আমার সংবাদ ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬, ০১:১৯ পিএম
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও কণ্টকাকীর্ণ দেড় বছরের পথচলা শেষ হচ্ছে। আগামীকাল মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন নির্বাচিত মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যবনিকা পড়বে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের।
উপদেষ্টা পরিষদের শেষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে গত রোববার। শেষ কর্মদিবসগুলোতে সচিবালয়ের অলিন্দে অলিন্দে বইছে বিদায়ের সুর। উপদেষ্টারা তাঁদের শেষ মুহূর্তের নথিপত্র গুছিয়ে নিচ্ছেন এবং বিনিময় করছেন বিদায়ী সম্ভাষণ।
তবে সবচেয়ে প্রতীকী দৃশ্যটি দেখা যাবে আগামীকাল সন্ধ্যায়। নিয়ম অনুযায়ী, উপদেষ্টারা জাতীয় পতাকাবাহী গাড়িতে চড়ে শপথ অনুষ্ঠানে যাবেন, কিন্তু অনুষ্ঠান শেষে যখন ফিরবেন, তখন সেই গাড়িতে আর লাল-সবুজের পতাকাটি থাকবে না। এটিই হবে তাঁদের সাধারণ নাগরিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের মুহূর্ত। দায়িত্ব শেষে কে কোথায় ফিরছেন, কার গন্তব্য লেখালেখি আর কেই-বা ফিরছেন শ্রেণিকক্ষে, তা নিয়ে জনমনে ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে। প্রধান উপদেষ্টার পদ ছাড়ার পর তিনি কী করবেন, সে বিষয়ে গত রোববার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন তাঁর প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
তিনি জানান, অধ্যাপক ইউনূসের জীবনে অবসর বলে কোনো শব্দ নেই। ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন মন্ত্রিসভার শপথের পর তিনি হয়তো পুনরায় তাঁর সেই বিশ্বজুড়ে পরিচিত সামাজিক ব্যবসার দর্শনে নিমগ্ন হবেন। ক্ষুদ্রঋণ, তিন শূন্য ভিশন অর্থাৎ শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ এবং পরিবেশ রক্ষা নিয়ে তিনি আগে যেমন বিশ্বজুড়ে কাজ করতেন, দায়িত্ব শেষেও সেই বৈশ্বিক মঞ্চেই তাঁকে দেখা যাবে। মূলত রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব শেষে তিনি আবার তাঁর প্রিয় মানবিক ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে নিজেকে সঁপে দেবেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম কান্ডারি এবং আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল আগেই স্পষ্ট করেছেন তাঁর গন্তব্য। তিনি জানিয়েছেন, উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন শেষে তিনি আবার তাঁর চিরচেনা প্রাঙ্গণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাবেন। আইনের শিক্ষক হিসেবে ক্লাসরুমে পাঠদানের পাশাপাশি তিনি মৌলিক বিষয়ে গবেষণা ও লেখালেখিতে মনোনিবেশ করবেন। নতুন মন্ত্রিসভায় থাকার সম্ভাবনা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রশ্নই আসে না। একই পথে হাঁটছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের কঠিন চ্যালেঞ্জ সামলানোর পর তিনি পুনরায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেবেন বলে জানা গেছে। শিক্ষকতা ও উচ্চতর গবেষণাই হবে তাঁর পরবর্তী কর্মস্থল।
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ তিন নীতি-নির্ধারক ফিরছেন তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন আজ সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রণালয় থেকে বিদায় নেবেন। তিনি জানান, দীর্ঘ ক্লান্তিকর দায়িত্ব শেষে আপাতত কিছুদিন বিশ্রাম নেবেন। এরপর তিনি আগের মতোই নিয়মিত কলাম ও নিবন্ধ লেখালেখিতে ফিরে যেতে চান। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, সামনে পবিত্র রমজান। এই সংযমের মাসটি তিনি বই পড়ে কাটাবেন। রমজানের পর পুনরায় পুরোদমে লেখালেখিতে ফিরবেন তিনি।
অন্যদিকে, উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার তাঁর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছেন। দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি নিয়মিত বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে কলাম লিখতেন এবং নাগরিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এখন তিনি আবার সেই নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সঙ্গেই সম্পৃক্ত হতে যাচ্ছেন।
পরিবেশ রক্ষা ও মানবাধিকার নিয়ে যারা সারাজীবন রাজপথে লড়াই করেছেন, তাঁরা ফিরছেন তাঁদের নিজস্ব কর্মক্ষেত্রে। পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকেই পুনরায় বেলার প্রধান নির্বাহী হিসেবে যোগ দেবেন।
সচিবালয়ে তাঁর শেষ কর্মদিবসে তিনি জানান, মন্ত্রণালয়ের টেবিল ছেড়ে তিনি আবার পরিবেশ রক্ষায় আইনি লড়াইয়ের ময়দানেই ফিরছেন। সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ মানবাধিকার সংস্থা ব্রতীতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে তাঁর একটি বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যে নারী সমাজ অসামান্য অবদান রেখেছেন, তাঁদের কল্যাণে এবং ক্ষমতায়নে তিনি নিবিড়ভাবে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর ৮ আগস্ট যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, তা শেষ হচ্ছে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। প্রধান উপদেষ্টাসহ ২১ জন উপদেষ্টা এবং বিশেষ সহকারী ও দূত মিলিয়ে মোট ২৯ জনের এই শক্তিশালী দল বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারে যে ভূমিকা রেখেছেন, তা ইতিহাসে আলোচিত হবে।
শফিকুল আলমের ভাষায়, তাঁরা সবাই এ দেশের গর্বিত সন্তান। পতাকা ছাড়াই তাঁরা দেশে থাকবেন এবং দেশকে এগিয়ে নিতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাবেন। বঙ্গভবনের শপথ অনুষ্ঠান শেষে পতাকাবিহীন গাড়িতে করে যখন তাঁরা নিজ নিজ নীড়ে ফিরবেন, তখন হয়তো তাঁদের মনে থাকবে এক চরম প্রশান্তি এবং একটি সংকটকালে রাষ্ট্রকে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার তৃপ্তি।
জেএইচআর