আমার সংবাদ ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬, ০৫:৪৬ পিএম
বিমানের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে ১১ বছরের শিশু গৃহকর্মীকে পৈশাচিক নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় এক নাটকীয় মোড় তৈরি হয়েছে। ছয় দিনের রিমান্ড শেষে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার জন্য তদন্ত কর্মকর্তা আবেদন করলেও শেষ মুহূর্তে বিচারকের খাসকামরায় গিয়ে তা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন সাফিকুর।
তবে মামলার অপর সহযোগী আসামি গৃহকর্মী মোছা. সুফিয়া খাতুন আদালতে অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। শুক্রবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীরের আদালত আসামিদের জবানবন্দি গ্রহণ ও কারাগারে পাঠানোর এই নির্দেশ দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক রোবেল মিয়া আজ দুপুরে আসামিদের আদালতে হাজির করেন। পুলিশি আবেদনে বলা হয়েছিল, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা শিশু নির্যাতনের ঘটনায় নিজেদের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেছেন এবং তাঁরা স্বেচ্ছায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে আগ্রহী।
কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিচারকের খাসকামরায় নেওয়ার পর সাফিকুর রহমান জবানবন্দি দিতে অস্বীকৃতি জানান। অন্যদিকে, সুফিয়া খাতুন বিস্তারিত জবানবন্দি দিলে আদালত তা রেকর্ড করেন এবং পরবর্তীতে দুজনকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, নির্যাতনের শিকার ওই শিশুর বাবা একজন সাধারণ হোটেল কর্মচারী। গত বছরের জুনে বিমানের তৎকালীন এমডি সাফিকুর ও তাঁর স্ত্রী বীথির উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরের বাসায় মাসিক বেতনে মেয়েটিকে কাজে দেন তিনি।
নিয়োগের সময় সাফিকুর দম্পতি মেয়েটির পড়াশোনা ও বিয়ের খরচ বহনের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিবাদী পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ, গত ২ নভেম্বর মেয়েটির বাবা শেষবার সুস্থ অবস্থায় তাকে দেখে আসার পর থেকেই নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়।
মাঝখানে কয়েকবার দেখা করতে চাইলে পরিবারটি নানা টালবাহানায় দেখা করতে দেয়নি। মামলার অভিযোগে বলা হয়, গত ৩১ জানুয়ারি বীথি ফোন করে মেয়েটির বাবাকে জানান যে তাঁর সন্তান অসুস্থ, তাকে যেন নিয়ে যাওয়া হয়।
সন্ধ্যা সাতটার দিকে যখন বীথি মেয়েটিকে তাঁর বাবার হাতে তুলে দেন, তখন দেখা যায় শিশুটির দুই হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর ও দগদগে জখম। মেয়েটি যন্ত্রণায় কথা পর্যন্ত বলতে পারছিল না। পরবর্তীতে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করার পর শিশুটি নির্যাতনের বর্ণনা দেয়।
শিশুটির ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরে তুচ্ছ কারণে সাফিকুর, তাঁর স্ত্রী বীথি এবং বাসার অন্য গৃহকর্মীরা তাকে নিয়মিত মারধর করতেন। এমনকি খুন্তি গরম করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেওয়ার মতো নৃশংসতাও চালানো হয়েছে।
গত ২ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে সাফিকুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী বীথিসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃত অন্য দুজন হলেন ওই বাসার গৃহকর্মী রূপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগম।
১০ ফেব্রুয়ারি আদালত তাঁদের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন। রিমান্ড শেষে রূপালী খাতুনকে গতকাল এবং আজ সাফিকুর ও সুফিয়াকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার বাসায় এ ধরনের শিশু নির্যাতনের ঘটনা নাগরিক সমাজে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
যদিও প্রধান আসামি সাফিকুর রহমান আদালতে জবানবন্দি দেননি, তবে পুলিশের দাবি তাঁদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণ রয়েছে। শিশুটির চিকিৎসার তদারকি ও ন্যায়বিচারের দাবিতে সরব রয়েছেন মানবাধিকার কর্মীরাও। এখন দেখার বিষয়, উচ্চপদস্থ এই কর্মকর্তার ক্ষমতার দাপট ছাপিয়ে আইনের শাসন কতটা কার্যকর হয়।
জেএইচআর