নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই ১৬, ২০২৬, ০৫:০১ পিএম
চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের স্মৃতিবহ ও ঐতিহাসিক ছাত্র-আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দণ্ডিত চার আসামি তাদের সাজার বিরুদ্ধে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে আপিল দায়ের করেছেন। আপিলকারীদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই পুলিশ সদস্য এবং পাঁচ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত সাবেক এক সহকারী রেজিস্ট্রার ও এক ছাত্রলীগ নেতা রয়েছেন।
বৃহস্পতিবার আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু আপিল দায়েরের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।
আপিলকারী চার আসামি কারা?
আইনজীবীদের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করেছেন চার আসামি। তারা হলেন- রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, যাদের দুজনকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আপিল করেছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল এবং বেরোবি শাখা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ। এ দুই আসামিকে ট্রাইব্যুনাল ৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন।
আসামিপক্ষের যুক্তি ও দাবি
আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু জানান, এই হত্যাকাণ্ডের সাথে তার মক্কেলরা কোনোভাবেই জড়িত ছিলেন না। ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ) আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও অপরাধের প্রমাণাদি সন্দেহাতীতভাবে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে। সম্পূর্ণ পারিপার্শ্বিক ও দুর্বল সাক্ষ্য-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে এই সাজা দেওয়া হয়েছে দাবি করে উচ্চ আদালতে ন্যায়বিচারের আশায় তারা এই আপিল দায়ের করেছেন। আপিল শুনানিতে আসামিরা নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন এই আইনজীবী।
রক্তাক্ত ১৬ জুলাই ও ঐতিহাসিক ট্রাইব্যুনালের রায়
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালীন রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্ক মোড়ে পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হন ইংরেজি বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। বুক চিতিয়ে পুলিশের বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাঈদের সেই সাহসিকতার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পথ সুগম করে।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের ধারায় এই মামলার বিচার সম্পন্ন হয়। চলতি বছরের ৯ এপ্রিল (২০২৬) ট্রাইব্যুনাল ঐতিহাসিক এক রায় ঘোষণা করেন। রায়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার দায়ে অভিযুক্তদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করা হয়।
আদালতের রায়ে সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সাবেক এসি আরিফুজ্জামান, সাবেক ওসি রবিউল ইসলাম এবং বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায়কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া পলাতক অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ, সাবেক পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান, দুই শিক্ষক মশিউর রহমান ও আসাদুজ্জামান এবং ছাত্রলীগ সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রায়ে সাবেক এডিসি শাহ নূর আলম পাটোয়ারী, ডিসি আবু মারুফ হোসেন, সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সহকারী রেজিস্ট্রার রাসেল, ছাত্রলীগ নেতা আকাশ, ছাত্রলীগ নেতা মাসুদুল হাসান, অফিস সহকারী মাহাবুবার রহমান এবং ডা. সারোয়ার হোসেন চন্দনকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ১১ জনকে ৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে, একজনের ক্ষেত্রে হাজতবাসের মেয়াদকেই সাজা হিসেবে গণ্য করেছেন আদালত।
দেশের মানুষের দৃষ্টি এখন আপিল বিভাগে
আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড ছিল ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মূল টার্নিং পয়েন্ট। এই মামলার রায়ের পর আসামিদের আপিল করার অধিকার আইনত থাকলেও, বিষয়টিকে দেশের আপামর ছাত্রসমাজ এবং সাধারণ মানুষ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
উচ্চ আদালতে এই মামলার শুনানির প্রক্রিয়া ও পরবর্তী আইনি লড়াই নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে দেশজুড়ে। ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সর্বোচ্চ আদালত কী সিদ্ধান্ত নেন, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
এএন