আমার সংবাদ ডেস্ক
জানুয়ারি ১২, ২০২৬, ০২:৪২ পিএম
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউর সামনের করিডোর এখন থমথমে। নীরবতা ভেঙে মাঝেমধ্যে ভেসে আসছে কান্নার শব্দ। কেউ জায়নামাজ বিছিয়ে প্রার্থনা করছেন, কেউ আবার চিকিৎসকের কক্ষের দিকে চেয়ে আছেন একটু আশার খবরের আশায়। এই অপেক্ষার কেন্দ্রে রয়েছে ৯ বছর বয়সী হুজাইফা আফনান, যার মাথায় বিঁধে আছে মিয়ানমার থেকে আসা একটি বুলেট।
গতকাল রোববার সকালে টেকনাফ সীমান্তে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে ছোড়া গুলিতে গুরুতর আহত হয় শিশু হুজাইফা। সন্ধ্যায় তাকে চমেক হাসপাতালের আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। আজ সোমবার সকালে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ অস্ত্রোপচার হলেও গুলিটি বের করা সম্ভব হয়নি।
হুজাইফার চাচা মোহাম্মদ এরশাদ হাসপাতালের বাইরে বিমর্ষ চিত্তে বসে ছিলেন। তিনি জানান সেই ভয়াবহ মুহূর্তের কথা। শনিবার রাতভর সীমান্তে গোলাগুলির শব্দে পুরো পরিবার ছিল আতঙ্কিত। রোববার সকালে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত মনে হলে হুজাইফা ঘরের সামনে খেলতে বের হয়।
এরশাদ বলেন, সে রাস্তার ধারে খেলছিল। হঠাৎ করে ওপার থেকে আবারও গুলির শব্দ শোনা যায়। মুহূর্তের মধ্যেই একটি গুলি হুজাইফার মুখের পাশ দিয়ে ঢুকে সরাসরি মাথায় গেঁথে যায়। তারা শুধু তার চিৎকার শুনতে পান।
চমেক হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া ও আইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হারুন অর রশিদ জানান, গতকাল রাত থেকে আজ ভোর চারটা পর্যন্ত হুজাইফার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। তিনি বলেন, গুলিটি হুজাইফার মস্তিষ্কের অত্যন্ত স্পর্শকাতর জায়গায় অবস্থান করছে।
এই মুহূর্তে গুলিটি বের করার চেষ্টা করা হলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। চিকিৎসকেরা আপাতত মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ চাপ কমানোর জন্য অস্ত্রোপচার করেছেন। হুজাইফার অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক এবং সে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
বিগত কয়েক দিন ধরে মিয়ানমারের মংডু টাউনশিপ ও এর আশপাশে সরকারি জান্তা বাহিনী এবং আরাকান আর্মির মধ্যে যুদ্ধ চরম আকার ধারণ করেছে। বিমান হামলা, ড্রোন এবং মর্টার শেলের বিকট শব্দে কেঁপে উঠছে এপারের টেকনাফ সীমান্ত।
ওপারের এই অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বলি হচ্ছে এদেশের সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে নাফ নদীতে মৎস্যজীবী এবং সীমান্তবর্তী ঘরবাড়িগুলোতে গুলি ও বোমার অংশ এসে পড়ছে নিয়মিত। সীমান্তবর্তী বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ওপারে রোহিঙ্গাদের তিনটি সশস্ত্র গোষ্ঠী জান্তা বাহিনীর পক্ষে বিদ্রোহী আরাকান আর্মির সঙ্গে লড়ছে।
এর ফলে যুদ্ধ এখন সীমান্তের একদম জিরো পয়েন্টে চলে এসেছে। হুজাইফার মতো কোমলমতি শিশুর ওপর এই আঘাত সেই চরম অস্থিরতারই এক করুণ বহিঃপ্রকাশ। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে হুজাইফার স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে।
তার আরেক চাচা শওকত আলীকে দেখা গেল কান্নায় ভেঙে পড়তে। তিনি বলেন, ওপারে যুদ্ধ হচ্ছে তাদের নিজেদের মধ্যে, কিন্তু আমার ভাতিজির জীবন কেন বিপন্ন হবে? তারা শুধু চান হুজাইফা সুস্থ হয়ে ফিরে আসুক।
সীমান্ত দিয়ে গোলা ও গুলি আসার এই ঘটনায় বিজিবি এবং স্থানীয় প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হলেও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কমছে না। বারবার প্রতিবাদ জানানো সত্ত্বেও মিয়ানমার সীমান্ত থেকে গোলাগুলি বন্ধ না হওয়ায় সীমান্তবর্তী কয়েক হাজার পরিবার এখন বাস্তুচ্যুত হওয়ার ভয়ে দিন কাটাচ্ছে।
জেএইচআর