মো. নেয়ামত উল্যাহ
জুলাই ৮, ২০২৬, ১২:৪৯ এএম
রাজধানী ঢাকার মতো জনবহুল ও দ্রুত বর্ধনশীল মেগাসিটিতে পথচারীদের চলাচলের প্রধান অবলম্বন হলো ফুটপাত। কিন্তু এই ফুটপাত এখন আর কোনোভাবেই পথচারীদের জন্য নিরাপদ বা স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গা নেই। রাজধানীজুড়ে এক অদ্ভুত ‘গোলকধাঁধা’ তৈরি হয়েছে ফুটপাত ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে।
বছরের পর বছর ধরে একদিকে ফুটপাত দখলমুক্ত করার জন্য নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে, অন্যদিকে সেই জায়গা আবার নতুন করে দখল হয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার নতুন নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে, ফুটপাতকে আধুনিকায়ন ও সুশৃঙ্খল করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে কিন্তু সবটাই যেন শেষ পর্যন্ত ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কার্যকর তদারকির অভাবে।
ফুটপাত উদ্ধারের এই প্রক্রিয়াটি এখন এক দুষ্টচক্রে পরিণত হয়েছে। উচ্ছেদ অভিযানের সময় দখলদারদের সরিয়ে দেয়া হয়, কিন্তু সেই অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা কিংবা কয়েক দিন না যেতেই পুনরায় শুরু হয় অবৈধ দখল। এই পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক অবহেলা। প্রতিটি উচ্ছেদ অভিযানের পরই নতুন করে দখলের উৎসব শুরু হয়, যা প্রমাণ করে যে উচ্ছেদ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।
প্রশাসন যখনই কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলে, তা কেবল সরকারি নথিপত্র বা সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। আধুনিক ফুটপাত নির্মাণ, হকার পুনর্বাসন এবং পথচারীদের জন্য বাধাহীন চলাচলের নিশ্চয়তা প্রদানের যে পরিকল্পনাগুলো প্রতি বছর বাজেটে জায়গা পায়, তার বাস্তবায়ন মাঠপর্যায়ে একেবারেই শূন্য।
গুলিস্তান থেকে মিরপুর নগরীর প্রতিটি ব্যস্ত এলাকার ফুটপাত এখন হকার ও অবৈধ দখলের কবলে। সিটি কর্পোরেশন বারবার উচ্ছেদ অভিযান এবং হকারদের জন্য সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার কথা বললেও সব উদ্যোগই যেন এখন পর্যন্ত কাগজে-কলমেই রয়েগেছে। ঢাকার ফুটপাত আজ আর কেবল চলাচলের পথ নয়, বরং এটি যেন একটি বাণিজ্যিক স্থান, যেখানে হকার, স্থায়ী দোকানের বর্ধিত অংশ, নির্মাণসামগ্রী এবং অবৈধ পার্কিংয়ের রাজত্ব।
পথচারীরা ফুটপাতে জায়গা না পেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মূল সড়কে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছেন, যা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ও যানজটের মূল কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নীতিনির্ধারক ও সিটি কর্পোরেশন বারবারই দায়িত্ব নেয়ার কথা বললেও সমন্বয়হীনতার কারণে ফুটপাত ব্যবস্থাপনার প্রকৃত সুফল সাধারণ নগরবাসী পাচ্ছে না। কাগজে-কলমে যে ব্যবস্থাপনার খসড়া তৈরি হচ্ছে, তা মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে কোনোভাবেই মেলে না। ফলে, ফুটপাত উদ্ধার ও ব্যবস্থাপনার উদ্যোগগুলো এখন সাধারণ মানুষের কাছে কেবল এক অসার প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়েছে।
এই গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কেবল উচ্ছেদ নয়, বরং দখলদারদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে একটি স্বচ্ছ, সমন্বিত ও কার্যকর রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন প্রয়োজন, যা কেবল নথিপত্রে নয়, বাস্তবায়িত হবে নগরীর প্রতিটি পথে।
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র গুলিস্তান, নিউমার্কেট, মিরপুর এবং বায়তুল মোকাররম এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পথচারীদের চলাচলের জন্য রাখা ফুটপাতগুলো হকারদের দখলে। ছোট-বড় শত শত অস্থায়ী দোকান বসিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করায় সাধারণ মানুষের হাঁটার জায়গা অবশিষ্ট নেই। পথচারীরা বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করছেন, যা প্রায়ই যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) আগে যেসব জায়গা হকারদের বসার জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল, সেগুলোর বেশিরভাগ এখন গাড়ি পার্কিংয়ের দখলে। ফলে ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ার পরিবর্তে হকাররা রাস্তায় নেমে এসেছে, আর হকারদের নির্দিষ্ট স্থান দখল করেছে ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক যানবাহন।
ফুটপাত দখল এবং হকারদের নিয়মের মধ্যে আনার বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘ঈদের ছুটিসহ কয়েকটি কারণে নিয়ম কিছুটা শিথিল ছিল। আমরা হকারদের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য কার্ড দেয়া এবং ভ্যানের লাইসেন্স দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। এর জন্য একটি নির্দিষ্ট ফি নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে এই ফি নির্ধারণের বিষয়টি পাঠিয়েছি। সেখান থেকে অনুমোদন বা ফিডব্যাক পেলেই আমরা বিষয়টি কার্যকর করব। আমরা সেই অপেক্ষায় আছি।’
ঈদের পর থেকে সিটি কর্পোরেশন কিছু এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেও তা স্থায়ী কোনো সমাধান দিতে পারেনি। যেসব এলাকায় হকার ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা ছিল, সেখানে রহস্যজনক কারণে কোনো অভিযান চালানো হয়নি। ফলে হকাররা পুনরায় ফুটপাতে দোকান সাজিয়ে বসেছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, উচ্ছেদ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। হকারদের জন্য জায়গা নির্ধারণ এবং সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনাই পারে এই সংকট থেকে রাজধানীবাসীকে মুক্তি দিতে।
মামুন নামে বায়তুল মোকারমের সামনে এক পথচারী বলেন, উচ্ছেদের নামে কেবল লোক দেখানো কার্যক্রম চালানো হয়। কিছু দিন পর হকাররা আবারও তাদের স্থানে ফিরে আসে। ফুটপাত দখলমুক্ত না থাকায় নারীরা, শিশুরা এবং বয়স্ক ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। রাজপথে মানুষের অবাধ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষকে আরও কঠোর এবং দায়িত্বশীল হওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
ঢাকার ফুটপাতকে জনচলাচলের উপযোগী করে গড়ে তোলা একটি দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। শুধু অভিযান বা আইনি প্রক্রিয়ার অপেক্ষায় বসে না থেকে নগর কর্তৃপক্ষকে হকারদের পুনর্বাসন এবং ফুটপাত ব্যবস্থাপনায় একটি সময়োপযোগী পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে হকারদের লাইসেন্স প্রদান ও নির্দিষ্ট স্থান বরাদ্দের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা যদি দ্রুত কার্যকর না হয়, তবে নগরবাসীর এই দুর্ভোগ কোনোভাবেই কমার সম্ভাবনা নেই বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। ঢাকার ফুটপাত যেন আর শুধু নথিপত্র বা আলোচনার টেবিলে না থেকে বাস্তবে পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত হয়, এটাই এখন নগরবাসীর প্রধান প্রত্যাশা।