আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেকার চিরচেনা কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি। প্রতিবছরের মতো এবারও ৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানে কাশ্মীর সংহতি দিবস পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষে দেওয়া এক ভাষণে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দাবি করেছেন, কাশ্মীর কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, বরং এটি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান ভিত্তি বা নিউক্লিয়াস।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, অদূর ভবিষ্যতে কাশ্মীর একদিন পুরোপুরি পাকিস্তানের অঙ্গ হবে।
বৃহস্পতিবারের এ কর্মসূচিতে শাহবাজ শরিফ সরাসরি ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জম্মু-কাশ্মীর সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধান চাইলে কাশ্মীরি জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।
১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের হাত ধরে শুরু হওয়া এ দিবসটি পাকিস্তানে জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট সরদার আসিফ আলী জারদারি এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ উভয়েই কাশ্মীরি জনগণের মুক্তি আন্দোলনের প্রতি তাদের রাজনৈতিক, নৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
শাহবাজ শরিফ তার বক্তব্যে জম্মু-কাশ্মীর পরিস্থিতিকে বর্তমান ফিলিস্তিন সংকটের সঙ্গে তুলনা করেন।
তিনি বলেন, আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য কাশ্মীরিদের লড়াই আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ ন্যায্য। বলপ্রয়োগ বা দমন-পীড়ন চালিয়ে উপত্যকায় কখনোই স্থায়ী শান্তি আনা সম্ভব নয় বলে তিনি ভারতকে সতর্ক করেন।
ভাষণ চলাকালে শাহবাজ শরিফ এমন কিছু নেতার নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করেন, যাদের ভারত বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে গণ্য করে। এদের মধ্যে রয়েছেন সৈয়দ আলী শাহ গিলানি ও বুরহান ওয়ানি, বর্তমানে কারাবন্দী নেতা ইয়াসিন মালিক ও মিরওয়াইজ ওমর ফারুক এবং নারী নেত্রী আসিয়া আন্দ্রাবি। একই দিনে পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকেও একটি সংহতি বার্তা পাঠানো হয়।
সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরসহ তিন বাহিনীর প্রধানরা জানান যে, কাশ্মীরি জনতার স্বাধীনতা সংগ্রামে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।
পাকিস্তানের এ বক্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বরাবরের মতোই মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, জম্মু-কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।
ভারতের মতে, ৫ আগস্ট ২০১৯ এ সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের পর কাশ্মীর এখন উন্নয়নের মূল ধারায় শামিল হয়েছে এবং পাকিস্তানের এ সংহতি দিবস পালন ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ ছাড়া আর কিছুই নয়।
পাকিস্তান যখন নিজ দেশে কাশ্মীরিদের জন্য সংহতি জানাচ্ছিল, ঠিক তখনই ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাস্তায় উল্টো চিত্র দেখা গেছে। যুক্তরাজ্য ও বেলজিয়ামসহ একাধিক ইউরোপীয় দেশে পাকিস্তানি দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ করেছেন প্রবাসী কাশ্মীরিরা। বিক্ষোভকারীদের প্রধান অভিযোগ ছিল ইসলামাবাদ রাজনৈতিক স্বার্থে গত কয়েক দশক ধরে কাশ্মীরে ছায়াযুদ্ধ বা প্রক্সি ওয়ার চালিয়ে যাচ্ছে, যার বলি হয়েছে লক্ষাধিক সাধারণ মানুষ।
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে মদত দেওয়ার অভিযোগ তুলে সেখানে স্লোগান দেওয়া হয়। এ ছাড়া ভারতের অংশের পাশাপাশি পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং সেখানকার মানুষের দুর্দশা নিয়ে প্রবাসীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
শাহবাজ শরিফের এ কড়া বার্তা এবং বিশ্বজুড়ে প্রবাসী কাশ্মীরিদের পাল্টা বিক্ষোভ প্রমাণ করে যে, কাশ্মীর ইস্যুটি আজও দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তির পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। একদিকে পাকিস্তানের দাবি কাশ্মীর তাদের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি, অন্যদিকে ভারতের দাবি এটি তাদের অভ্যন্তরীণ অখণ্ডতার বিষয়। এ দুই অনড় অবস্থানের মাঝে কাশ্মীরি জনগণের ভাগ্য ও উপত্যকার স্থিতিশীলতা আজও অনিশ্চয়তার দোলাচলে দুলছে।
ইএইচ