মো. নেয়ামত উল্যাহ
জুলাই ১৮, ২০২৬, ০২:২৫ এএম
ঐতিহ্যের প্রাচীন স্থাপত্য আর আধুনিক নগর পরিকল্পনার মেলবন্ধনে এক নতুন রূপ পেতে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকার হূৎপিণ্ড পুরান ঢাকা। চীনের বাণিজ্যিক রাজধানী সাংহাইয়ের আদলে ‘আরবান রি-জেনারেশন’ বা নগর পুনরুজ্জীবন ধারণাকে সামনে রেখে পুরান ঢাকাকে নতুন করে গড়ে তোলার এক মেগা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। শতবর্ষী ঐতিহাসিক স্থাপনা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখেই এই আধুনিক ও পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ইতোমধ্যে একটি প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) প্রস্তুত করে অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন আশা করছে, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী তিন মাসের মধ্যেই মাঠপর্যায়ের প্রাথমিক কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। চীনের হুয়াংপু নদীর তীরে গড়ে ওঠা আধুনিক ও পরিকল্পিত সাংহাই শহরের মতোই সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা পুরান ঢাকার। তবে সাংহাই সময়ের সাথে সাথে নিজেকে আধুনিক ও বাসযোগ্য করে তুললেও, পুরান ঢাকা রয়ে গেছে নানা নাগরিক সমস্যায় জর্জরিত। দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ‘৫২ বাজার ৫৩ গলি’র এই প্রাচীন নগরী এখন ঝুঁকিপূর্ণ ও বসবাসের জন্য চরম অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে।
অতিরিক্ত জনঘনত্ব, অত্যন্ত সংকীর্ণ রাস্তা, তীব্র যানজট, অপরিকল্পিত নর্দমা ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো এখানকার অগ্নিঝুঁকি ও জরুরি সেবার সংকট; কোনো ভবনে আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকার মতো পর্যাপ্ত জায়গা অধিকাংশ গলিতে নেই, এমনকি জরুরি মুহূর্তেকোনো রোগীর জন্য অ্যাম্বুলেন্স চলাচলও প্রায় অসম্ভব।
এই বাস্তবতাকে আমূল বদলে দিয়ে মৃতপ্রায় নগরজীবনে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে আনাই সরকারের এই মেগা প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। হংকং, সাংহাই এবং টোকিওর মতো বিশ্বের বড় বড় মেগা সিটিগুলো যেভাবে নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রেখে আধুনিক রূপ ধারণ করেছে, সেই অভিজ্ঞতাকেই এখানে কাজে লাগানো হবে বলে জানিয়েছে রাজউক। ৫ হাজার ২৫৮ কোটি ৪০ লাখ টাকার এই বৃহৎ প্রকল্পে ছোট ছোট প্লট বা নির্দিষ্ট এলাকা ধরে পরিকল্পিত আবাসন, প্রশস্ত রাস্তা ও উন্মুক্ত স্থান তৈরি করা হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মূল চ্যালেঞ্জ হলো ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সুষম সমন্বয় এবং তা অর্জনে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও স্থানীয় জনগণের সক্রিয় সম্পৃক্ততা।
চীনের হুয়াংপু নদীর তীরে গড়ে ওঠা আধুনিক ও পরিকল্পিত সাংহাই শহরের মতোই সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা পুরান ঢাকার। তবে সাংহাই সময়ের সাথে সাথে নিজেকে আধুনিক ও বাসযোগ্য করে তুললেও, পুরান ঢাকা রয়ে গেছে নানা নাগরিক সমস্যায় জর্জরিত।
দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ‘৫২ বাজার ৫৩ গলি’র এই প্রাচীন নগরী এখন ঝুঁকিপূর্ণ ও বসবাসের জন্য চরম অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিত্যদিনের প্রধান সংকটগুলো হলো— অতিরিক্ত জনঘনত্ব ও সরু রাস্তা: জনসংখ্যা ও ভবনের তুলনায় রাস্তাগুলো অত্যন্ত সংকীর্ণ, যা তীব্র যানজটের মূল কারণ।
অগ্নিঝুঁকি ও জরুরি সেবার সংকট: কোনো ভবনে আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকার মতো পর্যাপ্ত জায়গা অধিকাংশ গলিতে নেই। এমনকি জরুরি মুহূর্তে কোনো রোগীর জন্য অ্যাম্বুলেন্স চলাচলও প্রায় অসম্ভব।
নর্দমা ও নিষ্কাশন সমস্যা: সামান্য বৃষ্টিতেই অনেক এলাকায় পানি জমে থাকে এবং নোংরা পানি নিষ্কাশনের সঠিক ব্যবস্থা না থাকায় বাসিন্দাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।
এই মৃতপ্রায় নগরজীবনে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে আনাই সরকারের এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, হংকং, সাংহাই এবং টোকিওর মতো বিশ্বের বড় বড় মেগা সিটিগুলো যেভাবে নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রেখে আধুনিক রূপ ধারণ করেছে, সেই অভিজ্ঞতাকেই এখানে কাজে লাগানো হবে।
প্রকল্পের মূল বিষয়গুলো হলো— ঐতিহ্য সংরক্ষণ: পুরান ঢাকার শতবর্ষী ঐতিহাসিক ভবন ও সাংস্কৃতিক কাঠামো অক্ষুণ্ন রাখা হবে।
প্লটভিত্তিক ও ব্লকভিত্তিক উন্নয়ন: ছোট ছোট প্লট বা নির্দিষ্ট এলাকা ধরে পরিকল্পিত আবাসন, প্রশস্ত রাস্তা ও উন্মুক্ত স্থান তৈরি করা হবে। বাজেট ও সময়সীমা: পুরান ঢাকার এই পুনর্গঠন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫,২৫৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অনুমোদন মিললে আগামী ৩ মাসের মধ্যে এর কাজ শুরু হতে পারে।
পুরান ঢাকার এই ‘আরবান রি-জেনারেশন’ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও এটি বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ দেখছেন নগর বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এমন মেগা প্রকল্প সফল করা অসম্ভব। নগরবিদ ও পরিবেশকর্মী স্থপতি ইকবাল হাবিব এই মহাপরিকল্পনা নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন: ১. পাইলট প্রকল্পের সূচনা: সরাসরি পুরো এলাকায় বড় পরিসরে কাজ শুরু না করে, প্রথমে ছোট ছোট ব্লকভিত্তিক পাইলট প্রকল্প হাতে নেয়া উচিত। ২. পিপিপি মডেল: সরকার, বেসরকারি খাত এবং স্থানীয় জনগণের যৌথ অংশগ্রহণের মাধ্যমে নতুন ধারণা বাস্তবায়ন করতে হবে। ৩. দৃশ্যমান পরিবর্তন: রাজউক বা জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে ৪-৫টি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী ৩ বছরের মধ্যেই পুরান ঢাকায় একটি দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সর্বোপরি, পুরান ঢাকার বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরের স্বপ্ন দেখলেও তাদের মনে একটি বড় আশঙ্কা রয়েছে উন্নয়নের নামে তাদের শত বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায়। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার একটি সুন্দর ও সুষম সমন্বয়ই পারে এই মহাপরিকল্পনাকে সফল করতে। ৫ হাজার ২৫৮ কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্প কেবল কাগজের কলমেই সীমাবদ্ধ না থেকে, সঠিক তদারকি, রাজনৈতিক দৃঢ়তা এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে আলোর মুখ দেখবে এমনটাই এখন সাধারণ নগরবাসীর প্রত্যাশা।