Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

নদীতে প্রাণ গেলে বিচার মিলেনা

আবদুর রহিম

সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২২, ০৯:১৭ পিএম


নদীতে প্রাণ গেলে বিচার মিলেনা
  • এবার আওলিয়া ঘাটে গেলো ২৪ প্রাণ, এখনো নিখোঁজ ৩০ জন 
  • সব ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন,মামলা হয়,গ্রেফতারও হয় বিচার হয় না 
  • গত ৫ বছরে নদীতে চার হাজার দুর্ঘটনা,৩২শ মানুষের মৃত্যু

নদীর পাড়ে লাশের হিসাব! উঠানো হচ্ছে হাবিলদারের ডায়েরিতে। সংখ্যা গুণে জানোনো হচ্ছে স্বজন ও গণমাধ্যমকে। এ দৃশ্যে আজ বিকেলে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার মাড়েয়া ইউনিয়নের আওলিয়া ঘাটের করতোয়া নদীর পাড়ের। তখনো দিনের আলো। ১৭টি লাশ সারিবদ্ধভাবে মাটিতে। চারপাশে মানুষের আর্তনাদ। কোলে করে নিয়ে আসা হচ্ছে আরো শিশুর লাশ। কিছু নিস্তব্ধ দেহ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে হাসপাতালে। পুরো এলাকা জুড়ে শোকের ছায়া। সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রশাসন থেকে জানানো হয় নারী ও শিশুসহ ২৪ জনের  লাশ পাওয়া গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও প্রায় ৩০ জন। হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়তে। উপজেলা প্রসাশন, জেলা প্রসাশন,ফায়ার সার্ভিসের যৌথ তত্ত্বাবধানে উদ্ধার কার্যক্রম চলছে। তবে তার আগেই স্থানীয় এলাকাবাসী নদীতে ঝাপ দেন। উদ্ধার কাজ সিংহভাগ সেরে ফেলেন। রাত ৯ টার দিকে এ রিপোর্ট লিখা পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান চলছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নৌকাটিতে শতাধিক যাত্রী ছিলেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের পুণ্যলগ্ন শুভ মহালয়া উপলক্ষে বোদা, পাঁচপীর, মাড়েয়া, ব্যাঙহারি এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নৌকায় করে বদেশ্বরী মন্দিরে যাচ্ছিলেন। নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী ছিল। ফলে মাঝ নদীতে পৌঁছার পর যাত্রীর চাপে নৌকাটি একপাশে উল্টে যায়। দুর্ঘটনার পর কিছু মানুষ সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও বেশিরভাগ যাত্রী নিখোঁজ হয়ে যান।

বোদা থানার ওসি সুজয় কুমার রায় জানান, নৌকা ডুবির পর যাত্রীদের উদ্ধারে চলছে সর্বচ্ছ শক্তি দিয়ে। চেষ্টার কোনো ঘাটতি নেই।   

ঘটনাস্থলে উপস্থিত হোন পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম। তিনি আরও বলেন, হতাহতরা সবাই শুভ মহালয়া উপলক্ষে বদেশ্বরী মন্দিরে যাচ্ছিলেন। মন্দিরে যেতে হলে করতোয়া নদী পাড়ি দিয়ে যেতে হয়। মন্দিরে মহালয়া উপলক্ষে প্রতিবছরই অনেক বড় অনুষ্ঠান হয়। আশপাশের প্রায় সব জেলা থেকে প্রচুর পূর্ণার্থীরা আসেন। গতকাল রাতে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। ফলে নদীর পানি বেড়ে গেছে। আর এতেই প্রাণহানীর সংখ্যা বেড়েছে।ঘটনাস্থলে পুলিশের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরাও উদ্ধার কাজে অংশ নিচ্ছে বলে জানান ওসি।

বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রাজিউর রহমান রাজু জানান, উদ্ধার হওয়া লাশের মধ্যে বোদা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাত জন এবং ঘটনাস্থলে ১৭ জনের লাশ রয়েছে।

বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোলেমান আলী ২৪টি লাশ উদ্ধারের তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মরদেহ শনাক্তের প্রক্রিয়া চলছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে।

পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম শফিকুল ইসলাম বলেন, হতাহতরা হিন্দু সম্প্রদায়ের মহালয়া অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। হতাহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনক বাড়ছে। এখনো সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ২৪ জনের লাশ পাওয়া গেছে বলা জানাগেছে। এখনো  অনেকে নিখোঁজ রয়েছে বলে শুনতেছি।

পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক মো. জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ২৪ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করছি।   তাৎক্ষণিকভাবে মৃতদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৮ শিশু, ৪ পুরুষ ও ১২ নারী রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষরা বলছেন, বাংলাদেশে নদীর প্রাণে বিচার মিলেনা মেলে না। অতীতেও এমন অনেক দুর্ঘটনার নজির রয়েছে দেশের নৌ-পথগুলোতে। এসব ঘটনায় মামলা হয়, গ্রেফতারও করা হয় দায়ীদের। গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। কিন্তু অধিকাংশ নৌ দুর্ঘটনাই সীমাবদ্ধ থাকে তদন্ত ও প্রতিবেদন দাখিলের মধ্যে। এসব প্রতিবেদন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বললেই চলে। কখনো কখনো দায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা কিংবা সাময়িক বরখাস্তের শাস্তি দিয়েই দায় এড়ানো হয়। তদন্ত প্রতিবেদনগুলোতে ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা এড়াতে সুপারিশের বাস্তবায়ন হয় না।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ও গণমাধ্যমের তথ্যানুসারে জানা গেছে, দেশে ৫ বছরে ছোট বড় প্রায় চার হাজার হাজার নৌ-দুর্ঘটনায় ৩২শ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছর ৪ এপ্রিল লঞ্চডুবির ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে কমপক্ষে ১৫ জন প্রাণ হারান।

দেশের বিশেজ্ঞ মহল থেকে বারবারই বলা হয় ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন।  চালকদের অবহেলা ও অদক্ষতা,  যন্ত্রাংশে ত্রুটি,   বৈরি আবহাওয়া,  যানের ত্রুটিযুক্ত গঠন,  অনিরাপদ নৌ রুট,  যানের মেয়াদোত্তীর্ণ ফিটনেস, নৌযানের মধ্যকার সংঘর্ষ, লাইসেন্সবিহীন অপারেটর,  রাডার বা রেডিও সরঞ্জামের অপর্যাপ্ততা,  অত্যধিক স্রোত।  নজরদারি বা নিয়ন্ত্রণজনিত ঘাটতির কারণে নৌকা বা ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটে। গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর দিবাগত রাত তিনটার দিকে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে ঢাকা থেকে বরগুনাগামী এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। প্রায় ৪০০ যাত্রী নিয়ে এমভি অভিযান-১০ সদরঘাট থেকে ছেড়ে যায়। ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে পৌঁছলে রাত ৩টার দিকে এতে আগুন ধরে যায়। ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ৮০ জনেরও বেশি যাত্রী দগ্ধ হয়েছেন। দুর্ঘটনার সময় অনেক যাত্রী নদীতে ঝাঁপ দিয়ে বেঁচে গেলেও নিখোঁজ রয়ে গেছেন অনেক মানুষ।

গত বছর  ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলায় তিতাস নদের লইছকা বিলে বালুবাহী ট্রলারের সঙ্গে যাত্রীবাহী ট্রলারের মুখোমুখি সংঘর্ষে ২১ জনের প্রাণহানি ঘটে। এর ২০০৬ সালে মেঘনা সেতুর কাছে ‘এমএল শাহ পরাণ’লঞ্চ দুর্ঘটনায় ১৯ জন মারা যায়।এমভি রাজহংসী : ২০০০ সালের ২৯ ডিসেম্বর ঈদুল আজহার রাতে চাঁদপুরের মতলব উপজেলার ষাটনল এলাকায় মেঘনা নদীতে ‘এমভি জলকপোত’ ও ‘এমভি রাজহংসী’ নামের দুটি যাত্রীবাহী লঞ্চের সংঘর্ষ হয়। এতে প্রাণ হারায় রাজহংসীর ১৬২ যাত্রী। ২০০২ সালের ৩ মে চাঁদপুরের ষাটনল সংলগ্ন মেঘনায় ডুবে যায় সালাহউদ্দিন-২ নামের যাত্রীবাহী লঞ্চ। ওই দুর্ঘটনায় ভোলা ও পটুয়াখালী জেলার ৩৬৩ যাত্রী মারা যান। ২০০৩ সালের ৮ জুলাই ঢাকা থেকে লালমোহনগামী ‘এমভি নাসরিন-১’ চাঁদপুরের ডাকাতিয়া এলাকায় অতিরিক্ত যাত্রী ও মালবোঝাইয়ের কারণে পানির তোড়ে তলা ফেঁটে যায়। এতে প্রায় ২ হাজারের বেশি যাত্রীসহ এটি ডুবে যায়। এ দুর্ঘটনায় ১২৮ পরিবারের প্রধানসহ সরকারিভাবে ৬৪১ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু বেসরকারি হিসেবে লাশ উদ্ধার করা হয় প্রায় ৮০০।২০০৪ সালের ২২ মে আনন্দ বাজারে ‘এমভি লাইটিং সান’লঞ্চ দুর্ঘটনায় ৮১ জন এবং ও ‘এমভি দিগন্ত’ ডুবির ঘটনায় শতাধিক যাত্রীর মৃত্যু ঘটে। এ ছাড়া ভৈরবের মেঘনা নদীতে এমএল মজলিসপুর ডুবে ৯০ জনের মৃত্যু হয়।২০১১ সালের ২৮ মার্চ চাঁদপুরের বড় স্টেশন মোলহেড এলাকায় মেঘনা নদীতে দুটি লঞ্চের ধাক্কায় দুমড়ে-মুচড়ে যায় এমভি কোকো-৩ নামের একটি যাত্রীবাহী লঞ্চ। ২০১৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ থেকে মতলব যাওয়ার পথে মুন্সীগঞ্জের মেঘনা নদীতে মিথিলা ফারজানা নামের বালুবাহী বাল্ক্কহেডের ধাক্কায় এমভি সারস নামের একটি যাত্রীবাহী লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটে। এতে ১৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

২০১৪ সালের ১৫ মে মুন্সীগঞ্জের কাছে মেঘনা নদীতে যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি মিরাজ-৪ ডুবে যাওয়ার পর অন্তত ২২ জন যাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুশ’র বেশি যাত্রী নিয়ে লঞ্চটি ঢাকা থেকে শরীয়তপুরের সুরেশ্বরের দিকে যাচ্ছিল।২০১৪ সালের ০৪ আগস্ট পদ্মায় স্মরণকালের ভয়াবহ নৌ-দুর্ঘটনায় আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে যায় পিনাক-৬ নামের একটি লঞ্চ। উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে ২১ জনকে শিবচর পৌর কবরস্থানে অজ্ঞাতনামা হিসেবে দাফন করা হয়।২০১৬ সালের ৫ জুলাই বরিশালের কীর্তনখোলা নদীতে ঢাকাগামী সুরভী-৭ লঞ্চের সঙ্গে বরিশালগামী সরকারি নৌযান পিএস মাহসুদের সংঘর্ষে ছয়জন নিহত হন। আহত হন ১৫ জন। হতাহত সবাই পিএস মাহসুদের যাত্রী। ২০১৭ সালের ২২ এপ্রিল বরিশাল সদর উপজেলার কীর্তনখোলা নদীর বেলতলা খেয়াঘাট এলাকায় বালুবাহী একটি কার্গোর ধাক্কায় এমভি গ্রীন লাইন-২ লঞ্চের তলা ফেটে যায়। লঞ্চটি তাৎক্ষণিকভাবে তীরের ধারে নেওয়ায় দুই শতাধিক যাত্রী প্রাণে বেঁচে যায়।

২০১৯ সালের ২২ জুন মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌরুটে এমভি রিয়াদ নামের একটি লঞ্চের তলা ফেটে অর্ধেক পানিতে ডুবে যায়। লঞ্চের তলা ফেটে পানি উঠতে শুরু করলে অন্য ট্রলার গিয়ে লঞ্চযাত্রীদের উদ্ধার করে নিরাপদে নিয়ে যায়। ২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারি বরিশাল-ঢাকা নৌ-পথের মেঘনা নদীর চাঁদপুর সংলগ্ন মাঝ কাজীর চর এলাকার মাঝ নদীতে দুই লঞ্চের সংঘর্ষে দুই যাত্রী নিহত এবং আটজন আহত হয়। হতাহতদের মধ্যে নিহত দুজনসহ আহত তিনজন এমভি কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চের এবং বাকি আহত পাঁচজন এমভি ফারহান-৯ লঞ্চের যাত্রী ছিলেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এর পিএইচডি গবেষক অধ্যাপক বদরুল হুদা সোহেল বলেন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন কঠোরভাবে দমন করতে হবে। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের সাথে সাথে যাত্রীদের নিজেদেরকেও সচেতন হতে হবে। কারণ ঈদ বা পুজাপার্বণে ঘরমুখো মানুষের ঢল দেখে বোঝা যায় যে, যাত্রীদেরও দোষ কোনো অংশে কম নয়। নৌযান কর্তৃপক্ষের বাধা উপেক্ষা করেও অনেকে অতিরিক্ত যাত্রী হিসেবে ভ্রমণ করে দুর্ঘটনার পথকে ত্বরান্বিত করে থাকে। তাছাড়া দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় অধিকতর দক্ষ ও প্রশিক্ষিত চালকসহ ভালো মানের যান চলাচলের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।নৌ-দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। একে অপরকে না দুষে সম্মিলিত প্রচেষ্টাই দুর্ঘটনা থেকে উত্তরণের পথ। নৌপরিবহন সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে প্রশাসনিকভাবে আরো সক্রিয় হতে হবে। নৌচালক, মাস্টার, বন্দর তত্ত্বাবধায়ক ও যান মালিকদের কর্মকাণ্ডও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

ইএফ

Link copied!