আমার সংবাদ ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৬, ১১:৪০ এএম
কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলা জাতিগত ও রাজনৈতিক সংগত ও সহিংসতার খেসারত দিতে হলো এক বাংলাদেশি শিশুকে। গত ১১ জানুয়ারি নিজ বাড়ির আঙিনায় থাকাকালীন সীমান্তের ওপার থেকে আসা একটি গুলি হুজাইফার মস্তিষ্কে বিদ্ধ হয়েছিল। দীর্ঘ প্রায় এক মাস কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস ব্যবস্থা বা লাইফ সাপোর্ট এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকার পর আজ সকালে তার জীবনপ্রদীপ নিভে যায়।
টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ গ্রামের জসিম উদ্দিনের মেয়ে হুজাইফা সুলতানা। গত ১১ জানুয়ারি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সরকারি বাহিনী বা জান্তা এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যে তীব্র লড়াই চলছিল। স্থানীয় সূত্রমতে, ওই দিন রাখাইনে আরাকান আর্মির সঙ্গে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরসা, আরএসও এবং নবী হোসেন বাহিনীর মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ বাধে।
সংঘর্ষের এক পর্যায়ে সীমান্তের ওপার থেকে ছোড়া একটি গুলি নাফ নদী পেরিয়ে হুজাইফার মাথায় এসে লাগে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপরই রক্তাক্ত অবস্থায় হুজাইফাকে প্রথমে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় তাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ বা চমেক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়।
চমেক হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, গুলিটি শিশুটির মস্তিষ্কের গভীরে ঢুকে পড়ায় তা অপসারণ করা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মস্তিষ্কের ভেতরে থাকা বুলেটের কারণে তৈরি হওয়া প্রবল চাপ কমাতে চিকিৎসকেরা আপ্রাণ চেষ্টা চালান। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকার জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে আজ সকালে না ফেরার দেশে চলে যায় শিশুটি।
হুজাইফার মৃত্যুর সংবাদ তার গ্রামে পৌঁছালে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজালাল বলেন, একটি ৯ বছরের শিশুর এভাবে মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। আমরা শুরু থেকেই তার জন্য দোয়া করছিলাম, কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। সীমান্ত ঘেঁষা মানুষেরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
নিহত শিশুর চাচা শওকত আলী আজ দুপুরে ঢাকা থেকে হুজাইফার মরদেহ গ্রহণ করতে কক্সবাজার থেকে রওনা দিয়েছেন। আইনি প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহটি টেকনাফে নিয়ে আসা হবে এবং সেখানেই তাকে সমাহিত করা হবে। রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে চলা সংঘর্ষের জেরে মাঝেমধ্যেই বাংলাদেশের ভূখণ্ডে গুলি ও মর্টার শেল এসে পড়ছে।
হুজাইফার মৃত্যু এই নিরাপত্তাহীনতাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। তেচ্ছিব্রিজ গ্রামের বাসিন্দারা জানান, ওপারে গোলাগুলি শুরু হলেই তারা আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। হুজাইফার এই মৃত্যু সীমান্তের ওপারে চলা যুদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনের ঝুঁকির এক করুণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।
হুজাইফা সুলতানা কোনো রাজনৈতিক দল বা যুদ্ধের অংশ ছিল না। সে ছিল তার বাবা-মায়ের আদরের সন্তান, যার স্বপ্ন বিদীর্ণ হয়েছে সীমান্তের ওপারের এক বিপথগামী বুলেটে। এই মৃত্যুর দায় কার, সেই প্রশ্ন আজ টেকনাফের প্রতিটি মানুষের মুখে মুখে। সীমান্তের ওপারে শান্তি কবে ফিরবে তা অনিশ্চিত হলেও, হুজাইফার মৃত্যু মনে করিয়ে দিচ্ছে যে যুদ্ধের আগুন সীমান্তের সীমানা মানে না।
জেএইচআর