূচি পালন করে চূড়ান্তভাবে মাঠে নামা হবে। যারা রাজপথের আন্দোলনে অভিজ্ঞ সমপ্রতি দুই ডজন নেতা লন্ডনে গিয়ে সাক্ষাৎ করে এসেছেন। যাদের সবাইকে দেয়া হয়েছে আন্দোলনের বার্তা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমান, বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন স্বপন, কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও মিডিয়া সেলের সদস্য সচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, মানবাধিকার-বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান, প্রশিক্ষণ-বিষয়ক সহসম্পাদক ও মিডিয়া সেলের সদস্য অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সভাপতি এম এ কাইয়ুম, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির বর্তমান সদস্য সচিব আমিনুল হক, ঢাকা দক্ষিণের বিএনপির মেয়র প্রার্থী ও মহানগরীর সদস্য প্রকৌশলী ইশরাক হোসেনসহ অনেকে। 

এদিকে বিএনপির কঠোর আন্দোলনের বার্তা শুধু সরকার ও রাজনৈতিক মাঠে নয়, কূটনৈতিক দপ্তরে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এ জন্য রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে থাকা মার্কিন নাগরিকদের সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরার পরামর্শ দিয়েছে ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস। ‘ডেমোনেস্ট্রেশন অ্যালার্ট’ শিরোনামে প্রচারিত ওই  সকর্তবার্তায় বলা হয়— বাংলাদেশের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন ২০২৪ সালের জানুয়ারির আগে বা তার মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলের সমাবেশ এবং অন্যান্য নির্বাচন-সম্পর্কিত কার্যক্রম এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। সাধারণ নির্বাচনের সময়ক্ষণ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সমাবেশ এবং বিক্ষোভের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তে পারে এবং এগুলোর গতি তীব্রতর হতে পারে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশে থাকা মার্কিন নাগরিকদের আগাম সতর্কতা অনুশীলন করাতে হবে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন আমার সংবাদকে বলেছেন, ‘ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বর্তমান সরকার আবার গায়েবি মামলা দেয়া শুরু করেছে। বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করছে। আবার আতঙ্ক দেখিয়ে লাভ নেই। এ দেশের মানুষ সরকারের এসব আতঙ্ককে আর ভয় পাবে না।’

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আমার সংবাদকে বলেন, ‘আবারও একতরফা নির্বাচন করার লক্ষ্যে দেশজুড়ে মিথ্যা ও গায়েবি মামলার হিড়িক পড়েছে। ১৫ বছর ধরে শেখ হাসিনার নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হচ্ছে গণতন্ত্রকামী হাজার হাজার মানুষ। বিএনপির কেন্দ্রঘোষিত চলমান কর্মসূচি বানচাল করতে সরকার মামলা, মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার ও নির্বিচারে গুলি চালিয়ে অসংখ্য মানুষকে হত্যা, অন্ধ ও পঙ্গু করে যাচ্ছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনুকে নিজ বাসভবন থেকে তুলে নিয়ে গেছে গোয়েন্দা পুলিশ। কিন্তু পুলিশ মজনুকে আটকের কথা এখন পর্যন্ত স্বীকার কিংবা তার কোনো হদিস দিচ্ছে না।’ আমরা হুঁশিয়ার করে বলছি, এবার আর জনগণ এই সরকারের নিপীড়ন সহ্য করবে না। শিগগিরই সরকারকে মসনদ থেকে টেনে নামানো হবে।’ 

মজনুর মুক্তি দাবিতে রিজভীর বিক্ষোভ : ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনুকে আটকের প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিএনপি। গতকাল সোমবার দুপুরে একটি বিক্ষোভ মিছিল নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে শুরু হয়ে কাকরাইলের নাইটিঙ্গেল মোড় ঘুরে ফের নয়াপল্টনে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। মিছিলে নেতৃত্ব দেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। এ সময় মিছিলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আবদুস সালাম, সহসভাপতি ইউনুস মৃধা, যুগ্ম সম্পাদক আকবর হোসেন নান্টু, যুবদলের ওমর ফারুক মুন্না, লিয়ন হক, ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ওমর ফারুক কাউসার, বর্তমান সহসভাপতি নাসির উদ্দিন নাসিরসহ কয়েকশ নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।

আলম গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে তিন দিনের কর্মসূচি : বিএনপি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনুকে গ্রেপ্তারের অভিযোগ তুলে এর প্রতিবাদে তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের উদ্যোগে এ সমাবেশ হবে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে— সোমবার ও মঙ্গলবার থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে বিক্ষোভ মিছিল। ২৭ মে দুপুর আড়াইটায় নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ। সোমবার মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালামের সভাপতিত্বে যুগ্ম আহ্বায়ক ও সিনিয়র নেতাদের বৈঠকে এই কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। কর্মসূচি যথাযথভাবে পালনের জন্য মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম সবাইকে অনুরোধ জানিয়েছেন। 
 

Link copied!