আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জানুয়ারি ৩১, ২০২৬, ০৪:১৯ পিএম
পাকিস্তানের রাজনীতিতে ‘ভুট্টো-জারদারি’ নামটি কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ইতিহাসের সমার্থক। বর্তমানে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সফরকে কেন্দ্র করে এ ইতিহাসের এক অনন্য ও আবেগঘন অধ্যায় পুনরায় সামনে এসেছে।
প্রেসিডেন্টের বড় কন্যা বখতাওয়ার ভুট্টো-জারদারি তার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে এমন কিছু বিরল আর্কাইভ ছবি প্রকাশ করেছেন, যা পাকিস্তান ও আরব আমিরাতের মধ্যকার কয়েক দশকের কূটনৈতিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের গভীরতাকে ফুটিয়ে তুলেছে।
বখতাওয়ারের শেয়ার করা ছবিগুলোতে দেখা যায়, তার মা, মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী শহীদ বেনজির ভুট্টো এবং বাবা আসিফ আলী জারদারির সঙ্গে আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্বের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি গত সোমবার থেকে আরব আমিরাতে চার দিনের এক রাষ্ট্রীয় সফরে রয়েছেন। এ সফরের সমান্তরালে বখতাওয়ারের প্রকাশ করা ‘তখন এবং এখন’ এর কোলাজ ছবিগুলো সাধারণ মানুষ ও কূটনীতিবিদদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
একটি মিশ্র ছবিতে দেখা যায়, পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো এবং আসিফ আলী জারদারি আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট প্রয়াত শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানের সাথে আলাপ করছেন। সেই ছবিতে শিশু হিসেবে বখতাওয়ার, বিলাওয়াল এবং আসিফা ভুট্টোকেও দেখা যাচ্ছে। এটি মূলত নব্বইয়ের দশকের একটি দৃশ্য।

ছবির অন্য অর্ধে দেখা যায় বর্তমানের দৃশ্য, যেখানে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আবুধাবির আল বাহর প্রাসাদে প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি এবং তার তিন সন্তান বর্তমান প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সাথে সাক্ষাৎ করছেন। ছবিতে বখতাওয়ারের সাথে তার স্বামী, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মাহমুদ চৌধুরীকেও দেখা গেছে। বখতাওয়ার এ ছবির ক্যাপশনে লিখেছেন, আল্লাহ সর্বদা তাদের রক্ষা করুন।
আরেকটি ছবিতে দুবাইয়ের শাসক ও আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুমের সাথে ভুট্টো পরিবারের দুই সময়ের স্মৃতি তুলে ধরা হয়েছে। আর্কাইভ ছবিতে দেখা যায়, তরুণ শেখ মোহাম্মদের সামনে শিশু বিলাওয়াল, বখতাওয়ার ও আসিফা বসে আছেন এবং তাদের মা বেনজির ভুট্টো সস্নেহে তাকিয়ে আছেন।
বুধবার জাবিল প্রাসাদে ঠিক একই পরিবেশে বর্তমান প্রেসিডেন্ট জারদারি এবং তার সন্তানদের অভ্যর্থনা জানান শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ। বখতাওয়ার এ ছবির ক্যাপশনে তার মা ও পরিবারের প্রতি আমিরাতি রাজপরিবারের দীর্ঘদিনের ব্যবহারের প্রশংসা করে লেখেন, একই দয়ামায়া, ভালোবাসা এবং নম্রতায় ঘেরা, সর্বদা।
বেনজির ভুট্টো এবং আরব আমিরাতের সম্পর্ক কেবল কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৯৮ সালে নির্বাচনের পর তিনি যখন রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখে স্বেচ্ছায় নির্বাসনে যান, তখন দুবাই ছিল তার অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল।
প্রায় এক দশক তিনি দুবাই এবং লন্ডনের মধ্যে যাতায়াত করে কাটিয়েছেন। এ সময়েই বখতাওয়ার ও তার ভাইবোনেরা দুবাইয়ের পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন, যা তাদের ব্যক্তিগত জীবনে আরব আমিরাতের প্রতি এক বিশেষ অনুভূতির জন্ম দিয়েছে।
২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডিতে এক মর্মান্তিক আত্মঘাতী হামলায় বেনজির ভুট্টো নিহত হওয়ার পর, তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কাঁধে তুলে নেন ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি। বর্তমানে ৩৭ বছর বয়সী বিলাওয়াল পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান হিসেবে পাকিস্তানের রাজনীতিতে এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।
বখতাওয়ার তার পোস্টে কেবল তার মায়ের ছবিই নয়, বরং তার নানা, পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানের একটি বিরল ছবিও শেয়ার করেছেন। উল্লেখ্য, ১৯৭১ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত জুলফিকার আলী ভুট্টোর শাসনামলেই পাকিস্তান ও আরব আমিরাতের এ ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি ২০২৪ সালের মার্চ মাসে দ্বিতীয়বারের মতো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার এ বর্তমান সফরের মূল লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। আমিরাতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ওয়াম জানিয়েছে, জারদারির এবারের সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।
দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, পাকিস্তানের সাথে আমাদের অংশীদারিত্ব পুরনো, গভীর এবং চলমান। আরব আমিরাতে বসবাসরত পাকিস্তানি কমিউনিটি আমাদের ভাই এবং তাদের প্রতি আমাদের পূর্ণ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রয়েছে।
বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় ১.৭ মিলিয়ন বা ১৭ লক্ষ পাকিস্তানি নাগরিক বসবাস করছেন, যা দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রবাসী গোষ্ঠী। এ বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান এবং রেমিট্যান্স পাকিস্তানের অর্থনীতির জন্য একটি মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে। বখতাওয়ার ভুট্টো-জারদারির শেয়ার করা এ আর্কাইভ ছবিগুলো কেবল কিছু স্থিরচিত্র নয়, বরং এটি পাকিস্তান ও আরব আমিরাতের মধ্যকার কয়েক দশকের বিশ্বস্ততার দলিল।
মায়ের অভাব সত্ত্বেও তার বাবার নেতৃত্বে সেই একই রাজপ্রাসাদে সন্তানদের উপস্থিতি একটি বৃত্ত পূরণের মতো। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরণের ব্যক্তিগত কূটনীতি দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইএইচ