নেত্রকোনা প্রতিনিধি
অক্টোবর ১৫, ২০২৫, ১১:৪১ এএম
নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জামান মঙ্গলবার বিকেলে কেন্দুয়া উপজেলা পরিষদ চত্বরে জালাল উদ্দিন খাঁর স্মরণে নির্মিত মনোরম ‘জালাল মঞ্চ’ উদ্বোধন করেছেন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইমদাদুল হক তালুকদার এর উদ্যোগে নির্মিত এ মঞ্চকে স্থানীয় সংস্কৃতিচর্চা ও লোকজ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় নতুন সংযোজন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক বলেন, এই মঞ্চে নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে সুস্থধারার সংস্কৃতির বিকাশ ঘটবে। নেত্রকোনা যদি দেহ হয়, তবে কেন্দুয়া হলো তার মগজ। অজস্র জ্ঞানী ও গুণীর জন্ম এ উপজেলায়, যারা যুগে যুগে জাতির জন্য অনন্য অবদান রেখেছেন। তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পেরে আমি আনন্দিত।
কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ড. ইমদাদুল হক তালুকদার বলেন, আমি কেন্দুয়ায় যোগদানের পর মরহুম জালাল উদ্দিন খাঁকে নিয়ে গবেষণা করেছি। তিনি সাধক হিসেবে কোনো অংশেই লালনের চেয়ে কম ছিলেন না, বরং কিছু ক্ষেত্রে তাঁকে ছাড়িয়েছেন। তাঁর স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে ২০২৪ সালে কেন্দুয়ার ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ‘জালাল মেলা’ আয়োজন করেছিলাম। আজ তাঁর নামে এই মঞ্চ নির্মাণের মধ্য দিয়ে সেই শ্রদ্ধা আরও গভীরভাবে প্রকাশ করা হলো।
মঞ্চ উদ্বোধনের পর অনুষ্ঠিত হয় এক মনোজ্ঞ বাউল সন্ধ্যা, যেখানে সংগীত পরিবেশন করেন দেশবরেণ্য বাউল শিল্পী সুনীল কর্মকার, কদ্দুস বয়াতি, বাউল সালাম সরকার ও বাউল মুকুল সরকার।
অনুষ্ঠানে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, তাঁদের পরিবারবর্গ, গণমাধ্যমকর্মী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
উপস্থিতদের মধ্যে ছিলেন কেন্দুয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি জয়নাল আবেদীন ভুইয়া, জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হেলেম, কেন্দুয়া প্রেসক্লাব সভাপতি সেকুল ইসলাম খান, মিডিয়া ক্লাব সভাপতি সমরেন্দ্র বিশ্বশর্মা, প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাই সেলিম, রিপোর্টার্স ক্লাব সাধারণ সম্পাদক লাইমুন হাসান ভূঁইয়া এবং সাংস্কৃতিক কর্মী তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী প্রমুখ।
মরহুম জালাল উদ্দিন খাঁ ছিলেন বাংলার এক সাধক ও লোকসংগীতের প্রাণপুরুষ বাংলাদেশ সরকার ২০২৪ সালে সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে। ১৮৯৪ সালের ২৫ এপ্রিল নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার আসদহাটি (সিংহের গাঁও) গ্রামে জন্ম নেন তিনি। তাঁর পিতার নাম সদরুদ্দীন খাঁ।
বিংশ শতাব্দীর বিশ থেকে ষাটের দশক পর্যন্ত তিনি আত্মতত্ত্ব, পরমতত্ত্ব, নিগূঢ়তত্ত্ব, লোকতত্ত্ব, দেশতত্ত্ব ও বিরহতত্ত্বের গানে বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেন।
তিনি প্রায় সহস্রাধিক গান রচনা করেন। জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয় ‘জালাল গীতিকা’ নামের চার খণ্ডে ৬৩০টি গান; মৃত্যুর পর পঞ্চম খণ্ডে সংযোজিত হয় আরও ৭২টি গান। ২০০৫ সালে প্রকাশিত ‘জালাল গীতিকা সমগ্র’-এ অন্তর্ভুক্ত হয় মোট ৭০২টি গান।
এছাড়া তিনি “বিশ্বরহস্য” নামে একটি প্রবন্ধগ্রন্থও রচনা করেন। ১৯৭২ সালের ৩১ জুলাই (১৬ শ্রাবণ ১৩৭৯) তিনি মৃত্যুবরণ করেন। স্ত্রী শামছুন্নাহার বেগম, দুই পুত্র ও তিন কন্যা রেখে যান তিনি। তাঁর মাজারটি নিজ গ্রাম আসদহাটিতেই অবস্থিত, যা বর্তমানে লোকসংগীত প্রেমীদের কাছে এক ঐতিহাসিক তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে।
জেএইচআর