Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৪,

ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন-২০২৩

বেআইনি ঋণ সুবিধা দিলে কারাদণ্ড

জাহাঙ্গীর আলম আনসারী

জাহাঙ্গীর আলম আনসারী

মার্চ ৩, ২০২৪, ০২:১০ পিএম


বেআইনি ঋণ সুবিধা দিলে কারাদণ্ড
  • কেন্দ্রীয়  ব্যাংকও জরিমানা করতে পারবে ১০ লাখ টাকা 

এই আইনের মাধ্যমে সুশাসন বাড়বে : মুখপাত্র

নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (নতুন নাম ফাইন্যান্স কোম্পানি) পরিচালক বা কোনো কর্মকর্তা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বেআইনিভাবে অথবা কোনো বেনামি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ বা আর্থিক সুবিধা দিলে তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড ভোগ করতে হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকও সংশ্লিষ্ট পরিচালক বা কর্মকর্তাকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করতে পারবে। ‘ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন-২০২৩’ এ এমন শাস্তি ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। পুরোনো আইনে এই অপরাধের জন্য শুধু অর্থদণ্ডের বিধান ছিল। 

নতুন আইনের বিষয়ে কথা বললে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক দৈনিক আমার সংবাদকে বলেন, ‘আমরা আশা করছি নতুন আইনের ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুশাসন আরও বাড়বে।’ আর খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনিয়ম, জালিয়াতি ও অব্যবস্থাপনা বন্ধে নতুন আইনে যে ধারা সংযোজন করা হয়েছে সেটি ভালো দিক। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আইনের বাস্তবায়ন। পুরোনো আইনেও শাস্তির বিধান ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যথাযথ তদারকি না থাকায় ও আইনের বাস্তবায়ন না হওয়ায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা এমন হয়েছে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অনিয়ম-জালিয়াতির সাথে জড়িতদেরকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারে তাহলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আবার ঘুরে দাঁড়াবে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রণীত ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন-১৯৯৩’ সংশোধন করেছে সরকার। সংশোধীত নতুন আইনের নাম দেয়া হয়েছে ‘ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন-২০২৩’। নতুন আইনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে অবৈধভাবে ঋণ সুবিধা দেয়ার শাস্তি অর্থ দণ্ডের সাথে কারাদণ্ড ও জরিমানা সংযোজন করা হয়েছে নতুন আইনে। এ ছাড়া ফাইন্যান্স কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ গঠনের নিয়ম-কানুন বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। 

কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বেআইনিভাবে ঋণ সুবিধা দেয়ার বাধা-নিষেধ সম্পর্কে নতুন আইন তথা ‘ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন-২০২৩’ এর ২৫ ধারায় বিস্তারিত বলা হয়েছে। ধারা ২৫ এর উপধারা-১ এ বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষকে প্রদত্ত বা প্রদেয় মোট ঋণ সুবিধার আসলের পরিমাণ ওই ফাইন্যান্স কোম্পানি কর্তৃক পরিশোধিত মূলধন ও রিজার্ভের, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক, সময় সময়, এতদুদ্দেশ্যে নির্ধারিত হারের অধিক হবে না : তবে শর্ত থাকে যে, নির্ধারিত হারের সীমা কোনো অবস্থাতেই ৩০ শতাংশের অধিক হবে না। 

এ ধারার উপধারা-২ এ বলা হয়েছে, কোনো ফাইন্যান্স কোম্পানি এর কোম্পানির শেয়ার জামানত রেখে কোনো ব্যক্তিকে ঋণ বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা দেবে না। 

উপধারা-৩ এ বলা হয়েছে, কোনো ফাইন্যান্স কোম্পানি বেনামি বা অস্তিত্বহীন বা নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে কোনো প্রকার ঋণ বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা দেবে না। 

উপধারা-৪ এ বলা হয়েছে, কোনো ফাইন্যান্স কোম্পানি কোনো ব্যক্তিকে ১০ লাখ টাকা অথবা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাণের অধিক জামানতবিহীন ঋণ দেবে না। 

উপধারা-৫ এ বলা হয়েছে, ফাইন্যান্স কোম্পানির কোনো পরিচালক বা পরিচালকের পরিবারের কোনো সদস্য, এরূপ কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা প্রাইভেট কোম্পানি যাতে ওই কোম্পানি বা এর কোনো পরিচালক বা পরিচালকের পরিবারের সদস্য উল্লেখযোগ্য শেয়ারধারক, পরিচালক, মালিক বা অংশীদার রয়েছেন বা যা তার কোনো পরিচালক বা পরিচালকের পরিবারের সদস্য কর্তৃক কোনোভাবে নিয়ন্ত্রিত বা প্রভাবিত হয় এবং এরূপ কোনো পাবলিক কোম্পানি যা ওই ফাইন্যান্স কোম্পানি বা তার কোনো পরিচালক বা তার কোনো পরিচালকের পরিবারের সদস্য কর্তৃক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় অথবা যাতে দাদের এমন পরিমাণ শেয়ার থাকে যা দিয়ে তারা অন্যূন ২০ শতাংশ ভোটদান ক্ষমতার অধিকারী হন। 

আর পুরোনো আইন তথা ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন-১৯৯৩’ এর ১৪ ধারায় বেআইনিভাবে ঋণ সুবিধা দেয়ার বাধা-নিষেধ সম্পর্কে উল্লেখ ছিল। এই ধারা লঙ্ঘনের শাস্তি ছিল শুধু অর্থ দণ্ড। এ সম্পর্কে পুরোনো আইনের  ষ এরপর পৃষ্ঠা ২ কলাম ১

৩৫ ধারায় উল্লেখ ছিল— কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধারা ১৪ এর বিধান লঙ্ঘন করে ঋণ সুবিধা দিলে তা অনধিক ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবে। আর নতুন আইনে তথা ‘ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন-২০২৩’-এ ধারা লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড ও জরিমান উভয়ই রাখা হয়েছে। 

এ সম্পর্কে নতুন আইনের ৫৫ ধারার উপধারা-৭ এ বলা হয়েছে, কোনো ফাইন্যান্স কোমম্পানি কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানি বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষকে ধারা ২৫ এর বিধান লঙ্ঘন করিয়া ঋণ বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা দিলে ওই লঙ্ঘনের সাথে যুক্ত প্রত্যেক পরিচালক ও কর্মকর্তাকে বাংলাদেশ ব্যাংক ১০ লাখ টাকা করিয়া অথবা ওই ছাড়কৃত ঋণের বিদ্যমান স্থিতি, এই দুয়ের মধ্যে যা বেশি সেই পরিমাণ টাকা দায়ী ব্যক্তিদের সংখ্যার আনুপাতিক হারে জরিমানা আরোপ করতে পারবে। 

এ ছাড়া, নতুন আইনের ৫৮ ধারার উপধারা-৪ এ বলা হয়েছে, ধারা ২৫-এর বিধান লঙ্ঘন করে কোনো পরিচালক বা কর্মকর্তা ঋণ সুবিধা দিলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে এবং ওইরূপ অপরাধের জন্য ওই ব্যক্তি অনধিক পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

অপরদিকে, নতুন আইনের ১৪, ১৫ ও ১৬ ধারায় ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর পরিচালনা পর্ষদ গঠন, পরিচালকদের যোগ্যতা ও জবাবদিহির বিষয়ে বিধিনিষেধ উল্লেখ করা হয়েছে। এখন থেকে এসব কোম্পানির পর্ষদের পরিচালকরা তিন বছর করে তিন দফায় সর্বোচ্চ টানা ৯ বছর পর্ষদে থাকতে পারবেন। পর্ষদে ১৫ জনের বেশি পরিচালক থাকতে পারবেন না। ৩০ বছরের কম বয়সের কোনো ব্যক্তি পরিচালক হতে পারবেন না। পরিচালক হতে হলে ১০ বছরের ব্যবসায়িক, ব্যবস্থাপনা বা পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। 

আর স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা হবে কমপক্ষে দুজন। স্বতন্ত্র পরিচালক আমানতকারীদের পক্ষে অবস্থান নেবেন। তিনি কোনো মতামত উপস্থাপন করলে তা গুরুত্বের সঙ্গে পর্ষদ বিবেচনা করবে। পর্ষদ কোনো অনিয়ম করলে বিষয়টি পর্ষদ সভায় তুলে ধরবেন। বিধিবহির্ভূত কোনো কর্মকাণ্ড পর্ষদ করলে তিনি তা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাবেন। কোনো পরিবারের কাছে কোনো ফাইন্যান্স কোম্পানির ৫ শতাংশের বেশি শেয়ার থাকলে ওই পরিবার থেকে দুজন সদস্য একই সময়ে পর্ষদে থাকতে পারবেন। সর্বনিম্ন ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ার থাকলে ওই পরিবারের একজন সদস্য পর্ষদে থাকতে পারবেন। কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির পক্ষে পর্ষদে একজন পরিচালক থাকতে পারবেন। পরিচালকদের প্রতি দফায় মেয়াদ হবে তিন বছর। টানা তিন মেয়াদে একজন পরিচালক ৯ বছর পর্ষদে থাকতে পারবেন। এরপর তার পদ স্বাভাবিক নিয়মেই শূন্য হয়ে যাবে। 

এ ছাড়া, কোনো ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত বা বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিয়ম শনাক্ত হয়ে থাকলে তিনি পরিচালক হতে পারবেন না। কোনো ঋণখেলাপিও পরিচালক হতে পারবেন না। নতুন আইনে বলা হয়েছে, কোনো ফাইন্যান্স কোম্পানির পরিচালক আমানতকারীদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড করলে ওই পরিচালককে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অপসারণ করতে পারবে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজন মনে করলে ওই কোম্পানির পর্ষদ বাতিল করে দিতে পারবে। প্রয়োজনবোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক উপযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে নতুন পর্ষদ গঠন করতে পারবে।
 

Link copied!