community-bank-bangladesh
Amar Sangbad
ঢাকা শুক্রবার, ২১ জুন, ২০২৪,

কৃষি আধুনিকায়নে নীরব বিপ্লব

ইয়ামিনুল হাসান আলিফ

ইয়ামিনুল হাসান আলিফ

জুন ৫, ২০২৪, ১২:০৯ এএম


কৃষি আধুনিকায়নে নীরব বিপ্লব

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভর্তুকির মাধ্যমে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিগত সেবার ফলে কৃষিক্ষেত্রে যুগান্তকরী পরিবর্তন এসেছে
—কৃষিবিদ শহীদুর রহমান খান, সাবেক উপাচার্য, খুকৃবি

সব ধরনের প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনী কার্যক্রমে ৩০ ভাগ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর
—লুবনা রহমান, উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর

উপকূল ও হাওরকে প্রাধান্য দিয়ে প্রকল্প প্রস্তুত করা হচ্ছে, কৃষিকাজ ব্যাহত না হওয়ার জন্য প্রকল্প রোটেশনভাবে কনটিনিউয়াসলি চলছে
—সাদেকুর রহমান, উপপ্রধান (প্রকল্প প্রস্তুতকরণ), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল স্তম্ভে অবস্থান করা কৃষি খাতের ওপর জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ শতাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। কৃষি খাতে উন্নয়নধারা বজায় রাখতে ও সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কাজ করে যাচ্ছে। দেশকে ক্ষুধামুক্ত থেকে পুষ্টিসমৃদ্ধ নিরাপদ খাদ্যের বাংলাদেশের দিকে নিতে ও পুরোপুরি দারিদ্র্যমুক্ত করে অর্জিত উন্নয়ন টেকসই করা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশে প্রতিবছর ক্রমবর্ধমান হারে কৃষিজমি হ্রাস পেলেও গত তিন দশকে ধান, আলু, ফল, সবজি ও ভুট্টার উৎপাদন অনেকাংশে বেড়েছে। কৃষি খাতের এই আমূল পরিবর্তন ওআধুনিকীকরণে প্রয়োজনীয় টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রের মানোন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। কৃষি ও কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল কৃষকের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই কাজ করছে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি। 

তিন সহস্রাধিক বিসিএস কৃষি ক্যাডার অফিসার তথা কৃষিবিদ এবং ১৫ সহস্রাধিক ডিপ্লোমা কৃষিবিদ অফিসার (ডিপ্লোমা কৃষিবিদ) গবেষণা ও কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষি সম্প্রসারণ সেবা বিস্তৃত করা হচ্ছে। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে নিরন্তর কাজ করে যাওয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেশের প্রতিটি উপজেলায নিজস্ব অফিস রয়েছে। যার মাধ্যমে কৃষিকাজ সহজতর করার পাশাপাশি কৃষকের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে অধিদপ্তরটি। 

১৮৭০ সালে রাজস্ব বিভাগের অংশ হিসেবে কৃষি বিভাগের জন্ম হলেও পরবর্তীতে ১৯০৬ সালে স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় কৃষি বিভাগ। ১৯৮২ সালে ফসল প্রযুক্তি সম্প্রসারণে নিয়োজিত ছয়টি সংস্থা ডিএ (ইএন্ডএম), ডিএ (জেপি), উদ্ভিদ সংরক্ষণ পরিদপ্তর, হর্টিকালচার বোর্ড, তামাক উন্নয়ন বোর্ড এবং সার্ডিকে একত্রিভূত করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সৃষ্টি করা হয়। সংস্থাটি টেকসই, নিরাপদ ও লাভজনক কৃষিক্ষেত্র তৈরি করতে টেকসই যন্ত্রপাতি সরবরাহ, প্রশিক্ষণ প্রদান, আধুনিকীকরণের ব্যবস্থা করে শস্য বহুমুখীকরণ, পুষ্টিসমৃদ্ধ নিরাপদ ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি, বিপণন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং লাভজনক কৃষি মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কাজ করে যাচ্ছে। কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা ও সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য কাজ করছে এই সংস্থা। ফসল উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য কৃষকের মাঝে উন্নত ও প্রচলিত কৃষিপ্রযুক্তি প্রদান এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে কর্মী ও কৃষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করছে প্রতিষ্ঠানটি। শুধু প্রযুক্তিগত সেবাই নয়, সার-বীজসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ সরবরাহ ও কীটনাশক, রাসায়নিক সার ইত্যাদির মান নিয়ন্ত্রণেও কাজ করছে এই অধিদপ্তর। মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কম্পোস্ট, ভার্মি কম্পোস্ট, সবুজ সার উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখছে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া কৃষক পর্যায়ে মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ করছে এই অধিদপ্তর। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে কৃষিজমি হ্রাসের পরও কৃষিপণ্যের উৎপাদন যেমন বাড়ছে, তেমনি কৃষি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও প্রশংসা করছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের।

প্রখ্যাত কৃষিবিদ ও খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুকৃবি) সাবেক উপাচার্য শহীদুর রহমান খান বলেন, সরকার কৃষি খাতে ব্যাপক প্রণোদনা দিচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে কৃষকদের ভর্তুকির মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তিসেবা দিচ্ছে। ফলে কৃষকের কৃষিকাজ করতে কষ্ট কমছে এবং আমরা মানসম্মত কৃষিপণ্য পাচ্ছি। আধুনিকায়ন হওয়ার ফলে এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভর্তুকির মাধ্যমে যন্ত্রাংশ প্রদান, প্রযুক্তিগত সেবা প্রদানের বিষয়টি ব্যাপক সাড়া পেয়েছে। এছাড়া শিক্ষিত যুবসমাজও কৃষিকাজে আসছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এসব ইতিবাচক কর্মকাণ্ড আরও বেশি প্রচার করা হলে যুবসমাজ কৃষিকাজে আরও বেশি আগ্রহ দেখাবে বলে মত এই কৃষিবিদের। এছাড়া বিপণন ও মনিটরিং ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সোচ্চার হলে কৃষক আরও বেশি লাভবান হবেন বলে আমার সংবাদকে বলেন খুকৃবির সাবেক এই উপাচার্য।

কৃষির উন্নয়নে নারীকে সম্পৃক্তকরণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। সব ধরনের প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনী কার্যক্রমে শতকরা ৩০ ভাগ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। ভার্মিক ম্পোষ্ট, ট্রাইকো কম্পোস্ট ও কম্পোস্ট পিট, বসতবাড়িতে সবজি চাষ, ছাদবাগান, বীজ সংরক্ষণ, কৃষি উৎপাদন, খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা বিধান এবং আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে। ফলে কৃষিপণ্য উৎপাদন ও বিপণনের মাধ্যমে নারীরা আয়বর্ধক কার্যক্রমে উৎসাহিত হচ্ছেন। 

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (কৃষক প্রশিক্ষণ উইং) লুবনা রহমান আমার সংবাদের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, প্রজেক্টের মাধ্যমে কৃষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। বিভিন্ন উপজেলায় খামার যান্ত্রিকীকরণের প্রজেক্ট চলছে। বীজ তোলা, কাটিং, কম্পোজসহ বিভিন্ন কাজে মহিলাদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। বীজ প্রিজারভেশনে নারীদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। তাই মহিলারাই এখন আধুনিক কৃষিযন্ত্রপাতি চালাতে সক্ষম হচ্ছেন।
কৃষি অধিদপ্তর বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কৃষি উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় কৃষিপ্রযুক্তি ও ঘাতসহিষ্ণু জাত সম্প্রসারণ, কৃষিঋণ প্রাপ্তিতে কৃষককে সহায়তাদান, দুর্যোগ মোকাবিলা ও কৃষি পুনর্বাসন, কৃষিক্ষেত্রে সময়োপযোগী প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও প্রয়োগ, কৃষকের নিরলস প্রচেষ্টা ও আত্মনিয়োগ এবং সম্প্রসারণ ও গবেষণা সিস্টেমভুক্ত প্রতিষ্ঠানের একনিষ্ঠ কর্মতৎপরতায় ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধিসহ উৎপাদন এবং উৎপাদনশীলতায় এক আমূল পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কৃষকের জ্ঞান, দক্ষতা ও সক্ষমতাও বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিনিয়ত। পাশাপাশি কৃষিপরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসহ নানাবিধ প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুর্যোগজনিত দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে খাদ্য ও পানি নিরাপত্তা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত মজবুত করা হয়েছে। এর জন্য উপকূল ও হাওরাঞ্চলকে প্রকল্প প্রণয়নে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-প্রধান (প্রকল্প প্রস্তুতকরণ) সাদেকুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, আমরা কৃষিক্ষেত্রে বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনকে মাথায় রেখেই প্রকল্প প্রস্তুত করে যাচ্ছি। আমরা উপকূল ও হাওরকে প্রাধান্য দিয়ে প্রকল্প প্রস্তুত করে থাকি। সাধারণত উপকূলকে প্রথম প্রায়োরিটি, এরপর হাওর ও সমতলকে রেখে আমরা প্রকল্পগুলো প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাই। কৃষিকাজ যেন ব্যাহত না হয়, সেজন্য রোটেশনের মাধ্যমে প্রকল্পগুলো কন্টিনিউয়াসলি চালিয়ে যাচ্ছি।
 

Link copied!