রুহেল হাশেমী
জুলাই ২৩, ২০২৬, ১২:১৫ এএম
ঢাকা মহানগরীজুড়ে অপরাধ দমন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার লক্ষ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) তাদের ধারাবাহিক ও জোরদার অভিযান অব্যাহত রেখেছে। গত ২৪ ঘণ্টার সার্বিক কার্যক্রমে উঠে এসেছে কামরাঙ্গীরচরের চাঞ্চল্যকর ডাকাতি মামলার প্রধান পরিকল্পনাকারীসহ চারজনের গ্রেপ্তারের খবর, ট্রাফিক পুলিশের অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার, বাড্ডা থানার এক কিশোরী নিখোঁজের ঘটনা, পরিত্যক্ত আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার এবং মাদক ও ছিনতাই বিরোধী অভিযানে ব্যাপক সফলতা।
রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি চাঞ্চল্যকর ডাকাতির ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করেছে কামরাঙ্গীরচর থানা পুলিশ। পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চোখ কপালে তোলার মতো তথ্য। ভিকটিম পরিবারের ঘনিষ্ঠ ও একই ভবনের বাসিন্দা এক গৃহবধূর সরাসরি পরিকল্পনা ও নেতৃত্বেই এই রোমহর্ষক ডাকাতি সংঘটিত হয়। এই ঘটনার সাথে জড়িত মূল পরিকল্পনাকারীসহ চারজনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গত ১৮ জুলাই সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টা ২৫ মিনিট থেকে ৭টা ৫০ মিনিটের মধ্যে কামরাঙ্গীরচর থানাধীন মাহদীনগর এলাকার রক্সি গলি সংলগ্ন একটি ১০ তলা ভবনের একটি ফ্ল্যাটে এই দুর্ধর্ষ ঘটনাটি ঘটে। ‘বাসা ভাড়া নেয়া’র অজুহাতে মোট পাঁচজনের একটি সংঘবদ্ধ ডাকাত দল ওই ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে। ফ্ল্যাটে উপস্থিত তিনজন নারীর ওপর অতর্কিতে হামলা চালিয়ে তাদের হাত-পা বেঁধে বেধড়ক মারধর করা হয়।
এরপর ডাকাতরা বাসা থেকে নগদ প্রায় ২০ লাখ টাকা, তিন ভরি ওজনের স্বর্ণালঙ্কার এবং চারটি মোবাইল ফোন লুট করে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। খবর পাওয়ার সাথে সাথেই কামরাঙ্গীরচর থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং অপরাধীদের শনাক্তে মাঠে নামে। ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ।
গতকাল বুধবার গভীর রাতে (আনুমানিক রাত ১২টা) মুসলিমবাগ এলাকা থেকে প্রথমে মো. সজীব আলম (২৯) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মো. রিপন মিয়াকে (৪২)। রিপনের বাসার ওয়ারড্রবের ড্রয়ার থেকে লুণ্ঠিত নগদ ১ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে তাদের দেয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী চাঁদ মসজিদ এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. ফারুক খানকে (৫০) গ্রেপ্তার করা হয়।
ফারুকের ভাড়া করা বাসার শয়নকক্ষ থেকে আরও নগদ ১ লাখ টাকা এবং ডাকাতি হওয়া সমস্ত স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে বের হয়ে আসে এই ঘটনার মাস্টারমাইন্ডের নাম- জিয়াসমিন ওরফে জেসমিন (৩৭)। জিয়াসমিন ভিকটিমদের ভবনেরই ৭ম তলায় বসবাস করতেন। ভিকটিমমর পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক থাকার সুযোগে তিনি জানতেন যে ওই বাসায় মোটা অঙ্কের নগদ টাকা গচ্ছিত আছে। এই লোভেই তিনি পরিচিত অপরাধীদের সাথে নিয়ে ডাকাতির পরিকল্পনা আঁকেন।
ঘটনার দিন জিয়াসমিন নিজে নিচ তলা থেকে ডাকাত দলকে ভবনে ঢুকিয়ে দেন এবং ডাকাতি শেষে তাদের নিরাপদে বের হয়ে যেতে সাহায্য করেন। অপরাধ ঢাকতে তিনি ঘটনা শেষে নিজেই ভুক্তভোগীদের বাসায় গিয়ে সান্ত্বনা দেন এবং পুলিশি ঝামেলা থেকে বাঁচতে মামলায় নিজেকে সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। উদ্ধারকৃত মালামালের মধ্যে রয়েছে নগদ অর্থ ২ লাখ ২০ হাজার টাকা।
স্বর্ণালঙ্কারের মধ্যে রয়েছে ১ জোড়া সোনার দুল, ১ জোড়া বালা, ১টি ব্রেসলেট, ১ জোড়া চুড়ি, ১ জোড়া ঝুমকা এবং ১ জোড়া পাশা। এই ঘটনায় মোট ৮ জন জড়িত ছিল বলে জানা গেছে। মূল পরিকল্পনাকারী জিয়াসমিনসহ ৪ জন গ্রেপ্তার হলেও বাকিদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
রাজধানীর রাস্তায় কেবল ট্রাফিক শৃঙ্খলাই নয়, অপরাধ প্রতিরোধেও সতর্ক ভূমিকা রাখছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রবেশমুখ যাত্রাবাড়ীর ধোলাইপাড় এলাকায় ট্রাফিক পুলিশের বুদ্ধিমত্তা ও তৎপরতায় ২০০ বোতলের কাছাকাছি ফেনসিডিলসহ একটি প্রাইভেটকার জব্দ করা হয়েছে।
গতকাল বুধবার সকাল আনুমানিক ৮টায় ধোলাইপাড় মোড়ে দায়িত্ব পালনকালে ট্রাফিক যাত্রাবাড়ী জোনের সদস্যরা একটি সন্দেহভাজন প্রাইভেটকারকে থামার নির্দেশ দেন। পুলিশের সংকেত অমান্য করে গাড়িটির চালক দ্রুত গতিতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ট্রাফিক সদস্যরা সেটিকে ধাওয়া করেন। ধাওয়া খেয়ে চালকসহ মোট তিনজন যাত্রী গাড়িটি চলন্ত অবস্থায় রাস্তায় ফেলে রেখে দৌড়ে পালিয়ে যায়।
পরে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ ও ট্রাফিক সদস্যরা প্রাইভেটকারটিতে তল্লাশি চালিয়ে ১৯৯ বোতল অবৈধ ফেনসিডিল, মাদক বহনে ব্যবহূত প্রাইভেটকার, ২টি মোবাইল ফোন এবং গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র জব্দ করে। পলাতক মাদক ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত ও গ্রেপ্তারের জন্য যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ আইনি প্রক্রিয়া ও অভিযান পরিচালনা করছে।
ঢাকা মহানগর এলাকায় ট্রাফিক শৃঙ্খলা নিশ্চিতকরণ এবং ফিটনেসবিহীন ও অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অভিযান কঠোরভাবে পরিচালিত হচ্ছে। গত মঙ্গলবার দিনভর রাজধানীর বিভিন্ন ট্রাফিক বিভাগে পরিচালিত অভিযানে মোট ২,৭১৯টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ডিএমপি জানিয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ ও যানজট নিরসনে এমন আইনি পদক্ষেপ ও অভিযান নিয়মিতভাবে চালু থাকবে।
রাজধানীর ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা কারওয়ান বাজারে ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে একত্রিত হওয়া ৫ জন সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট।
গত মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ১১টা ৫০ মিনিটে তেজগাঁও থানাধীন কারওয়ান বাজার এলাকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- রায়হান (২০), মো. নূর আলম (২৫), মো. হূদয় (২৬), মো. মেহেদী হাসান (৩৮) ও মো. জুয়েল (৩০)।
সিটিটিসির ট্রান্সন্যাশনাল বিভাগের আভিযানিক দল জানায়, কয়েকজন দুষ্কৃতকারী পথচারীদের সর্বস্ব লুটে নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে- এমন তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই ঝটিকা অভিযান চালিয়ে এই ৫ জনকে হাতেনাতে পাকড়াও করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট ৩৮৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিভিন্ন থানায় দায়ের করা হয়েছে ৪৫টি পৃথক মামলা। বিভাগভিত্তিক গ্রেপ্তারের চিত্র দেখা যায়- তেজগাঁও বিভাগে ৫৬ জন, মিরপুর বিভাগে ৯৩ জন, মতিঝিল বিভাগে ৪৯ জন, ওয়ারী বিভাগে ৪৯ জন, উত্তরা বিভাগে ৪১ জন, গুলশান বিভাগে ৩৪ জন, রমনা বিভাগে ৩১ জন, লালবাগ বিভাগে ২৬ জন ও গোয়েন্দা (ডিবি) বিভাগে ৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অভিযানকালে গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে ১১ হাজার ৮৫০ পিস ইয়াবা, ৪৭ কেজি গাঁজা, ৪টি মোবাইল ফোন, ১০ বস্তা ক্ষতিকারক পলিথিন, ১টি ইঞ্জিনচালিত ভ্যান এবং মাদক বিক্রির নগদ ১০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।
রাজধানীর বাড্ডা থানাধীন আফতাবনগর বাঘাপুর এলাকা থেকে সাথী আক্তার শান্তনা নামের ১৩ বছরের একটি কিশোরী নিখোঁজ হয়েছে। গত ২১ জুলাই সকাল ৭টার সময় নিজ বাসার নিচ থেকে সে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়। পরিবারের স্বজনরা সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান না পাওয়ায় বাড্ডা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-২০৪৫, তারিখ, ২২/০৭/২০২৬) দায়ের করেছেন।
রাজধানীর মিরপুর মডেল থানা ভবন সংলগ্ন পেছনের ঝোপঝাড় এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি জং ধরা আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে থানা পুলিশ। গতকাল বুধবার সকাল ১০টা ৪৫মিনিটে নিয়মিত তল্লাশির অংশ হিসেবে বা খবরের ভিত্তিতে থানার পেছনের জঙ্গল থেকে অস্ত্রটি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত অস্ত্রটি একটি পরিত্যক্ত জং ধরা ‘চায়না রাইফেল, যার বাট নম্বর ২১৩৬। অস্ত্রটি কীভাবে বা কারা সেখানে ফেলে গেছে, তা খতিয়ে দেখতে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এছাড়া রাজধানীজুড়ে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও মাদকের মতো সামাজিক ব্যাধি দমনে ডিএমপির ট্রাফিক, সিটিটিসি ও থানা পুলিশের সম্মিলিত এই তৎপরতা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অপরাধ দমনে পুলিশের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের সচেতনতার ওপরও জোর দিচ্ছে প্রশাসন।