ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

রুগ্ন শিল্পে প্রাণের সঞ্চার

মো. নেয়ামত উল্যাহ

মো. নেয়ামত উল্যাহ

জুলাই ১৫, ২০২৬, ০১:০৩ এএম

রুগ্ন শিল্পে প্রাণের সঞ্চার

দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনা, পুরোনো প্রযুক্তি, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্নীতির গ্যাঁড়াকলে পড়ে যে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প খাত জাতীয় অর্থনীতির জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তা এবার এক নতুন পরিবর্তনের প্রতীক্ষায়। বছরের পর বছর ধরে লোকসান গুনতে থাকা রুগ্ন এবং বন্ধ থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যেন দীর্ঘস্থায়ী এক যন্ত্রণার নামান্তর ছিল। কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সরকার এবার এই রুগ্ন শিল্পে প্রাণ ফেরানোর এক সাহসী ও সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রায় ৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে সচল করার যে মহাপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, তা কেবল বন্ধ থাকা কারখানার চাকা সচল করবে না, বরং দেশের সামগ্রিক শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

প্রায় ১০ হাজার একর অব্যবহূত সরকারি জমি এবং বিদ্যমান অবকাঠামোগত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও এই কারখানাগুলো যে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির বোঝা বহন করছিল, তা থেকে উত্তরণের জন্য সরকার চারটি ভিন্নধর্মী মডেলের প্রস্তাব করেছে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি), রাজস্ব ভাগাভাগি, দীর্ঘমেয়াদি ইজারা এবং শেয়ারহোল্ডিংভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই সম্পদগুলোকে পুনরায় উৎপাদনশীল করে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই উদ্যোগের মাধ্যমে শুধু যে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত লোকসানের হাত থেকে রাষ্ট্র রেহাই পাবে তা নয়, বরং প্রায় ৫৪ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকার এক বিশাল বিনিয়োগ পাইপলাইন তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এটি এমন এক বিনিয়োগ, যা বেসরকারি খাতের গতিশীলতা এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রুগ্ন শিল্পগুলোকে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সফল করে তুলবে।

তবে এই যাত্রা মোটেও নির্বিঘ্ন নয়। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সম্পদ হস্তান্তরেরভয়াবহ স্মৃতি এখনো জনমনে দাগ কেটে আছে। তাই  সরকার এবার অত্যন্ত সতর্ক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এই পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে। শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বিডার নেতৃত্বে অংশীজনদের সাথে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে একটি আইনি কাঠামো তৈরির কাজ চলছে, যেখানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনের ওপর দেয়া হয়েছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব।

অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বেসরকারি হাতে তুলে দিলেই সাফল্য আসবে না; বরং কার হাতে এই দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে এবং তাদের সক্ষমতা কতটুকু- তা কঠোরভাবে যাচাই করা অপরিহার্য। শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা এবং যথাযথ সুরক্ষা শর্তাবলি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই এই রুগ্ন শিল্পে প্রাণের সঞ্চার করা সম্ভব। বর্তমান এই পরিবর্তন যদি সঠিক ও স্বচ্ছ পথে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে, যেখানে রুগ্ন শিল্প আর বোঝা নয়, বরং উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।

সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এই ৪৪টি কারখানার মধ্যে ১১টি আংশিক সচল, দুটি রুগ্ন এবং ৩১টি সম্পূর্ণ বন্ধ বা নতুন প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ, অ্যাটলাস বাংলাদেশ, কর্ণফুলী পেপার মিলস এবং বিভিন্ন চিনিকল ও টেক্সটাইল মিলের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে অদক্ষতা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অপ্রয়োজনীয় জনবল এবং ব্যবস্থাপনা ত্রুটির কারণে বছরে পর বছর লোকসান গুনছে। কাঁচামাল সংগ্রহে অনিয়ম, পুরোনো প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এসব কারখানা বেসরকারি খাতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। ফলে এগুলো এখন রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর বড় ধরনের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত ৮ জুলাই শিল্পমন্ত্রী আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিনিয়োগের চারটি কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেগুলো হলো— ১. পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি): যৌথ অংশীদারিত্বে ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন। ২. রাজস্ব ভাগাভাগি (রেভিনিউ শেয়ারিং): আয়ের নির্দিষ্ট অংশ সরকারের কোষাগারে জমা প্রদান। ৩. দীর্ঘমেয়াদি ইজারা (লং-টার্ম লিজ): নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বেসরকারি খাতের হাতে ব্যবস্থাপনা হস্তান্তর। ৪. শেয়ারহোল্ডিংভিত্তিক ব্যবস্থাপনা: প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের মাধ্যমে মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের বণ্টন।

বিডার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় এসব মডেলের মধ্য থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে, যাতে রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষা পায় এবং বেসরকারি খাতের দক্ষতা কাজে লাগানো যায়।

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপের প্রতিনিধিরা সরকারের এই উদ্যোগে ব্যাপক আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বৈঠকে ট্রান্সকম, আকিজ, প্রাণ-আরএফএল, স্কয়ার এবং ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজের মতো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করে দ্রুত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কারখানা হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকেও আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, আইনি জটিলতা এড়াতে অংশীজনদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে একটি সুরক্ষামূলক নীতিমালা তৈরি করা হবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইউনূস এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জলের দরে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রি করার ভুল যেন আর না হয়।’ তিনি কারখানা হস্তান্তরের আগে উদ্যোক্তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সক্ষমতা কঠোরভাবে যাচাই করার ওপর জোর দিয়েছেন।

এছাড়া শ্রমিকদের চাকরির সুরক্ষা এবং ‘সেফটি ক্লজ’ বা সুরক্ষামূলক শর্তাবলি চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তার মতে, সরকারের ভূমিকা হবে কেবল নিয়ন্ত্রক বা রেগুলেটর হিসেবে, যাতে উদ্যোক্তারা স্বচ্ছ পরিবেশে লাভজনক ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।

পরিশেষে বলা যায়, এই উদ্যোগ কেবল কতগুলো বন্ধ কারখানা সচল করার প্রকল্প নয়, এটি বাংলাদেশের শিল্প খাতকে কাঠামোগতভাবে শক্তিশালী করার একটি সাহসী প্রয়াস। বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকা ১০ হাজার একর মূল্যবান ভূমি এবং অবকাঠামোকে যখন বেসরকারি খাতের দক্ষ ব্যবস্থাপনার সাথে যুক্ত করা হবে, তখন এটি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি শক্তিশালী ‘গ্রোথ ইঞ্জিন’ হিসেবে কাজ করবে।

তবে এই প্রকল্পের চূড়ান্ত সফলতা নির্ভর করছে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা, সঠিক অংশীদার নির্বাচন এবং কার্যকর তদারকির ওপর। অতীতে সরকারি সম্পদ হস্তান্তরের ক্ষেত্রে যে ধরনের অনিয়ম ও ব্যর্থতার ইতিহাস রয়েছে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার সরকারকে প্রতিটি পদক্ষেপে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

পরিকল্পনাটি যদি যথাযথ সততা ও পেশাদারিত্বের সাথে বাস্তবায়িত হয়, তবে রুগ্ন শিল্পগুলো আর রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হয়ে থাকবে না; বরং এগুলো নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনে অনন্য ভূমিকা রাখবে। পরিশেষে, শিল্পবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং বেসরকারি খাতের ওপর অর্পিত দায়িত্বের সঠিক মূল্যায়নই পারবে দেশের রুগ্ন শিল্প খাতে সত্যিকারের প্রাণের সঞ্চার ঘটাতে, যা আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথে এক মাইলফলক হয়ে থাকবে।

Link copied!