দিনাজপুর প্রতিনিধি
মার্চ ৮, ২০২৬, ১২:২৯ পিএম
সবুজ পাতার মখমলে মোড়ানো চারপাশ। চওড়া ও খাঁজকাটা পাতার নিচ থেকে উঁকি দিচ্ছে সাদা পাপড়ি আর হলুদ রেণুর ফুল। তবে আসল আকর্ষণ লুকিয়ে আছে গাছের গোড়ায় লতার সঙ্গে ঝুলে আছে লাল, খয়েরি আর সবুজাভ স্ট্রবেরি। উত্তরের হিমেল হাওয়ায় দোল খাওয়া এই বিলিতি ফলের ম ম গন্ধে এখন মাতোয়ারা দিনাজপুরের বিরল উপজেলার রবিপুর গ্রাম। চারজন অদম্য তরুণের হাত ধরে সেখানে গড়ে উঠেছে স্ট্রবেরির এক বিশাল সাম্রাজ্য, যা দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন উৎসুক জনতা।
চাকরির পেছনে না ছুটে মাটির টানে কৃষিতে বিপ্লব ঘটিয়েছেন চার বন্ধু শাহরিয়ার হোসেন, আরিফ হোসেন, মনিরুজ্জামান ও ছামিউল ইসলাম। ৮৭ শতাংশ জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে তারা গড়ে তুলেছেন এই নজরকাড়া স্ট্রবেরি বাগান। শুধু স্ট্রবেরিই নয়, প্রায় ১২ একর জমি ইজারা নিয়ে তারা যৌথভাবে আবাদ করছেন শসা, টমেটো, বেগুন, পেয়ারা ও লিচু। তাদের এই কর্মতৎপরতায় রবিপুরের ফসলি মাঠ এখন নবরূপে সেজেছে।
উদ্যোক্তাদের একজন ছামিউল ইসলাম জানান, পড়াশোনার পাশাপাশি ইউটিউব দেখে উচ্চমূল্যের ফসল চাষে তার আগ্রহ জাগে। প্রথমে ছোট পরিসরে শুরু করে হোঁচট খেলেও হাল ছাড়েননি। তার এই জেদ দেখে এগিয়ে আসেন প্রতিবেশী শাহরিয়ার ও অন্য দুই বন্ধু। শাহরিয়ার বলেন, ছামিউলের কৃষিপ্রেম দেখে আমরা চারজন এক হই। বর্তমানে আমরা যে লাভের মুখ দেখছি, তাতে কষ্ট সার্থক মনে হচ্ছে।
বাগান ঘুরে দেখা যায়, আধুনিক 'মালচিং' পদ্ধতিতে উইন্টারডন, ফেস্টিভ্যাল ও আমেরিকান ফেস্টিভ্যালসহ চার জাতের প্রায় ১৫ হাজার চারা রোপণ করা হয়েছে। চারা লাগানোর মাত্র ৭৫ দিনের মাথায় ফলন আসতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে তারা প্রায় সাড়ে আট মণ ফল বিক্রি করেছেন।
প্রতি কেজি গড়ে ৪০০ টাকা। প্রত্যাশিত ফলন: প্রায় ১৫০ মণ। খরচ বাদ দিয়ে মৌসুমে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তারা।
ডিজিটাল যুগে পিছিয়ে নেই এই উদ্যোক্তারা। 'বিরল অ্যাগ্রো হাব' নামে একটি ফেসবুক পেজ খুলেছেন তারা, যেখানে নিয়মিত আপলোড করা হচ্ছে চাষাবাদের ভিডিও ও ছবি। তা দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেকেই আসছেন পরামর্শ নিতে। কাহারোল থেকে আসা স্কুলশিক্ষক রুহুল কুদ্দুস জানান, শুনেছিলাম এখানে ভালো স্ট্রবেরি চাষ হচ্ছে, স্বচক্ষে দেখে মুগ্ধ হলাম। সিদ্ধান্ত নিয়েছি আগামী বছর আমিও আবাদ করব।
বিরল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুম্মান আক্তার জানান, দিনাজপুর এলাকাটি শীতপ্রধান হওয়ায় এখানে স্ট্রবেরি চাষের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি বিভাগ থেকে তাদের সার, উপকরণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত দোআঁশ মাটিতে এই চাষ লাভজনক।
মাঠের এক কোণে তৈরি করা টংঘরে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন শ্রমিকেরা। স্বপ্ন এখন শুধু নিজেরা স্বাবলম্বী হওয়া নয়, বরং চারা উৎপাদন করে পুরো এলাকায় স্ট্রবেরি বিপ্লব ছড়িয়ে দেওয়া। রবিপুরের এই চার যুবকের শ্রম আর ঘামে ভেজা স্ট্রবেরি এখন কেবল ফল নয়, হয়ে উঠেছে হাজারো বেকার যুবকের প্রেরণার উৎস।
এএন