আমার সংবাদ ডেস্ক
জানুয়ারি ২১, ২০২৬, ০৪:১৮ পিএম
ঢাকার অদূরে সাভারে গত ছয় মাসে একে একে উদ্ধার হয়েছে ছয়টি মরদেহ। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ধরনে যেমন রয়েছে নৃশংসতা, তেমনি রয়েছে রহস্য। এই সবকটি হত্যাকাণ্ডের হোতা হিসেবে পুলিশ যাকে গ্রেপ্তার করেছে, সেই সবুজ শেখ একজন ধূর্ত অপরাধী।
নিজেকে কখনো মশিউর রহমান সম্রাট, কখনো মানসিক ভারসাম্যহীন আবার কখনো গোপন গোয়েন্দা হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসা এই যুবক পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে নিজের ভুল পরিচয় ও ঠিকানা দিয়েছিলেন। এমনকি হত্যাকাণ্ডকে তিনি নিজের ভাষায় সাংকেতিক নাম দিয়েছেন থার্টি ফোর।
পরিচয় বিভ্রাট ও পুলিশের তৎপরতা সাভার মডেল থানা পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার আসামিকে শুরুতে সবাই মশিউর রহমান ওরফে সম্রাট নামে চিনত। গ্রেপ্তারের পর সে নিজেকে সাভারের ব্যাংক কলোনির বাসিন্দা বলে দাবি করে। তবে সাভার মডেল থানার পরিদর্শক অপারেশন মো. হেলাল উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি দল তদন্তে নেমে জানতে পারে, তার দেওয়া সব তথ্যই ভুয়া।
প্রকৃতপক্ষে তার নাম সবুজ শেখ। সে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মৌছামান্দা গ্রামের পান্না শেখের ছেলে। নিজেকে আড়াল করতে সে দীর্ঘ তিন বছর ধরে সাভার এলাকায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াত। পুলিশ তার ব্যাগ তল্লাশি করে একাধিক সিম কার্ড এবং বিভিন্ন পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর পেয়েছে, যা থেকে সে প্রায়ই কল করে বিভ্রান্তিকর কথা বলত।
থার্টি ফোর কোড ও হত্যাকাণ্ডের মোটিভ সবুজ শেখের কাছে হত্যাকাণ্ড মানেই হচ্ছে থার্টি ফোর বা ৩৪। ১৮ জানুয়ারি সাভারের পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টার থেকে দুটি পোড়া মরদেহ উদ্ধারের পর তাকে আটক করা হলে সে অবলীলায় স্বীকার করে, সে থার্টি ফোর করেছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এবং আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সে ভিন্ন ভিন্ন মোটিভ বা কারণ উল্লেখ করেছে। আদালতে জবানবন্দিতে সে দাবি করেছে, যারা অসামাজিক কর্মকাণ্ড করত, তাদের সে হত্যা করত।
আবার পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে সে বলেছে, সে যেখানে থাকত বা সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টার, সেখানে অন্য কেউ থাকতে এলে সে সহ্য করতে পারত না। অর্থাৎ এলাকা বা আস্তানা দখলের মানসিকতা থেকে সে আগন্তুকদের হত্যা করত।
রহস্যময় জীবন ও স্থানীয়দের ভাষ্য সাভার মডেল থানার কাছেই চা বিক্রেতা আশরাফ আলী জানান, সবুজ বা সম্রাট প্রতিদিন পাঁচ থেকে সাতবার পোশাক বদলাত। তার কাছে দামি জুতা ও জামাকাপড় থাকত। সবসময় কানে হেডফোন আর ছোট স্পিকারে জোরে জোরে গান শুনত। অনেকে তাকে পাগল ভাবলেও তার আচরণ ছিল অত্যন্ত রহস্যময়। কেউ কেউ তাকে পুলিশের তথ্যদাতা বা গোয়েন্দাও মনে করত।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রহমান জানান, রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় সবুজ হঠাৎ করেই চিৎকার করে বলত, থার্টি ফোর কইরা দিছি। তখন কেউ বুঝতে পারেনি এটি খুনের কোড।
খুনের কালপঞ্জি ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সাভারের পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টার ও মডেল মসজিদ এলাকায় একে একে ছয়টি লাশ উদ্ধার হয়। ৪ জুলাই ২০২৫ তারিখে সাভার মডেল মসজিদের পাশ থেকে ৭৫ বছর বয়সী আসমা বেগমের লাশ উদ্ধার হয়।
শুরুতে স্বাভাবিক মৃত্যু মনে হলেও ময়নাতদন্তে এটি শ্বাসরোধে হত্যা বলে প্রমাণিত হয়। ২৯ আগস্ট ২০২৫ তারিখে পৌর কমিউনিটি সেন্টারের দ্বিতীয় তলা থেকে ওড়না প্যাঁচানো ও হাত বাঁধা অবস্থায় এক যুবকের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার হয়। ১১ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে একই ভবনের একই তলা থেকে অজ্ঞাতনামা এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ওই ভবনেই আগুনে পোড়ানো এক পুরুষের লাশ উদ্ধার করা হয়। এরপরই পুলিশ ভবনটিকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনে। ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে সর্বশেষ দুইজনের পোড়া মরদেহ উদ্ধার হয়, যার সূত্র ধরেই সবুজের গ্রেপ্তার নিশ্চিত হয়।
অটিজম আক্রান্ত তরুণীর করুণ মৃত্যু সর্বশেষ উদ্ধার হওয়া দুই মরদেহের মধ্যে একজনের পরিচয় মিলেছে। তার নাম তানিয়া আক্তার, বয়স ২৫ বছর। ১ জানুয়ারি রাজধানীর উত্তরা থেকে নিখোঁজ হওয়া এই তরুণী অটিজমে আক্রান্ত ছিলেন। সিসিটিভি ফুটেজ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দেখে তার পরিবার তাকে শনাক্ত করে। তানিয়ার মতো অসহায় মানুষকেও সবুজ রেহাই দেয়নি।
পুলিশের ভাষ্য ও তদন্তের ভবিষ্যৎ ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ক্রাইম ও ট্রাফিক উত্তর আরাফাতুল ইসলাম জানিয়েছেন, সবুজ অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলেও দ্রুততম সময়ে তার প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে।
সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক মো. ফাইজুর খান জানান, সবুজ আদালতে ছয়টি হত্যার কথাই স্বীকার করেছে। তবে সে এককভাবে এই কাজগুলো করেছে নাকি এর পেছনে বড় কোনো চক্র বা পরিকল্পনা আছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সাভারের পরিত্যক্ত সেই পৌর কমিউনিটি সেন্টারটি বর্তমানে এক ভুতুড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ৫ আগস্টের আগুনের ছাপ, ভাঙা দরজা জানালা আর সেপটিক ট্যাংকের খোলা ঢাকনা সাক্ষ্য দিচ্ছে এক সিরিয়াল কিলারের নৃশংসতার।
জেএইচআর