আমার সংবাদ ডেস্ক
জুলাই ২৬, ২০২৬, ০৮:২০ এএম
রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা দূর করতে বাস চলাচলে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, একই সড়কে একাধিক কোম্পানির বাস চলাচল সীমিত করা হবে। ফলে যাত্রী টানাটানি, বেপরোয়া প্রতিযোগিতা এবং অবৈধভাবে রুট পরিচালনার মতো সমস্যার অবসান ঘটানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) রাজধানীর বাস রুট পুনর্বিন্যাসের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। বর্তমানে সচল প্রায় ৯৮টি রুটকে পুনর্গঠন করে সার্কুলার ও কমিউটার সার্ভিসসহ প্রায় ৬০টি রুটে সীমাবদ্ধ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩২টি রুট নিয়ে ইতোমধ্যে ডিটিসিএ, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং বাস মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে নীতিগত সমঝোতা হয়েছে। বাকি রুটগুলোর কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নতুন রুট কাঠামো বাস্তবায়িত হলে একই পথে অপ্রয়োজনীয় বাস চলাচল কমবে, যানজট হ্রাস পাবে এবং নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী বাস পরিচালনা সহজ হবে। পাশাপাশি যাত্রীদের অপেক্ষার সময় কমে সেবার মানও উন্নত হবে।
ডিটিসিএর জরিপে দেখা গেছে, রাজধানীতে বাস্তবে বাস চলাচল করছে মাত্র ৯৮টি রুটে। অথচ বিআরটিএর অনুমোদিত রুটের সংখ্যা ৪১৮। এর মধ্যে বৈধ রুট পারমিট রয়েছে মাত্র ৮০টির। এছাড়া অনুমোদন ছাড়াই ১৬টি রুটে বাস চলাচল করছে এবং হাতিরঝিলে রয়েছে দুটি সার্কুলার রুট। এই অসামঞ্জস্যই নগর পরিবহনের বড় সংকটগুলোর একটি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পরিচালিত চার মাসের জরিপে ২৫ হাজার মানুষের মতামত নেওয়া হয়। এতে অংশ নেন ৫ হাজার অফিসগামী, ১০ হাজার শিক্ষার্থী এবং ১০ হাজার মেট্রোরেল ব্যবহারকারী। জরিপে উঠে আসে, ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩৭ লাখ মানুষ বাসে যাতায়াত করেন। সবচেয়ে বেশি যাত্রী চলাচল হয় উত্তরা-গাজীপুর, সাভার, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান ও সদরঘাট করিডরে।
ডিটিসিএর পর্যবেক্ষণে আরও দেখা গেছে, রাজধানীর অনেক বাস রুট ৩০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ, যা নগর পরিবহনের জন্য কার্যকর নয়। তাই নতুন পরিকল্পনায় রুট ছোট করা, একটি করিডরে সীমিতসংখ্যক অপারেটর রাখা এবং প্রয়োজন ছাড়া রুটের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
যানজটের আরেকটি বড় কারণ হিসেবে বাস টার্মিনাল ও ডিপোর সংকট চিহ্নিত করেছে ডিটিসিএ। বর্তমানে যাত্রাবাড়ী, সদরঘাট, মোহাম্মদপুর, রিং রোড, মিরপুর-১২, আবদুল্লাহপুর, টঙ্গী ও মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়কের ওপর বাস পার্কিং করা হয়, এতে রাস্তার কার্যকর প্রস্থ কমে যায়। এ সমস্যা সমাধানে নতুন টার্মিনাল ও ডিপো নির্মাণ, পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা এবং শহরের কেন্দ্রের বাইরে রুটের শুরু ও শেষ প্রান্ত নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক মতবিনিময় সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয়েছে, বর্তমানে চালু নেই—এমন অনুমোদিত বাস রুট বাতিল করা হবে। একই সঙ্গে ফিটনেসবিহীন এক হাজারের বেশি বাস পর্যায়ক্রমে সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। রুট চূড়ান্ত হওয়ার পর নির্ধারণ করা হবে কোন কোম্পানি কোন রুট পরিচালনা করবে। নীতিগতভাবে একটি রুটে একটি অপারেটর রাখার পরিকল্পনা রয়েছে এবং প্রতিটি রুটে প্রয়োজন অনুযায়ী বাসের সংখ্যাও নির্ধারণ করা হবে।
এ বিষয়ে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে বাস রুট রেশনালাইজেশন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে এটি সফল করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সুস্পষ্ট ব্যবসায়িক মডেল এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। তার মতে, নির্ধারিত রুট, স্টপেজ, সময়সূচি ও গতিসীমা মেনে বাস পরিচালনা নিশ্চিত করা গেলে রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।
এএন