Amar Sangbad
ঢাকা সোমবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

অদম্য প্রতিবন্ধী-অনগ্রসরদের পাশে সমাজকল্যাণ সচিব

বেলাল হোসেন

সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২২, ০২:০৪ এএম


অদম্য প্রতিবন্ধী-অনগ্রসরদের পাশে সমাজকল্যাণ সচিব

সমাজের দুস্থ প্রতিবন্ধী, অসহায় অনগ্রসররা সর্বদাই জীবনের সাথে যুদ্ধ করে টিকে আছে। তাদের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। প্রতিবন্ধীদের সবস্তরে হয়তো পুরোপুরি সহায়তা না দিতে পারলেও মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পাশাপাশি কাজ করে যাচ্ছেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম। নারায়ণগঞ্জের অদম্য ছেলে মোরসালিন। যার নেশা পড়াশোনা করে কিছু একটা করা।

তবে তার সাথে বাধ সাজে শারীরিক প্রতিবন্ধিতা। বাবা-মায়ের আদরের মধ্যমণি সে। জন্মের দুই বছর পর থেকে ছোট্ট মোরসালিনের পায়ের দিকটা সরু হতে থাকে। তার ডান হাতটাও কেমন যানি হয়ে যায়। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে এমন অবস্থা দেখে ঘাবড়ে যায় পরিবারটি। ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করলে তারা জানতে পারেন মোরসালিন টায়ফয়েডে আক্রান্ত এবং তার একটি কিডনিতে পানি জমেছে। এ খবর শুনে তার (বাবা-মায়ের) মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে।

পরিবার থমকে দাঁড়ায়, কি করবে ভেবে পাচ্ছিলেন না তার মা। এক সময় অনেক কষ্টে তার (মোরসালিনের) একটি কিডনি বাদ দিয়ে কোনোরকমে তাকে সুস্থ করে তোলা হয়। এরপর থেকে তার পরিবারের নতুন যুদ্ধ শুরু হয়। মোরসালিনকে কেউ দেখলে মনে হবে না সে প্রতিবন্ধী। তবে সে ভারী কিছু উঠাতে পারে না। তার স্কুলে যাওয়া থেকে শুরু অনেক কাজেই পরিবারের সদস্যদের সাহায্য নিয়ে চলতে হয়।

মায়ের হাত ধরে স্কুল যাওয়া-আসা। প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকায় সে সবসময় মায়ের কাছে বায়না ধরত— ‘আমাকে ভালো করে পড়তে হবে। বড় হতে হবে।’ এ ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মানে মোরসালিনের মা। আর্থিক টানাপড়েনেও তার পড়াশোনা চালিয়ে যান। পাড়া-প্রতিবেশী, স্কুলের শিক্ষকদের কাছে মাঝে মধ্যে নানান কথা শুনতে হয়েছে তার পরিবারকে। তবে দমে যায়নি মোরসালিন ও তার পরিবার। অদম্য গতিতে এগিয়ে চলেছে মোরসালিন। ২০১৯ সালে এসএসসি পাস করে।

এরপর এইচএসসি পরীক্ষায় শুরু হয় যুদ্ধ। এখানেও পাস করে উচ্চ শিক্ষার জন্য চেষ্টা করতে থাকে সে। শারীরিক প্রতিবন্ধিতার জন্য তার লেখা বরাবরই অন্যদের চেয়ে একটু স্লথগতির। সাত কলেজের ভর্তিপরীক্ষার ফরম পূরণে প্রতিবন্ধীর কথা উল্লেখ করলেও তাকে এক্সট্রা সময় দেয়া হয়নি। সে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে মাত্র তিন মার্ক কম পায়। ভেস্তে যায় সাত কলেজের ভর্তির আশা। মোরসালিন ভর্তির হাল ছাড়তে নারাজ। চেষ্টা করতে থাকে বিভিন্ন মাধ্যমে।

এক সময় সে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলমের সাথে দেখা করে। সচিবকে তার বিষয়ে জানানো পর সব দিক বিবেচনা করে তাকে বেসরকারি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির জন্য ব্যবস্থা করেন। জানা গেছে, সচিব তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে মোরসালিনকে অনার্সে ভর্তি ও বিনামূল্যে পড়াশোনার ব্যবস্থা করিয়ে দেন।  

সচিবের মহানুভবতা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে মোরসালিন আমার সংবাদকে বলেন, ‘সচিব স্যারের প্রতি আমি ও আমার পরিবার চিরকৃতজ্ঞ। আমি পড়াশোনা করে স্যারের মতো সরকারি কর্মকর্তা হয়ে সমাজের পিছিয়ে পড়া প্রতিবন্ধীদের জন্য কাজ করব। আর যেন কেউ আমার মতো এ রকম সমস্যার মধ্য দিয়ে না যায়।’ সমাজের সবাই যেন প্রতিবন্ধীদেরও মানুষ ভাবে। সহানুভূতি করে এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন মোরসালিন।

আরেক মেধাবী রংপুর মিঠাপুকুরের লিমন মিয়া। পারিবারিক অর্থকষ্টেও তাকে হার মানাতে পারেনি। চান্স পায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদে। তবে অর্থাভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় পড়ে যায় সে। লিমনকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য সমাজকল্যাণ সচিব নগদ অর্থ দেন এবং অর্থের অভাবে যেন পড়াশোনা বন্ধ না হয় সে আশ্বাসও দেন সরকারের এ কর্মকর্তা।

সম্প্রতি বেশ কিছু শিশুর পাশে দাঁড়ান সচিব। গত মাসে হাইড্রোসেফালাস (মস্তিষ্কে অতিরিক্ত পানি) রোগে আক্রান্ত চার মাস বয়সি শিশু আম্বিয়ার রাজধানীর শিশু হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করান সমাজকল্যাণ সচিব। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ বাচ্চার জন্য সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলেও জানান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম বিশেষ সাক্ষাৎকারে আমার সংবাকে বলেন, ‘সমাজের অনগ্রসর পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বর্তমান সরকার কাঠামোগত পদ্ধতিতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ব্যাপক কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এখনো শতভাগ লোককে ভাতার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। ২৬৫ উপজেলায় শতভাগ বয়স্ক ভাতার ব্যবস্থা হাতে নেয়া হয়েছে। আরো বয়স্কভাতা, বিধবাভাতা, স্বামী পরিত্যক্ত ভাতা দেয়া নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। একই সাথে আমরা প্রতিবন্ধী ভাতা নিয়ে কাজ করছি। এ অর্থবছর ২৩ লাখ ৬৫ হাজার প্রতিবন্ধীকে ভাতা দেয়া হবে।  ইতোমধ্যে আমরা জরিপ করেছি প্রায় ২৯ লাখের বেশি প্রতিবন্ধী দেশে আছে। প্রধানমন্ত্রী এ বছরই সবাইকে ভাতার আওতায় নিয়ে আসবেন বলে সচিব আশা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, হিজড়া, বেদে সম্প্রদায়, চা-শ্রমিকদের স্বাভাবিক জীবনযাপন নিয়েও কাজ করে যাচ্ছে সরকার। হয়তো শতভাগ না হলেও যারা বেশি সমস্যাগ্রস্ত তাদের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সরকারের বরাদ্দ সঠিক বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।

সমাজকল্যাণ সচিব বলেন, এই সমাজের এমনো নিগৃহীত, নির্যাতিত, অভাবি জনগণ আছে যারা  আমাদের সাহায্য প্রক্রিয়ার মধ্যে আসতে পারে না। তখন এটি যেকোনো সংবাদ মাধ্যম বা কারো মাধ্যমে আমরা জানতে পারলে তাৎক্ষণিক তার ব্যবস্থা নিচ্ছি।

এর উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, চাপাইনবাগঞ্জের শিশু আম্বিয়া তার খবরটা আমি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে পাই। এরপর শিশুটির বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।

সচিব বলেন, অপারেশনের পর শিশু আম্বিয়া এখন সুস্থ আছে। তাকে আমি এবং আমাদের স্টাফরা মিলে ব্যক্তিগত অর্থ দিয়েও সাহায্য করেছি। গত কয়েকদিন আগে নারায়ণগঞ্জের প্রতিবন্ধী ছাত্র মোরসালিন তার মাকে সাথে নিয়ে আমার সাথে দেখা করতে আসে। উচ্চ শিক্ষার জন্য সে কোথাও চান্স পায়নি।

সচিব বলেন, আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেসরকারি ইউনিভার্সিটিতে সম্পূর্ণ বিনা খরচে অনার্স পড়ার ব্যবস্থা করে দিই। এ ছাড়াও রংপুর মিঠাপুকুরের মেধাবী লিমন মিয়াকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য নগদ অর্থ দিয়ে সহায়তা করি।  

তিনি আরও বলেন, আমি হয়তো সবাইকে এভাবে সহায্য করতে পারব না, তবে আমরা নজরে এলে আমি যথা সম্ভব চেষ্টা করে যাব।

মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে অনেক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সবাই মিলে সমাজের অভাবি, অনগ্রসর মানুষের জন্য কাজ করলে কেউ অনাহারে, অর্ধাহারে থাকবে না বিনাচিকিৎসায় মারা যাবে না বলে জানান সচিব। বর্তমানে এ লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।  

Link copied!