ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬
দেশে হামের ভয়াবহ রূপ 

মৃত্যুমিছিলে আরও ৭ শিশু, আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়াল ৫৪ হাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

মে ১৪, ২০২৬, ০৩:৫৫ পিএম

মৃত্যুমিছিলে আরও ৭ শিশু, আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়াল ৫৪ হাজার

দেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি এক চরম সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে ঘাতক হয়ে আবির্ভূত হয়েছে 'হাম'। গত কয়েক মাস ধরে চলা এই প্রাদুর্ভাব থামার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা) দেশজুড়ে হাম এবং হামের উপসর্গ নিয়ে আরও সাতটি শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এই সাতজনের মধ্যে একজনের শরীরে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে হাম শনাক্ত হয়েছিল, বাকি ছয়জন মারা গেছে হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে।

এই মৃত্যুমিছিল কেবল পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নেই; এটি হয়ে উঠেছে শত শত পরিবারের আর্তনাদ। গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে দেখা গেল এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। ফরিদপুর থেকে আসা এক দম্পতি তাদের এক সন্তানকে হামের কাছে হারিয়েছেন। নিথর দেহটি কোলে নিয়ে আর আক্রান্ত অন্য মেয়েটিকে সাথে করে তারা গ্রামের বাড়ির পথে রওনা হয়েছেন। শোকাতুর বাবা-মায়ের এই করুণ প্রতিচ্ছবিই বলে দিচ্ছে দেশের বর্তমান হাম পরিস্থিতির ভয়াবহতা।

২৪ ঘণ্টার খতিয়ান: আক্রান্ত ও মৃত্যুর বিস্তার

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন করে ১ হাজার ৩৬৩ জন শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। মৃত্যুর ভৌগোলিক বিন্যাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

ঢাকা: হাম শনাক্ত হয়ে একজন এবং উপসর্গ নিয়ে চারজনসহ মোট ৫ জন শিশু এখানে মারা গেছে।
চট্টগ্রাম: এখানে হামের উপসর্গ নিয়ে ১ জন শিশু মৃত্যুবরণ করেছে।
ময়মনসিংহ: এই বিভাগেও উপসর্গজনিত কারণে আরও ১ জন শিশুর মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।

রাজধানী ঢাকা বর্তমানে এই সংক্রমণের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ঘনবসতি এবং সচেতনতার অভাব এই প্রসারে প্রভাব ফেলছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

গত দুই মাসের পরিসংখ্যান: এক ভয়াবহ চিত্র

চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে দেশের হাম পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত দুই মাসেরও কম সময়ে যে তথ্য সামনে এসেছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। অধিদপ্তরের সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী:

মোট মৃত্যু: ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট '৪৩৯ জন' শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
শনাক্ত পরবর্তী মৃত্যু: ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হওয়ার পর মারা গেছে '৭০ জন' শিশু।
উপসর্গজনিত মৃত্যু: পরীক্ষার ফল আসার আগেই বা পরীক্ষা ছাড়াই হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে '৩৬৯ জন' শিশু।

এই বিশাল সংখ্যক মৃত্যু প্রমাণ করে যে, হাম কেবল সাধারণ কোনো জ্বর বা র‍্যাশ নয়; এটি দ্রুত জটিল রূপ ধারণ করে শিশুদের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। বিশেষ করে নিউমোনিয়া বা শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা দেখা দেওয়ায় মৃত্যুর হার বাড়ছে।

আক্রান্ত ও হাসপাতালের ওপর চাপ

বর্তমানে দেশের হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারাদেশে মোট '৫৪ হাজার ৪১৯ জন' শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে।

আক্রান্তদের মধ্যে একটি বড় অংশকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। এখন পর্যন্ত '৩৯ হাজার ১৬০ জন' শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তবে আশার কথা এই যে, সঠিক চিকিৎসা ও পরিচর্যার ফলে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে '৩৪ হাজার ৯৬৮ জন' শিশু। ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত মোট '৭ হাজার ৩০৫ জন' শিশুর শরীরে নিশ্চিতভাবে হামের ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

কেন এই মহামারি পরিস্থিতি?

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। টিকা না নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। সাধারণত টিকা কার্যক্রমের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে টিকাদানের হার হ্রাস পাওয়া বা টিকাদান কর্মসূচি থেকে কোনো শিশু বাদ পড়া এই প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ হতে পারে।

হামের প্রধান লক্ষণসমূহ:

  • তীব্র জ্বর এবং শরীর ম্যাজম্যাজ করা।
  • নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়া।
  • শরীরে লালচে দানা বা র‍্যাশ ওঠা।
  • অরুচি ও শারীরিক দুর্বলতা।

যদি সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু না হয়, তবে হাম থেকে কান পাকা, ডায়রিয়া, এমনকি মারাত্মক নিউমোনিয়া হতে পারে, যা মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

জনস্বাস্থ্যবিদদের উদ্বেগ ও পরামর্শ

বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জনসাধারণকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, শিশুর শরীরে হামের কোনো লক্ষণ দেখা মাত্রই দেরি না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। ঘরে বসে কবিরাজি বা অপচিকিৎসা করার ফলে অনেক শিশু মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হলো 'এমআর (হাম-রুবেলা) টিকা। যাদের সন্তান এখনো টিকার ডোজ পূর্ণ করেনি, তাদের দ্রুত টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া জরুরি। এছাড়া আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখা এবং প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সরকার এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আক্রান্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি বাড়িয়েছে। তবে প্রতিদিন গড়ে এক হাজারেরও বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওষুধের সরবরাহ এবং সঠিক রোগ নির্ণয়ের সুবিধা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

ফরিদপুরের সেই দম্পতির মতো আর কাউকে যেন সন্তান হারিয়ে রিক্ত হস্তে বাড়ি ফিরতে না হয়, সেজন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কেবল হাসপাতাল নয়, পাড়া-মহল্লায় সচেতনতা বৃদ্ধি এবং টিকাদান কর্মসূচিকে আরও বেগবান করাই এখন সময়ের দাবি।

দেশের এই ক্রান্তিকালে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার, অভিভাবক এবং স্বাস্থ্যকর্মী- সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে হামের এই করাল গ্রাস থেকে আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করতে। অন্যথায়, এই মৃত্যুমিছিল দীর্ঘতর হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

এম জি

Link copied!