মো. মাহমুদুল হাসান বাবু, পঞ্চগড়
মে ১৭, ২০২৬, ০৭:১৪ পিএম
ব্যাংকের ঋণ, দোকানে সার-কীটনাশক বাকিতে নিয়ে এবং মানুষের ৬০ বিঘা জমি চুক্তিতে নিয়ে হাইব্রিড জাতের মিষ্টি কুমড়া চাষ করেছিলেন পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার লাঙ্গল গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা মো. সাজ্জাদ হোসেন। সঠিক পরিচর্যায় কুমড়ো গাছে ঢেকে যায় পুরো ক্ষেত। আসতে শুরু করে ফুল। কিন্তু ফল আসে না। মৌসুমের শেষের দিকেও দেখা মেলেনি কোনো ফলের। ইতোমধ্যে সব মিলিয়ে তিনি খরচ করেছেন ৩৮–৪০ লাখ টাকার মতো। বীজ কোম্পানির কথামতো ফলন হলে এসব জমি থেকে তিনি বর্তমান বাজারে প্রায় দেড় কোটি টাকার মিষ্টি কুমড়া বিক্রি করতে পারতেন।
জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগে কৃষক সাজ্জাদ হোসেন জানান, পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার ময়দানদিঘী ইউনিয়নের সর্দারপাড়া ও পঞ্চগড় সদর উপজেলার মাগুড়া ইউনিয়নের নলেহা গ্রামে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে ৬০ বিঘা জমি একর প্রতি ৬০ হাজার টাকা চুক্তিতে নিয়ে আলু চাষ করেন। কিন্তু আলুতে লোকসান হওয়ার পর সেই জমিতে মিষ্টি কুমড়া চাষের সিদ্ধান্ত নেন। বোদা বাজারের সার-বীজ-কীটনাশক ব্যবসায়ী আরিফুল রহমান রাসেলের পরামর্শে আলমগীর সীড কোম্পানির ‘ব্যাংকক সুইট-২’ জাতের মিষ্টি কুমড়ার বীজ সংগ্রহ করে জমিতে লাগান।
কোম্পানির পক্ষ থেকে তাকে নিশ্চয়তা দিয়ে বলা হয়েছিল, এই বীজের মান খুবই ভালো এবং প্রতি একরে ১৯–২০ মেট্রিক টন ফলন আসবে। তাদের কথামতো নিয়মিত পরিচর্যা, সেচ, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করেও গাছের অবস্থা ভালো থাকলেও তিন মাসেও কোনো ফল আসেনি। ইতোমধ্যে তিনি এই জমিতে প্রায় ৪০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। ভবিষ্যতে ফল আসারও কোনো সম্ভাবনা নেই বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।
জমির মালিক সর্দারপাড়া গ্রামের কাব্য ভূষণ বর্মন জানান, “আমরা ছয় ভাই মিলে সাজ্জাদ ভাইকে ৬০ বিঘা জমি দিয়েছি। আলু চাষে তিনি অনেক টাকা লোকসান করেছেন। পরে সেই জমিতে তিনি মিষ্টি কুমড়া করেন। জমিতে গাছ ভরে গেলেও কোনো ফল আসেনি। এটা বীজের দোষ। আমাদের জমির পাশেই অন্যরা মিষ্টি কুমড়া করেছে, তাদের জমি ফলনে ভরে গেছে। সাজ্জাদ ভাই আলু চাষে কিছু টাকা পরিশোধ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন মিষ্টি কুমড়া বিক্রি করে বাকি টাকা দেবেন। কিন্তু ফল না আসায় আমরাও টাকার জন্য চিন্তিত।”
সার-বীজ-কীটনাশক ব্যবসায়ী মো. আরিফুল রহমান রাসেল জানান, আলমগীর সীডস কোম্পানি আমাকে জানিয়েছিল তাদের বীজ ভালো হবে এবং একরে ১৯–২০ টন ফলন আসবে। গত ২৬ জানুয়ারি কোম্পানিকে নগদ টাকা দিয়ে ১০ কেজি ৬০০ গ্রাম বীজ নিয়ে আমি সাজ্জাদ ভাইকে দিই। তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী সবকিছু করা হয়েছে। কিন্তু জমিতে প্রচুর গাছ থাকলেও মিষ্টি কুমড়া একটিও হয়নি। আমি কোম্পানিকে জানিয়েছি, এই বীজে সাজ্জাদ ভাইয়ের বড় ক্ষতি হয়েছে এবং তারা যেন ক্ষতিপূরণ দেয়। কিন্তু তারা এখন টালবাহানা করছে।
কৃষি উদ্যোক্তা মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “ভাই আমি পথে বসেছি। এখন আমি কী করব? আলমগীর সীড কোম্পানি আমাকে রাস্তায় নামিয়েছে। ঋণ আর ধারদেনা করে, জমির মালিকের টাকা ও শ্রমিকদের মজুরি বাকি রেখে প্রায় ৪০ লাখ টাকা খরচ করেছি। এত টাকা আমি কীভাবে পরিশোধ করব? আমি কোম্পানির কাছে ক্ষতিপূরণ চাই। না দিলে আদালতে যাব।”
জেলা বীজ ও প্রত্যয়ন কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. শামীম বলেন, কৃষি উদ্যোক্তা সাজ্জাদ বীজ কিনে প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ দিয়েছেন, যার অনুলিপি আমরা পেয়েছি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাসহ সরেজমিনে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। তিনি আসলেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এএন