বিশেষ প্রতিবেদন
জানুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০৬:২০ পিএম
আইনের চোখে তিনি একজন অভিযুক্ত, নিষিদ্ধ সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার দায়ে কারাবন্দী। কিন্তু মানবিকতার নিক্তিতে তিনি একজন পিতা ও স্বামী, যিনি শেষবার তার প্রিয়তমা স্ত্রী এবং ৯ মাস বয়সী আদরের সন্তানের মুখ দেখার অধিকার রাখেন। বলছিলাম যশোর কারাগারে বন্দী ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দামের কথা। স্ত্রী-সন্তানের জানাজায় অংশ নিতে না পারা এবং কারাফটকে অ্যাম্বুলেন্সে রাখা নিথর মরদেহের সামনে তার কান্নার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ‘প্যারোলে মুক্তি’র অধিকার ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিয়ে।
‘প্যারোল’ শব্দটির উৎপত্তি ফরাসি ভাষা থেকে, যার আভিধানিক অর্থ ‘প্রতিশ্রুতি’। আইন ও বিচারিক পরিভাষায় এর অর্থ হলো সুনির্দিষ্ট কিছু শর্ত মেনে কোনো বন্দীকে কারাগারের বাইরে যাওয়ার সাময়িক সুযোগ দেওয়া। এটি কোনো স্থায়ী মুক্তি নয়, বরং বিশেষ মানবিক কারণে সরকার বা প্রশাসন প্রদত্ত একটি সুযোগ।
বাংলাদেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রণীত ২০১৬ সালের ১ জুনের নীতিমালা অনুযায়ী প্যারোল পরিচালিত হয়। মূলত বন্দীর অতি নিকটাত্মীয় (বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন ও শ্বশুর-শাশুড়ি) মারা গেলে জানাজা বা শেষকৃত্যে অংশ নিতে এই সাময়িক মুক্তি দেওয়া হয়।
প্যারোলে মুক্তির আবেদনের অনুমোদন দেওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা থাকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের (জেলা প্রশাসক) হাতে।
বন্দী যে জেলায় আছেন: যদি কোনো বন্দী যে জেলায় বন্দী আছেন, সেই জেলার ভেতরেই প্যারোলে যেতে চান, তবে সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তা মঞ্জুর করতে পারেন।
ভিন্ন জেলায় যাতায়াত: বন্দী এক জেলায় আছেন কিন্তু তার গন্তব্য অন্য জেলায়, এমন ক্ষেত্রে গন্তব্যের দূরত্ব এবং নিরাপত্তা বিবেচনা করে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
জুয়েল হাসানের বাড়ি বাগেরহাটে হলেও তিনি বর্তমানে বন্দী আছেন যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে। গত শুক্রবার তার স্ত্রী ও ৯ মাস বয়সী শিশুসন্তানের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। স্বজনদের দাবি, জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য তারা প্যারোলের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে মুক্তি দেওয়া হয়নি।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসনের দাবি, আবেদনকারীরা ভুল জায়গায় আবেদন করেছিলেন। যেহেতু বন্দী যশোরে আছেন, তাই আবেদনটি যশোর জেলা প্রশাসক বা জেল সুপারের কাছে হওয়া উচিত ছিল। অন্যদিকে যশোরের কারা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তাদের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক আবেদন পৌঁছায়নি।
এই আমলাতান্ত্রিক ‘ঠেলাঠেলি’র চরম মূল্য দিতে হয়েছে জুয়েলকে। শেষ পর্যন্ত মৃত স্ত্রী-সন্তানের জানাজায় যাওয়া তো দূরে থাক, স্বজনেরা নিথর মরদেহগুলো কারাগারের ফটকে নিয়ে গেলে তবেই তিনি শেষবারের মতো তাদের মুখ দেখার সুযোগ পান।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, প্যারোলে মুক্তির ক্ষেত্রে কিছু কঠোর নিয়ম মানতে হয়:
সময়সীমা: সাধারণত কোনো বন্দীকে ১২ ঘণ্টার বেশি সময় কারাগারের বাইরে রাখার অনুমতি দেওয়া হয় না। মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ দূরত্ব ও নিরাপত্তা বুঝে এই সময় কমিয়ে দিতে পারেন।
নিরাপত্তা বেষ্টনী: প্যারোলে মুক্তি পাওয়া বন্দীকে কারাগারের ফটক থেকে পুলিশ পাহারায় নেওয়া হয়। সার্বক্ষণিক পুলিশি নজরদারিতে থেকে কাজ শেষ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুনরায় কারাগারে ফিরতে হয়।
বিশেষ ক্ষমতা: একমাত্র সরকার চাইলে বিশেষ ক্ষেত্রে এই ১২ ঘণ্টার সময়সীমা বাড়াতে বা কমাতে পারে। আদালতের আদেশেও বিশেষ প্যারোল মঞ্জুর হতে পারে।
জুয়েল হাসান সাদ্দাম নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত থাকলেও তার পারিবারিক বিয়োগান্তক ঘটনায় প্যারোল না পাওয়া নিয়ে মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্যারোল মূলত একটি মানবিক বিষয়। এখানে বন্দীর রাজনৈতিক পরিচয় বা অভিযোগের চেয়েও বড় হওয়া উচিত মানবিক সংকট।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে যখন বলা হয় ‘আবেদন ভুল জায়গায় হয়েছে’, তখন প্রশ্ন ওঠে— একটি শোকাতুর পরিবার যখন শোকে স্তব্ধ, তখন তাদের আইনি মারপ্যাঁচ বা কোন জেলার ডিসির কাছে যেতে হবে, তা বুঝিয়ে বলা বা দ্রুত সমন্বয়ের দায়িত্ব কি প্রশাসনের ছিল না?
জুয়েল হাসান সাদ্দামের ঘটনাটি বাংলাদেশের জেল কোড এবং প্যারোল নীতিমালার প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে ভাববার অবকাশ তৈরি করেছে। একদিকে যেমন প্রশাসনের ত্বরিত সিদ্ধান্তের অভাব লক্ষ্য করা গেছে, অন্যদিকে আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়ার অভিযোগও উঠেছে। প্যারোলে মুক্তির প্রক্রিয়াটি যদি আরও সহজতর এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হতো, তবে হয়তো একজন পিতাকে তার সন্তানে জানাজা থেকে বঞ্চিত হতে হতো না। শেষ পর্যন্ত কারাগারের লোহার গারদের ওপাশে স্ত্রী-সন্তানের নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে থাকার সেই দৃশ্যটি কেবল জুয়েলের ব্যক্তিগত শোক নয়, বরং বিদ্যমান ব্যবস্থার এক করুণ প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এএন