জুন ১৯, ২০২৩, ১১:৩০ পিএম
- এনসিটিবির ১৮৫ কর্মদিবস পালন হচ্ছে না
- ৪০-৪৫ দিনের ক্লাসে সেমিস্টার পরীক্ষা
- সিলেবাস শেষ করতে পারেন না শিক্ষকরা
- অধিকাংশ শিক্ষার্থী প্রাইভেট কোচিংয়ে নির্ভরশীল
২০২৫ সালে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন হলে এ সমস্যা কমে আসবে
—প্রফেসর মো. মশিউজ্জামান, সদস্য (শিক্ষাক্রম), এনসিটিবি
শিক্ষার্থীদের ক্লাসের ঘাটতি পূরণে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে হবে
—ড. তারিক আহসান, অধ্যাপক, ঢাবি
শিক্ষার্থীরা শিক্ষার মূল পাঠ পায় বিদ্যালয়ে। ক্লাসরুমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধুর সম্পর্কের মাধ্যমে অর্জিত হয় জ্ঞান। কিন্তু এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র থাকা প্রতিষ্ঠানে সেই সুযোগ কম থাকে। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ছুটিতে থাকে আট মাসেরও বেশি। ৪০ থেকে ৪৫ দিনের ক্লাসে হয় সেমিস্টার পরীক্ষা। ফলে সিলেবাস শেষ করতে পারেন না শিক্ষকরা। অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট বা কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। এ নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। অভিভাবকরা বলেন, বিদ্যালয় ঠিকমতো ক্লাস না হলে শিক্ষার্থীরা শিখবে কীভাবে? এনসিটিবি জানিয়েছে, দেশের মাত্র চার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা কেন্দ্র থাকে। বাকি ২০ হাজার প্রতিষ্ঠানের কথা চিন্তা করে তারা সিদ্ধান্ত নেন। ২০২৫ সালে সম্পূর্ণভাবে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন হলে এ সমস্যা কমে আসবে বলে মনে করছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড-এনসিটিবি। আর শিক্ষাবিদরা বলছেন, পর্যাপ্ত ক্লাস না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্লাসের ঘাটতি পূরণে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে হবে বলেও মনে করছেন তারা।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি ছুটি ৭১ দিন। শুক্র ও শনিবারের ছুটি মিলিয়ে ১০৪ দিন। মোট ছুটি ১৭৫ দিন। এ ছাড়া ২০২৩ সালের এসএসসি পরীক্ষা ৩০ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে ২৩ মে পর্যন্ত। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ২৮ মে পর্যন্ত পরীক্ষা হয়। মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ থাকে প্রায় এক মাস। ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষা হবে ১৭ আগস্ট থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এইচএসসি পরীক্ষা উপলক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৪০ দিনের বেশি বন্ধ থাকবে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা উপলক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে মোট ৬৫-৭০ দিন। এনসিটিবি জানিয়েছে, ২০২৩ সালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মদিবস নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮৫ দিন। জানা যায়, পরীক্ষার কেন্দ্র থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ১১৫ দিনের কম কর্মদিবস পায়। এর মধ্যে দুই সেমিস্টার পরীক্ষায় যায় ৩০ থেকে ৩৫ দিন। বাকি ৮০ থেকে ৮৫ দিনের ক্লাস পান শিক্ষার্থীরা। এই স্বল্প ক্লাসে সিলেবাস শেষ করতে পারছেন না শিক্ষকরা।
যাত্রাবাড়ির শহীদ জিয়া গার্লস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিভাবক মেহরাবুল ইসলাম এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, এমনিতেই সরকারিভাবে স্কুল সপ্তাহে দুদিন বন্ধ। এরপর বিভিন্ন উপলক্ষে তো বন্ধ আছে। আবার সেন্টার পরীক্ষা হলেও বন্ধ থাকে। এভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো চলছে। একজন শিক্ষার্থী যদি স্কুল থেকে শিখতে না পারে সে কোথা থেকে শিখবে? কীভাবে শিখবে? বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধামিশ্রিত ভয় থাকে। শিক্ষকদের পড়ানো থেকেই ওদের অর্ধেক পড়া হয়ে যায়। যাদের সামর্থ্য আছে প্রাইভেট বা কোচিংয়ে পড়াচ্ছেন। আর কেউ কেউ নিজ চেষ্টায় পড়ছেন। রাজধানীর সূত্রাপুর এলাকার মনিজা রহমান স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিভাবক আব্দুল হাই বলেন, আমরা ছোটবেলায় পড়াশোনা করেছি। তখন স্কুল এত বন্ধ থাকত না। কয়েক দিন পরপরই দেখি সন্তানরা বাসায় বসে থাকে। শিক্ষকদের সংস্পর্শ না পেলে ওরা শিখবে কোথা থেকে? স্কুলের পরিবেশ তো কোচিং বা প্রাইভেট থেকে পাওয়া যাবে না। কোচিংয়েই যদি শিখতে পারে তাহলে স্কুলে পাঠাব কেন?
এ বিষয়ে জানতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (মাধ্যমিক) মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন বলেন, প্রতিষ্ঠানের শ্রেণি কার্যক্রম দেখার দায়িত্ব আমার না। এটি এনসিটিবি দেখে। তাদের নির্দেশনার আলোকে আমরা বাস্তবায়ন করি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটির ব্যাপারে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) শিক্ষাক্রম বিভাগের সদস্য প্রফেসর মো. মশিউজ্জামান আমার সংবাদকে বলেন, আমরা ১৮৫ কর্মদিবস হিসাব করেই পাঠ্যক্রম সাজিয়েছি। এর মধ্যে জাতীয় দিবসসমূহকেও এবার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গতবার ছিল ১৮৪ দিন। সপ্তাহে দুদিন বন্ধ মূলত সমস্যা না। নতুন কারিকুলামে আমাদের শিক্ষার্থীরা সবসময় শেখার সুযোগ পাবে। বন্ধের দিনগুলোতে তারা বিভিন্ন স্থান থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য যাবে।
এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটিতে থাকার ব্যাপারে এনসিটিবির এ কর্মকর্তা বলেন, আমাদের মোট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৪ হাজারের বেশি। এর মধ্যে মাত্র চার হাজার প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা নেয়া হয়। আমাদের তো ২০ হাজার প্রতিষ্ঠানের কথা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ২০২৫ সালে নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন হলে ১০ দিনেই পরীক্ষা শেষ করা যাবে। তখন সমস্যা কমে আসবে। ক্লাসের ঘাটতি পূরণে ভিন্নভাবে চিন্তা করার কথা জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক ড. তারিক আহসান বলেন, ক্লাস না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানে কতটুকু শেখানো হচ্ছে? কতটুকু ঘাটতি রয়েছে? এর আলোকে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পূরণের জন্য আগামীতে রেমিডিয়ান (ভিন্নভাবে) ক্লাস নিতে হবে। আগামীতে নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীদের বাড়ির কাজ দিতে হবে। যাতে বাসায় বসে কাজ শেষ করতে পারে। এরপর ক্লাসে শিক্ষককে দেখাতে পারে।
