মিয়া মোহাম্মদ ছিদ্দিক, কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ)
নভেম্বর ৩, ২০২৫, ০২:৩৯ পিএম
ভোরের আলো ফুটতেই কটিয়াদী ১নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গেটে জমে শিক্ষার্থীদের ভিড়। সকালটা ছিল অন্যসব দিনের চেয়ে আলাদা—চারদিকে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নীরবতা, কণ্ঠরুদ্ধ বিষণ্নতা। কারণ, আজ বিদায় নিচ্ছেন স্কুলের প্রাণভোমরা, প্রধান শিক্ষক সুজিত কুমার সাহা।
৩৫ বছরের দীপ্তিময় শিক্ষকতা জীবনের ইতি টানলেন তিনি। কিন্তু তার প্রভাব, তার আলোর ছোঁয়া যে থেমে থাকবে না—তা সবাই জানে।
গত ৩০ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার স্কুলের মাঠে আয়োজন করা হয় এক হৃদয়স্পর্শী বিদায় অনুষ্ঠান। প্রিয় শিক্ষককে ফুলের মালা পরিয়ে দেয় ছোট্ট শিক্ষার্থীরা। কেউ কান্না চেপে রাখতে পারে না। প্রিয় শিক্ষককে জড়িয়ে ধরে কাঁদে তারা। অভিভাবক, সহকর্মী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের চোখেও তখন অশ্রু। যেন গোটা কটিয়াদী মফস্বল সেদিন কেঁদেছিল এক আলোকবর্তিকার বিদায়ে।
১৯ বছর ধরে কটিয়াদী ১নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন সুজিত সাহা। প্রতিদিন বাইসাইকেল চেপে স্কুলে যেতেন—যা হয়ে উঠেছিল তার সময়নিষ্ঠা ও একাগ্রতার প্রতীক। একাধিকবার জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। তবে তার গর্ব ছিল না পুরস্কারে, বরং শিক্ষার্থীদের সাফল্যে।
শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর কাছে তিনি ছিলেন এক প্রেরণার বাতিঘর। ক্লাসে দুর্বল শিক্ষার্থীদের নিজের সময়েই পড়াতেন, কখনো পারিশ্রমিক নিতেন না। অনেকেই বলেন, স্যার শুধু বই পড়াতেন না, মানুষ বানাতেন।
অভিভাবকদের ভাষায়, তিনি ছিলেন সময়ের প্রতি অবিশ্বাস্যভাবে সচেতন। প্রতিদিন সবার আগে স্কুলে আসতেন, যেতেন সবার শেষে। শিক্ষার্থীদের প্রতি তার আচরণ ছিল পিতার মতো—শাসন ও মমতার মিশেলে ভরা। কঠিন পাঠও তিনি বুঝিয়ে দিতেন হাসিমুখে, সহজ উদাহরণে।
এই স্কুলেই শুরু হয়েছিল তার শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি। দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করে গড়ে তুলেছিলেন নিজের ভবিষ্যৎ। ১৯৯০ সালে শিক্ষকতা শুরু করে জীবনের ৩৫ বছর তিনি উৎসর্গ করেছেন শিশুদের আলোকিত ভবিষ্যতের জন্য। আজীবন অবিবাহিত থেকে তিনি নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন ছাত্রছাত্রীদের মাঝে।
বিদায়ের দিনে আবেগভরে বলেন, কাগজে-কলমে অবসর নিলেও, একজন শিক্ষকের কোনো স্থায়ী বিদায় নেই। স্কুল আর শিক্ষার্থীরাই আমার প্রাণ।
কটিয়াদী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, সুজিত কুমার সাহা ছিলেন এক বিরল মানুষ। কঠোরতা ও স্নেহের মিশ্রণে তিনি যেমন শাসন করতেন, তেমনি অনুপ্রেরণাও দিতেন। প্রাথমিক শিক্ষায় তার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আজ তিনি অবসরপ্রাপ্ত, কিন্তু তার শেখানো প্রতিটি শিশুর হাসিতে, প্রতিটি সফলতায় বেঁচে আছেন তিনি। যখনই ভোরে ভেসে আসে কোনো সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি-মনে হয়, দেখো, আলোর ফেরিওয়ালা আবার আসছেন!
জেএইচআর